‘কিন্তু তোর তো এটার প্রয়োজন নেই মনে হয়।’
‘হ্যাঁ, কিন্তু নানা ধরনের স্নায়বিক রুগীর পক্ষে দরকার।
‘হ্যাঁ, পরীক্ষা করে দেখতে হয় এটা। ভেবেছিলাম ঘাস কাটার এখানে গিয়ে তোকে দেখব। কিন্তু এমন অসহ্য গরম যে বনটা ছাড়িয়ে আর যাওয়া হল না। সেখানে খানিক বসলাম, তারপর বন দিয়ে গেলাম গ্রামটায়। দেখা হল তোর ধাই-মা’র সাথে। চাষীরা তোকে কি চোখে দেখে তা নিয়ে কিছু বাজিয়ে দেখলাম ওকে। বোঝা গেল, ওরা এ সব ভালো মনে করে না। ধাই-মা আমাকে বলল, ‘ওটা মনিবী কাজ নয়।’ মোটের ওপর আমার মনে হয়, চাষীদের ধারণায়, ‘মনিবী কাজকর্ম’ সম্পর্কে খুবই সুনির্দিষ্ট একটা দাবি আছে। তারা চায় না যে তাদের ধারণায় দানা-বাঁধা গণ্ডিটা থেকে মনিব বেরিয়ে আসুক।’
‘হতে পারে; কিন্তু এটায় এত তৃপ্তি যা আমি জীবনে কখনো পাইনি। এতে খারাপ তো কিছু নেই। তাই না?’ জবাব দিলেন লেভিন, ‘ওদের ভালো না লাগলে কি আর করা যাবে। তবে আমার মনে হয়, ওটা কিছু না। তুমি কি বল?’
‘মোটের ওপর’, কজ্নিশেভ বলে গেলেন, ‘আমি যা দেখছি, দিনটা তুই যেভাবে কাটালি তাতে তুই খুশি।’
‘খুবই খুশি। গোটা মাঠের ঘাস কেটেছি আমরা। আর যে বুড়োর সাথে সেখানে ভাব হল, সে কি বলব! ভাবতে পারবে না—কি চমৎকার!’
‘তাহলে দিনটা ভালোই কাটিয়েছিল বলে তুই খুশি। আমিও, প্রথমত, দাবার দুটো চাল আমি ঠিক করেছি, একটা খুবই খাশা, সেটা শুরু হবে বোড়ে দিয়ে। তোকে দেখাব তারপর ভাবলাম কালকের কথাবার্তা নিয়ে। ‘
‘কি? কালকের কথাবার্তা?’ লেভিন বললেন তৃপ্তিতে চোখ কুঁচকে, খাওয়া শেষের ঢেঁকুর ছেড়ে। একেবারেই মনে করতে পারলেন না কি কথাবার্তা হয়েছিল কালকে।
‘আমি ভেবে দেখলাম তুই অংশত সঠিক। আমাদের মতভেদটা এখানে যে, তুই চালিকা বলে ধরিস ব্যক্তিগত স্বার্থকে আর আমি মনে করি কিছুটা শিক্ষাপ্রাপ্ত প্রতিটি লোকের কাছে সেটা হওয়া উচিত সাধারণত কল্যাণের স্বার্থ। হয়ত তোর এ কথাও ঠিক যে বৈষয়িক স্বার্থপ্রণোদিত ক্রিয়াকলাপ বেশি বাঞ্ছনীয়। মোটের ওপর তোর স্বভাবটাই হল, ফরাসিরা যাকে বলে, বড় বেশি ‘প্রথম ঝোঁকেই চালিত হবার প্রবণতাসম্পন্ন’; তুই চাস সাবেগ, উদ্যমী ক্রিয়াকলাপ অথবা কিছুই না।’
লেভিন ভাইয়ের কথা শুনলেন বটে কিন্তু একেবারেই কিছু বুঝলেন না, বুঝতে চাইলেনও না। তাঁর শুধু ভয় হচ্ছিল যে, বড় ভাই আবার তাঁকে এমন প্রশ্ন করে না বসেন যাতে বোঝা যাবে যে কিছুই শোনেননি তিনি
‘এই হল গিয়ে ব্যাপার’, কজ্নিশেভ বললেন লেভিনের কাঁধ চাপড়ে।
‘হ্যাঁ, সে তো বটেই। তা, আমি নিজের গোঁ ধরে থাকছি না’, লেভিন বললেন শিশুসুলভ দোষী-দোষী হাসি নিয়ে। মনে মনে ভাবলেন, ‘কি আমি তর্ক করেছিলাম? বলাই বাহুল্য আমিও ঠিক, উনিও ঠিক এবং সবই হয়ে গেল চমৎকার। শুধু সেরেস্তায় একেবার যেতে হয়, হুকুম-টুকুম দিয়ে আসি।’ সিধে হয়ে হেসে উঠে দাঁড়ালেন তিনি।
কজ্নিশেভও হাসলেন।
ভাইকে ছাড়তে চাইছিলেন না তিনি, ভারি একটা তাজা আমেজ আর সজীবতা বিকিরিত হচ্ছিল তাঁর কাছ থেকে। বললেন, ‘যদি বেড়াতে চাস, চল যাই একসাথে। তোর দরকার থাকলে সেরেস্তাতেও যাওয়া যাবে।’
‘যাঃ!’ লেভিন এত জোরে চেঁচিয়ে উঠলেন যে, ভয় পেয়ে গেলেন সের্গেই ইভানোভিচ কজ্নিশেভ।
‘কি রে, হল কি?’
‘আগাফিয়া মিখাইলোভনার কজি?’ মাথায় করাঘাত করে লেভিন বললেন, ‘ওঁর কথা ভুলেই গিয়েছিলাম একেবারে।’
‘অনেক ভালো।’
‘তাহলেও ওঁকে দেখে আসি। তুমি টুপি পরে উঠতে-না-উঠতেই আমি ফিরব।’
চৌকিদারের খটখটিয়ার মত সিঁড়িতে হিলের শব্দ তুলে ছুটলেন তিনি।
সাত
অব্লোন্স্কি যখন পিটার্সবুর্গে যান অরাজপুরুষদের কাছে অবোধ্য হলেও সমস্ত রাজপুরুষদের কাছে স্বাভাবিক, বোধগম্য ও প্রয়োজনীয় সেই কর্তব্যটি পালন করতে যা ছাড়া চাকরি করা অসম্ভব, যথা মন্ত্রি-দপ্তরে দর্শন দিয়ে নিজের কথা মনে করিয়ে দেওয়া, এবং এই কর্তব্য পালন করতে গিয়ে বাড়ির সব টাকাকড়ি সাথে নিয়ে ঘোড়দৌড় আর পল্লীভবনগুলোয় গিয়ে সময় কাটাচ্ছিলেন হেসে-খেলে, ফুর্তি করে, ডল্লি তখন যথাসম্ভব পয়সা বাঁচাবার জন্য ছেলেমেয়েদের নিয়ে চলে যান গ্রামে। যান যৌতুক হিসেবে পাওয়া এগুশোভো গ্রামে, বসন্তে যেখানে গাছ বেচে দেওয়া হয়, লেভিনের পক্রোভস্কয়ে থেকে যা পঞ্চাশ ভার্স্ট দূরে।
অনেকদিন আগে এগুশোভোর পুরানো বড় বাড়িটা ভেঙে পড়েছিল। প্রিন্স তার সংস্কার করে একটা বারবাড়ি জুড়ে তাকে বাড়িয়ে তোলেন। বিশ বছর আগে, ডল্লি যখন শিশু, বারবাড়িটা তখন ছিল প্রশস্ত, সুবিধাজনক, যদিও সমস্ত বারবাড়ির মত সেটা ছিল বাইরে বেরোবার বীথি আর দক্ষিণের দিকে পাশকে হয়ে। কিন্তু এখন বারবাড়িটা পুরানো আর জীর্ণ। বসন্তে অবলোন্স্কি যখন গাছ বেচতে এসেছিলেন, তখনই ডল্লি তাঁকে বলেছিলেন বাড়িটা দেখতে আর যা যা দরকার সারাবার আদেশ দিয়ে আসতে। সমস্ত দোষী স্বামীর মত স্ত্রীর সুবিধার্থে যা যা দরকার তা করার হুকুম দিয়ে যান। তাঁর ধারণা, সমস্ত আসবাবে ক্রেটন মারতে হবে, পর্দা টাঙানো দরকার, বাগানটা সাফ করতে হবে, পুকুরের কাছে একটা মাচা করা উচিত, এবং ফুলগাছ পোঁতা চাই, কিন্তু অনেক দরকারী জিনিস যা না থাকায় পরে বেশ কষ্ট হয়েছিল ডল্লির, তিনি ভুলে গেলেন।
