বাড়ি ফিরে ছেলেমেয়েরা টের পাচ্ছিল গুরুগম্ভীর কিছু-একটা ঘটে গেল; ভারি নম্র হয়ে রইল তারা।
বাড়িতেও ভালোই চলল সব; কিন্তু প্রাতরাশে বসে শিস দিতে লাগল গ্রিশা, আর সবচেয়ে যেটা খারাপ, কথা সে শুনছিল না ইংরেজ মহিলাটির, তাই মিষ্টি পিঠে দেওয়া হয়নি তাকে। সেখানে থাকলে এমন একটা দিনে শাস্তিদান অনুমোদন করতেন না ডল্লি, কিন্তু ইংরেজ মহিলার নির্দেশ মান্য করতে হল, মিষ্টি পিঠে গ্রিশা পাবে না—এ সিদ্ধান্ত সমর্থন করলেন তিনি। সাধারণ আনন্দ খানিকটা মাটি হল এতে।
গ্রিশা এই বলে কাঁদতে লাগল যে, নিকোলিকাও শিস দিয়েছে কিন্তু তাকে শাস্তি দেওয়া হয়নি, কাঁদছে সে পিঠের জন্য নয়, কিছু এসে যায় না তার, কাঁদছে তার ওপর অবিচার করা হয়েছে বলে। এতে মন খারাপ হল বড় বেশি, ডল্লি ঠিক করলেন, ইংরেজ মহিলাটির সাথে কথা করে গ্রিশাকে মাপ করতে অনুরোধ করবেন এবং চললেন তাঁর কাছে। কিন্তু হলের ভেতর দিয়ে যাবার সময় যে দৃশ্যটা তিনি দেখলেন তাতে এতই আনন্দে তাঁর বুক ভরে উঠল যে পানি এসে পড়ল চোখে, নিজেই তিনি ক্ষমা করে দিলেন অপরাধীকে।
দণ্ডিতটি হলে বসে ছিল কোণের জানালার কাছে; তার কাছে তানিয়া প্লেট হাতে দাঁড়িয়ে। পুতুলগুলোকে খাওয়াবার ছল করে তানিয়া তার নিজের কাছ থেকে কিন্তু তার বদলে বদলে সেটা নিয়ে আসে ভাইয়ের কাছে। তার ওপর অবিচার নিয়ে কান্না চালিয়ে যেতে যেতে গ্রিশা খাচ্ছিল নিয়ে আসা পিঠেটা আর ফোঁপানির ভেতর দিয়ে বলে যাচ্ছিল : ‘নিজেই তুমি খাও, দুজনে মিলে খাব… দুজনে মিলে।’
গ্রিশার জন্য প্রথমে কষ্ট হয়েছিল তানিযার, তারপর নিজের মহানুভবতার চেতনা ক্রিয়া করছিল তার মনে, ওর ও চোখে পানি এসে পড়েছিল; তবে আপত্তি না করে সে খেতে লাগল তার ভাগটা।
মাকে দেখে আঁতকে উঠেছিল ওরা, কিন্তু তাঁর মুখের দিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখে, তারা ঠিক কাজই করছে বুঝতে পেরে হেসে উঠল, মুখ ভর্তি পিঠে নিয়ে হাস্যময় ঠোঁট মুছতে লাগল হাত দিয়ে, জ্বলজ্বলে মুখগুলো মাখামাখি হয়ে গেল চোখের পানিতে আর জ্যামে।
‘মাগো! নতুন সাদা পোশাক! তানিয়া, গ্রিশা!’ পোশাক বাঁচাবার চেষ্টা করে মা বলছিলেন, তবে চোখে পানি নিয়ে, পরমানন্দের দীপ্ত হাসি হেসে।
পোশাক খুলে রেখে মেয়েদের ব্লাউজ আর ছেলেদের পুরানো জ্যাকেট পরতে বলা হল, ব্যাঙের ছাতা তোলা আর গোসলে যাবার জন্য জুততে বলা হল গাড়ি, গোমস্তার মনঃক্ষুণ্ণ করে জোতা হল ‘পাটকলে’ ঘোড়া। শিশুকক্ষে উঠল উল্লাসের চিল্লানি, গোসলের জন্য রওনা দেবার আগে পর্যন্ত তা থামল না।
ব্যাঙের ছাতা মিলল পুরো এক ঝুড়ি, লিলি পর্যন্ত পেয়ে গেল একটা। আগে মিস গুল নিজে ব্যাঙের ছাতা দেখতে পেলে লিলিকে দেখিয়ে দিতেন আর লিলি তা তুলত, কিন্তু এখন লিলি নিজেই পেয়েছে বড় একটা ব্যাঙের ছাতা, উল্লাসের সমবেত চিৎকার উঠল : ‘লিলি ব্যাঙের ছাতা পেয়েছে।’
তারপর গোসল করতে যাওয়া হল নদীতে, ঘোড়াগুলোকে রেখে দেওয়া হল বার্চ গাছের তলে। ডাঁশ তাড়াচ্ছিল সেগুলো। কোচোয়ান তেরেতি তাদের গাছের সাথে বেঁধে ঘাসগুলো দলে শুয়ে পড়ল বার্চের ছায়ায়। ঘাট থেকে ভেসে আসতে লাগল শিশুদের অবিরাম ফুর্তির চিল্লানি।
সমস্ত ছেলেমেয়েগুলোর ওপর নজর রাখা আর তাদের দুষ্টুমি ঠেকানো ঝামেলার ব্যাপার হলেও, এসব মোজা, প্যান্টালুন, জুতার কোনটা কোন পায়ের তা মনে রাখা, গোলমাল করে না ফেলা, অসংখ্য ফিতে, লেস, বোতাম খোলা, আঁটা, বাঁধাছাদা করা কঠিন হলেও ডল্লি নিজেই সব সময় ছিলেন গোসলের ভক্ত, ছেয়েমেয়েদের পক্ষেও তা উপকারী জ্ঞান করতেন, তাদের সবাইকে নিয়ে এসব পাগুলোর হাত বুলাতে বুলাতে তাতে মোজা পরানো কোলে তুলে নিয়ে ন্যাংটা দেহগুলোকে পানিতে ঢুবানো, কখনো ফুর্তির কখনো আতংকের চিল্লানি শোনা, ভীত আর উল্লসিত চোখ মেলা, দম ফুরিয়ে আসা পানিসিঞ্চিত এসব মুখ, তাঁর এসব নিষ্পাপশিশুদের দেখা তাঁর কাছে তৃপ্তির পরাকাষ্ঠা।
ছেলেমেয়েদের অর্ধেকের যখন পোশাক পরা হয়ে গেছে, ওষধি গাছগাছড়া জোগাড় করতে বেরোনো পরবের পোশাক পরা কয়েকজন চাষী মেয়ে ঘাটের কাছে এসে সসংকোচে দাঁড়িয়ে পড়ল। বিছানার একটা চাদর আর কামিজ পানিতে পড়ে গিয়েছিল, মাত্রেনা ফিলিমনোভনা মেয়েদের একজনকে ডেকে বললেন সেগুলো তাঁকে শুকাবার জন্য দিতে। ডল্লি চাষী মেয়েদের সাথে কথাবার্তা বলতে লাগলেন। প্রথমে তারা হাতে মুখ ঢেকে মুচকি হাসছিল, ডল্লির প্রশ্ন ধরতে পারছিল না। তবে শিগগিরই তাদের সাহস বাড়ল, কথা বলতে শুরু করল, এবং ছেলেমেয়েদের যে অকৃত্রিম তারিফ তারা করল তাতে তৎক্ষণাৎ ডল্লিকে কিনে নিল তারা
তানিয়াকে দেখে মুগ্ধ হয়ে মাথা নেড়ে নেড়ে একজন বলল, ‘ইস, সুন্দরী বটে, চিনির মত তবে রোগা… ‘
‘হ্যাঁ, অসুখ করেছিল।’
কোলের বাচ্চাটাকে দেখে বলল আরেকজন, ‘আরে, তুইও গোসল করলি নাকি!’
‘না, ও শুধু তিন মাসের’, গর্বের সুরে বললেন ডল্লি।
‘বটে!’
‘তোমার ছেলেমেয়ে আছে?’
‘ছিল চারটি। আছে দুটো : বেটা আর বেটী। গত লেন্ট পরবের পর মেয়েটা বুকের দুধ ছেড়েছে।’
‘সেটা ক’বছরের?’
‘দুই বছর চলছে।’
‘এত দিন ধরে বুকের দুধ দিলে যে?’
‘আমাদের ওই চলে : তিনটা লেন্ট…’
