খাওয়া-দাওয়ার পর ডল্লি তাঁর সাথে একা ঝুল-বারান্দারায় বসে বললেন কিটির কথা।
‘জানেন? কিটি এখানে আসবে, গ্রীষ্মকালটা থাকবে আমার সাথে।’
‘সত্যি?’ লাল হয়ে বললেন তিনি এবং তখনই কথাটা ঘুরিয়ে দেবার জন্য যোগ করলেন, ‘তাহলে দুটো গরু পাঠাব আপনাকে? যদি হিসাব মেটাতে চান, মাসে পাঁচ রুব্ল করে দেবেন, অবশ্য যদি আপনার সংকোচ না হয়।’
‘না-না, ধন্যবাদ। আমাদের সব ঠিকঠাক হয়ে গেছে।’
‘তাহলেও আপনাদের গরুগুলোকে আমি দেখব, যদি অনুমতি দেন, হুকুম দিয়ে যাব কি করে খাওয়াতে হবে। খাওয়ানোটাই আসল কথা।’
এবং শুধু কথাবার্তার মোড় ঘুরিয়ে দেবার জন্যই লেভিন ডল্লিকে বোঝাতে লাগলেন তাঁর ডেয়ারি তত্ত্ব, যার মোদ্দা কথা, গরু হল খাদ্যকে দুধে পরিণত করার যন্ত্র ইত্যাদি।
এটা তিনি বলছিলেন যদিও ভয়ানক চাইছিলেন কিটি সম্পর্কে খুঁটিনাটি সমস্ত কথা শুনতে, আবার ভয়ও হচ্ছিল তাতে। ভয় হচ্ছিল যে এত কষ্টে যে প্রশান্তি তিনি লাভ করেছেন সেটা চুরমার হয়ে যাবে।
‘হ্যাঁ, তবে এ সবের ওপর তো নজর রাখতে হয়, কিন্তু কে করবে সেটা?’ অনিচ্ছায় জবাব দিলেন ডল্লি। মাত্রেনা ফিলিমনোভনার মাধ্যমে তিনি তাঁর কাজকারবার এমন গুছিয়ে তুলেছেন যে তাতে অদল-বদল করার ইচ্ছে ছিল না তাঁর; তাছাড়া কৃষির ব্যাপারে লেভিনের জ্ঞানেও তাঁর ভরসা ছিল না। গরু হল দুধ বানাবার যন্ত্র এ যুক্তি তাঁর কাছ সন্দেহজনক ঠেকেছিল। তিনি ভাবলেন এ ধরনের চিন্তায় কেবল ক্ষতিই হতে পারে গৃহস্থালির। তাঁর মনে হয়েছিল ব্যাপারটা অনেক সহজ : দরকার শুধু মাত্রেনা ফিলিমনোভনা যা তাঁকে বুঝিয়েছেন, ছোপে ছোপে আর পাশ- ধবলীকে বেশি করে খাদ্য পানীয় দেওয়া দরকার, আর বাবুর্চি যেন রান্নাঘরের ফেলানি পানি ধোপানীর গরুর জন্য না নিয়ে যায়। এটা বেশ স্পষ্ট। ওদিকে আটা আর ঘাস খাওয়াবার যুক্তিটা অনিশ্চিত এবং অস্পষ্ট। তবে প্রধান কথা, ওঁর ইচ্ছে হচ্ছিল কিটির কথা বলেন।
আন্না কারেনিনা – ৩.১০
দশ
যে নীরবতা নেমে এসেছিল সেটা কাটলে ডল্লি বললেন, ‘কিটি আমাকে লিখেছে যে শান্তি আর নিঃসঙ্গতা ছাড়া আর কিছু সে চায় না।’
লেভিন দুরুদুরু বুকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আর স্বাস্থ্যটা, ভালো হয়েছে কি?’
‘সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ, একেবারে সেরে উঠেছে। আমার কখনো বিশ্বাসই হয়নি যে বুকের দোষ আছে তার।’
‘আহ্, শুনে বড় আনন্দ হল!’ লেভিন বললেন আর বলে নীরবে ডল্লির দিকে তাকিয়ে থাকায় ডল্লি তাঁর মুখে মর্মস্পর্শী অসহায় কি একটা ভাব দেখতে পেলেন যেন।
‘শুনুন কনস্তান্তিন দ্দ্মিত্রিচ’, ডল্লি বললেন তাঁর সহৃদয়, খানিকটা উপহাসের হাসি হেসে, ‘কিটির ওপর আপনার রাগ কেন?’
‘আমি? আমি তো রাগিনি।’
‘না, রেগেছেন। যখন মস্কোয় গিয়েছিলেন, আমাদের কাছে বা ওদের কাছে কোথাও এলেন না যে?’
‘দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা’, চুলের গোড়া পর্যন্ত আরক্ত হয়ে লেভিন বললেন, ‘আমার অবাক লাগছে যে আপনি এত সহৃদয় হয়ে বুঝছে না এটা। আমার ওপর নেহাৎ করুণাও আপনার কেন হচ্ছে না যখন জানেন যে…’
‘কি আমি জানি?’
‘জানেন যে আমি প্রস্তাব দিয়েছিলেন এবং প্রত্যাখাত হয়েছি’, লেভিন বললেন আর এক মুহূর্ত আগে কিটির প্রতি যে কোমলতা বোধ করেছিলেন, বুকের মধ্যে তার স্থান নিল অপমানের জ্বালা।
‘কেন ভাবছেন যে আমি জানি?’
‘কেননা সবাই জানে ব্যাপারটা।’
‘এখানেই ভুল হচ্ছে আপনার; আমি এটা জানতাম না যদিও অনুমান করেছিলাম।’
‘বটে! তা এখন তো জানলেন।’
‘আমি জানতাম কেবল কিছু একটা হয়েছে বোধ হয়, ভয়ানক কষ্ট পাচ্ছিল সে, আমাকে সে বলে ও নিয়ে আর কখনো যেন কথা না তুলি। আর আমাকে যখন বলে নি তখন আর কাউকেও সে বলবে না। কিন্তু হয়েছিলটা কি? বলুন আমাকে।’
‘কি হয়েছিল সে তো বললাম আপনাকে।’
‘কখন ওটা ঘটেছিল?’
‘যখন শেষবার আপনাদের ওখানে যাই আমি।’
‘তবে শুনুন, আপনাকে একটা কথা বলি’, ডল্লি বললেন, ‘ওর জন্যে আমার ভয়ানক, ভয়ানক কষ্ট হয়। আপনি কষ্ট পাচ্ছেন কেবল আহত গর্ব থেকে…’
লেভিন বললেন, ‘হতে পারে, কিন্তু…’
ডল্লি বাধা দিলেন তাঁর কথায় : ‘বেচারির জন্যে আমার ভয়ানক, ভয়ানক কষ্ট হয়। এখন সব বুঝতে পারছি আমি।’
‘কিন্তু মাপ করবেন দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা’, লেভিন বললেন উঠে দাঁড়িয়ে, ‘আসি দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা। আবার দেখা হবে।’
‘আরে না-না, বসুন-বসুন’, তাঁর আস্তিন ধরে ডল্লি বললেন।
‘ও নিয়ে কিন্তু আর কথা নয়’, বসে লেভিন বললেন আর সেই সাথে টের পেলেন যে সমাধিস্থ বলে যা মনে হয়েছিল সে আশাটা নড়েচড়ে মাথা তুলছে তাঁর বুকের মধ্যে।
‘আপনাকে যদি আমি ভালো না বাসতাম’, বললেন ডল্লি, চোখে তাঁর পানি এসে গিয়েছিল, ‘আপনাকে বলে মনে হয়েছিল তা ক্রমেই জীবন্ত হয়ে অধিকার করতে লাগল লেভিনের অন্তর।’
ডল্লি বলে চললেন, ‘হ্যাঁ, এখন আমি বুঝলাম। আপনি এটা বুঝতে পারবেন না, আপনার পুরুষেরা স্বাধীন বাছবিচার করতে পারেন, আপনাদের কাছে সব সময় পরিষ্কার কাকে ভালোবাসেন। কিন্তু নারীসুলভ, কুমারীসুলভ লজ্জা নিয়ে অপেক্ষমাণা এক বালিকা, যে বালিকা আপনাদের পুরুষদের দেখছে দূর থেকে, সবাইকে গ্রহণ করে তার কথা দিয়ে, এরকম বালিকার এমন অনুভূতি হতে পারে যে সে বুঝতে পারছে না কি বলবে।’
