কথাবার্তাটা হল ডল্লি পক্ষে সবচেয়ে আকর্ষণীয় : প্রসব হয়েছিল কেমন? কি অসুখ? স্বামী কোথায়? প্রায়ই আসে?
ওদের সাথে আলাপটা এতই আকর্ষণীয়, এতই একই রকম ছিল তাদের আগ্রহ যে মেয়েদের ছাড়তে চাইছিলেন না ডল্লি। সবচেয়ে তাঁর ভালো লাগছিল এটা পরিষ্কার দেখতে পেয়ে যে ওঁর কতগুলো ছেলেমেয়ে আর সবাই কি সুন্দর দেখে ওরা মুগ্ধ হয়েছে। ডল্লিকে হাসাল ওরা আর ক্ষুব্ধ করল ইংরেজ মহিলাটিকে এই জন্য যে তাঁর কাছে দুর্বোধ্য এই হাসির কারণ তিনিই। একটা তরুণী মেয়ে ইংরেজ মহিলাটিকে লক্ষ্য করছিল, তিনি পোশাক পরছিলেন সবার শেষে। আর যখন তিনি তৃতীয় স্কার্টটাও পরলেন, মেয়েটা তখন মন্তব্য না করে পারল না : ‘এহ্, স্কার্ট পরছে তো পরছেই, পরা আর শেষ হয় না!’ বলতেই সবাই খিলখিলিয়ে হেসে উঠল।
নয়
গোসল শেষে ভেজা চুলে সমস্ত ছেলেমেয়েদের নিয়ে আর নিজে মাথায় রুমাল বেঁধে ডল্লি যখন প্রায় বাড়ির কাছে এসে পড়েছেন কোচোয়ান বলল : ‘কে-একজন সাহেব আসছেন, মনে হয় পক্রোভস্কয়ে থেকে।’
ডল্লি সামনে তাকিয়ে তাঁদের দিতে এগিয়ে আসা ধূসর টুপি আর ধূসর ওভারকোট পরিহিত লেভিনের মূর্তি দেখে খুশি হয়ে উঠলেন। তাঁকে দেখলে তিনি খুশি হতেন সব সময়ই, কিন্তু এখন তিনি আরো খুশি হলেন এজন্য যে লেভিন তাঁকে দেখবেন তাঁর সমগ্র মহিমায়। লেভিনের মত আর কেউ তাঁর এ মহিমা বোঝে না।
ডল্লিকে দেখে নিজের কল্পিত ভবিষ্যৎ সংসারের একটা ছবি খুলে গেল লেভিনের সামনে।
‘আপনি একেবারের যে ছানাপুনোর মুরগি-মা দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা।’
‘আহ্, কি যে খুশি হলাম!’ হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন ডল্লি।
‘খুশি হলেন, তবে আমাকে তো জানাননি। বড় ভাই আছেন আমার এখানে। স্তিভার কাছ থেকে চিরকুট পেলাম যে আপনি এখানে এসেছেন।’
‘স্তিভার কাছ থেকে?’ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন ডল্লি।
‘হ্যাঁ, লিখেছ যে আপনি এসেছেন, এই মনে করে যে কোনকিছুতে সাহায্য করতে আপনি দেবেন আমাকে’, লেভিন বললেন আর বলেই হঠাৎ বিব্রত হয়ে কথা বন্ধ করে নীরবে গাড়ির কাছে ঘুরতে লাগলেন, লাইম গাছের ডাল ছিঁড়ে তা চিবাতে চিবাতে। তাঁর বিব্রত লাগল এই জন্য যে স্বামীর যা করা উচিত সে ব্যাপারে লোকের সাহায্য ডল্লির কাছে খারাপ লাগবে। অব্লোন্স্কির পক্ষ থেকে নিজের পারিবারিক ব্যাপার অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দেবার এই যে ধরন, সেটা সত্যিই ভালো লাগেনি ডল্লির। লেভিনও যে সেটা বুঝেছেন, তা বুঝতে পারলেন তিনি তৎক্ষণাৎ। বোধের এই সূক্ষ্মতার জন্য, এই মাত্রাবোধের জন্যই তিনি পছন্দ করতেন লেভিনকে।
লেভিন বললেন, ‘আমি অবশ্য তাতে শুধু এই বুঝেছি যে আপনি আমায দেখতে চান আর সে জন্যে আমি খুবই খুশি। বলাই বাহুল্য যে আমি কল্পনা করতে পারি যে শহুরে গৃহকর্ত্রী হিসেবে এখানে আপনার খুবই অসুবিধে হবে, কিছু দরকার পড়লে আমি সব সময়ই আছি আপনার সেবায়।’
‘আরে না’, ডল্লি বললেন; ‘প্রথমে অসুবিধে হয়েছিল। তবে এখন সব চমৎকার ঠিকঠাক হয়ে গেছে আমার ওই ধাই-মা’র কল্যাণে’, বললেন তিনি মাত্রেনা লিফিমনোভনাকে দেখিয়ে। তিনিও বুঝেছিলেন কথা হচ্ছে তাঁকে নিয়ে। লেভিনের দিকে তাকিয়ে তিনি হাসলেন ভালো মনে, হাসি-খুশিতে। লেভিনকে চিনতেন তিনি, জানতেন ইনি আপামণির পাণিপ্রার্থী, চাইতেন যেন সেটা হয়। বললেন, ‘বসুন না, আমরা খানিক ঘেঁষাঘেঁষি করে থাকব।’
‘না, আমি হেঁটে যাব। এই ছেলেমেয়েরা, কে আমার সাথে ঘোড়দৌড় দেবে?’
ছেলেমেয়েরা লেভিনকে চিনতে কম, কবে তাঁকে দেখেছে তা মনে নেই তাদের, তবে বয়স্ক লোকেরা প্রায়ই ভান করে বলে ছেলেমেয়েরা যে বিচিত্র বিরাগ আর সংকোচ বোধ করে এবং সে জন্য বেশ শায়েস্তা হতে হয়, সেটা তাদের মধ্যে দেখা গেল না। যে কোন ব্যাপারেই ভান অতি বুদ্ধিমান, অন্তর্ভেদী মানুষকে প্রতারিত করতে পারে বটে, কিন্তু ভান যত সযত্নেই ঢাকা দেওয়া হোক, সবচেয়ে ক্ষীণমতি শিশুও তা ধরতে পারে, বিরাগ বোধ করে। লেভিনের আর যে ত্রুটিই থাক, ভানের কোন লক্ষণ্যই তাঁর মধ্যে নেই, তাই ছেলেমেয়েরা তাঁর সাথে তেমনি ভালোমানুষি করল যা তারা দেখে তাদের মায়ের মুখে। লেভিনের আমন্ত্রণে বড় দুজন তখনই লাফিয়ে এল তাঁর কাছে আর তেমনি সহজে দৌড়াতে লাগল তাঁর সাথে যেমন তারা দৌড়াতে পারত ধাই-মা, মিস গুল বা মাকে নিয়ে। লিলিও তাঁর কাছে আসতে চাইছিল, মা তাকে লেভিনের হাতে দিতেই লেভিন তাকে কাঁধে চাপিয়ে ছুট মারলেন।
মায়ের দিকে তাকিয়ে ফুর্তিতে হেসে বললেন, ‘ভয় পারেন না, ভয় পাবেন না দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা! চোট লাগবে কি পড়ে যাবে, সে অসম্ভব।’
তাঁর ক্ষিপ্র, বলিষ্ঠ, সযত্ন-সতর্ক এবং বড় বেশি টান-টান গতিভঙ্গি দেখে মা শান্ত হয়ে ফুর্তিতে অনুমোদনের হাসি হাসলেন তাঁর দিতে তাকিয়ে।
এখানে এই গ্রামে, ছেলেমেয়ে এবং তাঁর অনুরাগী দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনাকে পেয়ে বেশ একটা ছেলেমানুষি দিলদরিয়া মেজাজ পেয়ে বসল তাঁকে, যা তাঁর প্রায়ই হয় আর যেটা বিশেষ করে ভালো লাগত ডল্লি। ছেলেমেয়েদের সাথে দৌড়াদৌড়ি করে তিনি তাদের ব্যায়াম শেখালেন নিজের অকথা ইংরেজি ভাষায় হাসালেন মিস গুলকে, ডল্লিকে বললেন গাঁয়ে তাঁর কাজকর্মের কথা।
