‘এই তো, সবই দিব্যি হয়েছে, পাটাতনটা দেখিয়ে বললেন মাত্রেনা ফিলিমনোভনা।
খড়ের দেয়াল দিয়ে একটা গোসলের ঘর পর্যন্ত বানানো হল, গোসল করতে লাগল লিলি, অংশত হলেও পূরণ হল ডল্লির আশা, গ্রাম্য জীবনের প্রশান্তি না হলেও আরাম মিলল। ছ’টা শিশু সন্তান নিয়ে শান্তিতে থাকা ডল্লির পক্ষে সম্ভব ছিল না। কারো অসুখ করে, কেউ অসুখে পড়তে পারে, কেউ কিছু একটা পাচ্ছে না, কারো মধ্যে আবার মন্দ স্বভাবের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, লেগেই আছে এসব। খুব কম, খুব কমই দেখা দিত শান্তিতে থাকার সংক্ষিপ্ত সময়টুকু। কিন্তু এসব উদ্বেগ আর দুশ্চিন্তা ছিল ডল্লির কাছে সম্ভবপর একমাত্র সুখ। এটা না থাকলে যে স্বামী তাঁকে ভালোবাসেন না, তাঁর কথা ভেবে তিনি পড়ে থাকতেন একলা। কিন্তু ছেলেমেয়েদের অসুখের কথা ভেবে মাযের ভয়টা যতই কষ্টকর হোক, ছেলেমেযেদের রোগ, ছেলেমেয়েদের মধ্যে বদ স্বভাবের দুর্লক্ষণ তাঁকে যতই দুঃখ দিক, তারাই এখন ছোট ছোট আনন্দ দিয়ে সে দুঃখের ক্ষতিপূরণ করতে লাগল। সে আনন্দ এতই ক্ষুদ্র যে তা ছিল বালুর মধ্যে স্বর্ণকণার মত অলক্ষ্য, মন খারাপের সময় তাঁর চোখে পড়ত কেবল দুঃখ, কেবল বালি, কিন্তু সুমুহূর্তও আসত যখন তিনি দেখতেন কেবল আনন্দ, কেবল সোনা।
এখন, গ্রামের নিঃসঙ্গতায় এই আনন্দগুলো সম্পর্কে তিনি সজ্ঞান হতেন ঘন ঘন। ওদের দিকে তাকিয়ে প্রায়ই তিনি নিজেকে প্রাণপণে বোঝাতে চাইতেন যে বিভ্রান্ত মা হিসেবে তিনি ছেলেমেয়েদের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট; তাহলেও মনে মনে তিনি এ কথা না বলে পারতেন না যে, তাঁর ছেলেমেয়েরা সব ক’টাই চমৎকার, ছয়টার সব ক’টারই স্বভাব ভিন্ন ভিন্ন, কিন্তু এমন ছেলেমেয়ে হয় খুবই কম, তাদের তাঁর জন্য সুখ আর গর্ববোধ হত।
আট
মে মাসের শেষে যখন সবই ন্যূনাধিক ঠিকঠাক হয়ে গেছে, তখন গ্রামের অসুবিধাগুলো নিয়ে তাঁর নালিশের জবাব এল স্বামীর কাছ থেকে। সব কিছু ভেবে দেখেননি বলে তাঁর কাছে ক্ষমা চেয়েছেন তিনি, প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যেই সম্ভব হবে অমনি সেখানে যাবেন। তবে সে সম্ভাবনাটা দেখা গেল না, জুনের গোড়া পর্যন্ত ডল্লি গ্রামে রইলেন একা।
পিটার পরবের সপ্তাহে রবিবারের ডল্লি তাঁর সমস্ত ছেলেমেয়েদের নিয়ে গির্জায় গেলেন তাদের ব্রতানুষ্ঠানের জন্য। বোন, মা, বন্ধুদের সাথে অন্তরঙ্গ, দার্শনিক আলোচনায় তিনি প্রায়ই তাঁদের অবাক করেছেন ধর্মের ব্যাপারে তাঁর স্বাধীনচিত্ততায়। ওঁর ছিল মেতেমসাইকোসিসের এক বিচিত্র ধর্ম, গোঁড়া গির্জার তোয়াক্কা না করে তাতে তাঁর প্রগাঢ় বিশ্বাস। কিন্তু ঘরে তিনি শুধু লোক দেখানির জন্য নয়, মনে প্রাণে গির্জার সমস্ত দাবি মেনে চলতেন আর ছেলেমেয়েরা যে প্রায় এক বছর ব্রত গ্রহণে যায়নি, এটা তাঁকে খুবই উদ্বিগ্ন করছিল। মাত্রেনা লিপমনোভনার পুরো অনুমোদন আর সহানুভূতি পেয়ে তিনি ঠিক করলেন সেটা করা যাক এখন, গ্রীষ্মে 1
দিনকয়েক আগে থেকেই ডল্লি ভাবছিলেন ছেলেমেয়েদের কি সাজে সাজাবেন। ফ্রকগুলো বানানো হল, ঢেলে সাজা হল, ধোলাই করা হল, নামিয়ে দেওয়া হল হেম, সেলাই করা হল বোতাম, তৈরি রইল রিবন। তানিয়ার জন্য যে ফ্রকটি বানাবার ভার নিয়েছিলেন ইংরেজ মহিলাটি, তাতে ডল্লির অনেক আশা পানিতে গেল। নতুন করে সেলাই করতে গিয়ে তিনি ভাঁজগুলো ফেলেননি জায়গামত, আস্তিন দুটো কেটেছিলেন এমন যে পোশাকটাই মাটি হয়ে গেছে একেবারে। তানিয়ার গায়ে তা যেভাবে বসল, তাকিয়ে দেখা যায় না। তবে মাত্রেনা ফিলমনোভনা একটা পটি গুঁজে কেপ দিয়ে তা ঢাকার কথা বললেন। ব্যাপারটা সামলানো গেল, কিন্তু প্রায় আর ন’টার সময়, যাজককে যখন মাস উপাসনার জন্য অপেক্ষা করতে বলা হয়েছিল, আনন্দে জ্বলজ্বলে হয়ে বেশভূষা করে ছেলেমেয়েরা গাড়ি-বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল মায়ের অপেক্ষায়
বেয়াড়া ‘দাঁড়কাকে’র বদলে মাত্রেনা ফিলিমনোভনার হস্তক্ষেপে গাড়িতে জোতা হয়েছে গোমস্তার ‘পাটকিলে’কে। ডল্লির দেরি হচ্ছিল প্রসাধনের ঝামেলায়, শেষ পর্যন্ত সাদা মসলিন গাউন পরে তিনি বেরিয়ে এলেন গাড়িতে উঠতে।
ডল্লি তাঁর কবরী রচনা ও সাজগোজ করেছেন সযত্নে, উতলা হয়ে। আগে তিনি সাজ করতেন নিজের জন্যই যাতে নিজেকে সুন্দর দেখায়, লোকের ভালো লাগে; পরে যত বয়স হতে লাগল ততই তাঁর বিরক্তি ধরত সাজ করতে; টের পেতেন কত কুশ্রী হয়ে পড়েছেন তিনি। কিন্তু এখন তিনি আবার সাজগোজ করলেন পরিতোষ আর উত্তেজনা নিয়ে। এখন তিনি সাজসজ্জা করলেন নিজের জন্য নয়, নিজের রূপের জন্য নয়, এজন্য যাতে এই সোনার কণাগুলোর মা হিসেবে তিনি সাধারণ ছাপটা মাটি করে না দেন। এবং শেষবারের মত আয়নায় মুখ দেখে তিনি খুশিই হলেন। সুন্দর দেখাচ্ছে তাঁকে। ঠিক অতটা সুন্দর নয় যা হবার তাঁর ইচ্ছে হত বলনাচগুলোতে যাবার সময়। কিন্তু যে লক্ষ্যটা এখন তিনি সামনে রেখেছেন, তার পক্ষে সুন্দর।
গির্জায় কৃষক, জমাদার আর তাদের বৌয়ের ছাড়া আর কেউ ছিল না। কিন্তু তাঁর ছেলেমেয়েদের এবং তাঁকে দেখে ওদের মুখে-চোখে একটা তারিফ আর চাঞ্চল্য তিনি দেখতে পেলেন, অথবা তাঁর মনে হয়েছিল যে দেখতে পাচ্ছেন। ছেলেমেয়েদের এমনিতেই, বাহারে পোশাক-আশাকেই শুধু যে ভালো দেখাচ্ছিল তা নয়, যেভাবে তারা চলছিল, তাতেও মিষ্টি লাগছিল তাদের। আলিওশা অবশ্য দাঁড়িয়ে ছিল তেমন শোভন ঢঙে নয় : কেবলই সে মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখতে চাইছিল নিজের কোটের পেছন দিকটা; তাহলেও অসাধারণ মিষ্টি লাগছিল তাকে। তানিয়া বড়দের মত ভাব করে তাকিয়ে দেখছিল ছোটদের। তবে সবচেয়ে যা কিছু ঘটছে তাতে তার সরল বিস্ময়ে ছোটটি, লিলি ছিল অপরূপ, আর স্যাক্রামেন্ট নেবার পর সে যখন ইংরেজিতে বলে ওঠে ‘আরেকটু দিন দয়া করে’, তখন কঠিন হয়েছিল না হেসে থাকা।
