যত্নশীল পিতা ও স্বামী হবার জন্য অব্লোন্স্কি যত চেষ্টাই করুন, তাঁর মোটেই মনে থাকত না যে তাঁর স্ত্রী ও ছেলেমেয়ে আছে। তাঁর রুচি ছিল অবিবাহিতের মত আর তিনি বুঝতেন শুধু সেগুলোই। মস্কোয় ফিরে তিনি স্ত্রীর কাছে সবর্গে ঘোষণা করলেন যে, বাড়িটা হবে ছবির মত। সেখানে যেতে তাঁকে খুবই পরামর্শ দিচ্ছেন তিনি। স্ত্রীর গ্রামে যাওয়াটা অব্লোন্স্কির মনোরম ঠেকেছিল সব দিক থেকেই : স্বাস্থ্য ফিরবে ছেলেমেয়েদের, খরচাও হবে কম, তিনি মুক্তি পাবেন। গ্রীষ্মকালটা গ্রামে থাকাটা ছেলেমেয়েদের পক্ষে, বিশেষ করে স্কার্লেট রোগে ভোগা যে খুকিটি সেরে উঠতে যাচ্ছিল তার পক্ষে প্রয়োজনীয় মনে করেছিলেন ডল্লি, তা ছাড়া ছোটখাট যেসব হীনতা, ছোটখাট যেসব ধার তাঁর ছিল কাঠওয়ালা, মাছওয়ালা, জুতা-বানিয়ের কাছে, যা তাঁকে পীড়া দিচ্ছিল তা থেকে রেহাইও মিলত। তদুপরি যাত্রাটা তাঁর কাছে ভালো লাগছিল আরো এই জন্য যে লোভ দেখিয়ে গাঁয়ে নিজের কাছে বোন কিটিকে নিয়ে আসার বাসনা ছিল তাঁর। বিদেশ থেকে কিটির ফেরার কথা গ্রীষ্মের মাঝামাঝি, অবগাহন গোসলের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে তাকে। বিদেশ থেকে কিটি লিখেছে যে, উত্তরের কাছেই ছেলেবেলাকার স্মৃতিতে ভরা এগুশোভোতে ডল্লির সাথে গ্রীষ্মটা কাটাতে পারার মত আনন্দের ব্যাপার তার কাছে আর কিছুই নেই।
প্রথম দিকটা গ্রাম্য জীবন কষ্টকর হয়েছিল ডল্লির পক্ষে। গ্রামে তিনি ছিলেন ছেলেবেলায়। এমন একটা ধারণা তাঁর মনে রয়ে দিয়েছিল যে গ্রাম হল সমস্ত শহুরে বিড়ম্বনা থেকে নিষ্কৃতি, জীবন সেখানে সুন্দর না হলেও (এটার সাথে তিনি নিজেকে মানিয়ে নিয়েছিলেন সহজেই) সস্তা আর সুবিধাজনক : সবই আছে সেখানে, সবই সস্তা, সবই পাওয়া যেতে পারে, ছেলেমেয়েদের পক্ষেও ভালো। কিন্তু এখন কর্ত্রী হিসেবে গ্রামে এসে তিনি দেখলেন যে তিনি যা ভেবেছিলেন, কিছুই তেমন নয়।
ওঁদের আসার পরের দিন অঝোরে বৃষ্টি নামল, রাতে পানি চুঁইয়ে পড়তে লাগল করিডরে আর শিশুদের ঘরে। তাই খাটগুলো সরিয়ে আনতে হল ড্রয়িং-রুমে। রাঁধুনি ছিল না। নয়টা গরুর মধ্যে, পাল দেখা-শোনা করে যে মেয়েটা—সে বলল, কোনটা গাভিন, কোনটা বাছুর দিয়েছে, কোনটা বুড়ো, কোনটার বাঁট শক্ত; মাখন নেই, এমন কি শিশুদের জন্যও দুধের টানাটানি। ডিম নেই। মুরগি পাওয়া যাচ্ছে না; ভাজা আর সেদ্ধ করা হচ্ছিল বুড়ো বুড়ো, বেগুনি রঙের, ছিবড়ে মাংসের মোরগ। মেঝে ধোওয়ার জন্য লোক মিলছিল না, সবাই আলু চাষে ব্যস্ত। গাড়ি চড়ে বেড়াবার উপায় ছিল না, কেননা একটা ঘোড়া ছিল অস্থির, লাফিয়ে উঠত দণ্ডের মধ্যে। গোসল করার জো নেই, কেননা নদীর গোটা তীর গরুর খুরে চটকানো, আর রাস্তা থেকে চোখে পড়ে জায়গাটা; এমন কি বেড়িয়ে বেড়ানোও অসম্ভব, কেননা গরুর পাল ভাঙা বেড়ার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়ত বাগানে আর একটা ছিল ভয়াবহ ষাঁড় গর্জন করত সেটা, সুতরাং সে টিস মারতে আসবে। পোশাক রাখার আলমারি ছিল না। যেগুলো ছিল বন্ধ হত না, নয়ত কাছ দিয়ে কেউ গেলে খুলে যেত আপনা থেকেই। চুলার জন্য লোহার হাঁড়ি বা শিক ছিল না, কাপড় সিদ্ধ করার বড় পাত্র ছিল না, এমন কি ইস্ত্রি করার তক্তাও ছিল না ঝিদের ঘরে।
ডল্লির মতে যা ভয়াবহ বিপর্যয়, তাতে নিক্ষিপ্ত হয়ে প্রথমটায় শান্তি ও বিশ্রাম পাবার বদলে ডব্লি হতাশ হয়ে পড়লেন : চালাবার চেষ্টা করছিলেন প্রাণপণে, নিরুপায় অবস্থাটা টের পাচ্ছিলেন, প্রতি মুহূর্তে চোখে উথলে ওঠা অশ্রু রোধ করতে হত। বাড়ির গোমস্তা, ভূতপূর্ব যে কোয়ার্টার-মাস্টারকে তার সুন্দর সসম্ভ্রম চেহারার জন্য অব্লোন্স্কির ভালো লেগেছিল এবং চাপরাশীদের মধ্যে থেকে তাকেই বেছে নেন, ডল্লির বিপদে কোন অংশ নিত না, সম্মান দেখিয়ে বলত : ‘কিছুই করা যাবে না, লোকগুলো ভারি নচ্ছার’ এবং কোন সাহায্যেই করেনি।
মনে হল অবস্থাটা থেকে উদ্ধারের উপায় নেই। কিন্তু সমস্ত বড় সংসারের মত অবলোন্স্কিদের বাড়িতেও ছিলেন অলক্ষ্য, তবে গুরুত্বপূর্ণ উপকারী মানুষ—মাত্রেনা ফিলিমনোভনা। কর্ত্রীকে তিনি শাস্ত করলেন, আশ্বাস দিলেন যে সব ঠিক হয়ে যাবে (মাতভেই কথাটা তাঁর কাছ থেকেই ধার নিয়েছিল) আর নিজে তাড়াহুড়া না করে, অস্থির না হয়ে কাজে লেগে গেলেন।
তখনই তাঁর ভাব হয়ে যায় গোমস্তা-বৌয়ের সাথে এবং প্রথম দিনেই গোমস্তা-বৌ আর গোমস্তার বাড়িতে চা খেলেন অ্যাকেসিয়া গাছের তলে, আলোচনা হল সমস্ত ব্যাপার-স্যাপার নিয়ে। অচিরেই অ্যাকেসিয়া তলে গড়ে উঠল মাত্রেনা ফিলিমনোভনার ক্লাব গোমস্তা-বৌ, গাঁয়ের মণ্ডল আর মহুরিকে নিয়ে, এবং একটু একটু করে আসান হতে লাগল মুশকিলগুলোর, আর এক সপ্তাহ পরে সত্যিই ঠিক হয়ে গেল সব কিছু। মেরামত হল ছাদ, রাঁধুনি পাওয়া গেল – গ্রাম-মণ্ডলের ছেলের ধর্ম-মা, কেনা হল মুরগি, দুধ দিতে লাগল গরুগুলো, বাগান ঘেরা হল খোঁটা পুঁতে ছুতোর কাপড়-চোপড় ইস্ত্রির বেলন করে দিলে, হুক বসাল আলমারিগুলোয়, তা আর ইচ্ছেমত খুলে যেত যা, আর সৈনিকের উর্দি বানাতে ব্যবহৃত মোটা কাপড়- মোড়া একটা ইস্ত্রির পাটাতন রইল কেদারা আর দেরাজে ভর দিয়ে, ইস্ত্রির গন্ধ উঠল ঝিদের ঘরে।
