কাটা ঘাস সরস শব্দে ঝাঁঝালো গন্ধ ছেড়ে ঢিপ হতে লাগল উঁচু সারিতে। ছোট ছোট সারিতে চারদিক থেকে ঘেঁষাঘেঁষি করে পাত্র ঝমঝমিয়ে কখনো কাস্তে কাস্তে ঠোকাঠুকি, কখনো কাস্তেতে শান দেওয়ার শব্দ তুলে ঘেসুড়েরা পরস্পরের সাথে পাল্লা দিচ্ছিল।
লেভিন যাচ্ছিলেন আগের মতই ছোকরা আর বুড়োর মাঝখান দিয়ে। মেষচর্মের কোট পরা বুড়ো আগের মতই হাসি-খুশি, রগুড়ে, অনায়াস তার ভঙ্গি। বনে অনবরত পাওয়া যাচ্ছিল রসালো ঘাসের মধ্যে ফুলে ওঠা ব্যাঙের ছাতা, কাস্তেয় কাটা পড়ছিল তা। কিন্তু সে ছাতা দেখলেই বুড়ো প্রতিবার নিচু হয়ে তা তুলে ঢোকাচ্ছিল জামার ভেতর। বলছিল, ‘বুড়ি ভালোমন্দ খাবে কিছু। :
ভেজা নরম ঘাষ কাটা যত সহজই হোক, খাদের খাড়া পাড় বেয়ে ওঠা-নামা ছিল শক্ত। কিন্তু বুড়ার তাতে অসুবিধে হচ্ছিল না। গাছের ছালের বড় বড় জুতো পরা পায়ের ছোট ছোট দৃঢ় পদক্ষেপে সে ধীরে ধীরে উঠছিল পাড় বেয়ে এবং সমস্ত শরীর আর কামিজ থেকে ঝুলে পড়া পায়জামা কাঁপলেও পথের একটা ঘাস, একটা ব্যাঙের ছাতাও ছাড়ছিল না সে, সমানে রসিকতা করছিল লেভিন আর চাষীদের সাথে। লেভিন যাচ্ছিলেন তার পেছনে আর প্রায়ই তাঁর মনে হচ্ছিল, কাস্তে ছাড়াই যাতে ওঠা কঠিন, কাস্তে নিয়ে তেমন খাড়া ঢিবিতে উঠতে গিয়ে নিশ্চয় তিনি পড়ে যাবেন; তাহলেও তিনি উঠলেন এবং যা করণীয় তা করলেন, টের পাচ্ছিলেন কি-একটা বহিঃশক্তি যেন তাঁকে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
ছয়
শেষ হল মাষ্কার উঁচু জমির ঘাস কাটা। সারা হল শেষ সারিটা। কাফতান পরে ফুর্তি করে বাড়ি চলল সবাই। সখেদে চাষীদের কাছে থেকে বিদায় নিয়ে ঘোড়ায় চেপে লেভিনও রওনা দিলেন। ঢিবির ওপর থেকে তাকিয়ে দেখলেন তিনি : নিচু থেকে ওঠা কুয়াশায় তাদের আর দেখা যাচ্ছিল না; শোনা যাচ্ছিল শুধু তাদের ফুর্তিবাজ কর্কশ কণ্ঠস্বর, হাসির হুল্লোড়, আর কাস্তে ঠোকাঠুকির আওয়াজ।
অনেকক্ষণ আগে ডিনার সেরে সদ্য ডাকে আসা পত্র-পত্রিকায় চোখ বুলাতে বুলাতে কজ্নিশেভ যখন তাঁর ঘরে লেবু-বরফ দেওয়া পানি খাচ্ছিলেন, কপালের ওপর ঘামে লেপটে যাওয়া চুল আর কালচে হয়ে যাওয়া ভেজা বুক-পিঠ নিয়ে সোল্লাসে লেভিন হুড়মুড় করে তাঁর ঘরে ঢুকলেন।
লেভিন গতকালে অপ্রীতিকর কথাবার্তা একেবারে ভুলে গিয়ে বললেন, ‘আমরা ওদিকে গোটা মাঠটার ঘাস কেটে ফেলেছি! আহ্, কি চমৎকার, আশ্চর্য ব্যাপার! আর তোমার কাটল কেমন?
‘মাগো! কি চেহারা হয়েছে তোর!’ কজ্নিশেভ প্রথম মুহূর্তটায় ভাইয়ের দিকে অসন্তুষ্ট দৃষ্টি হেনে বললেন, ‘আরে দরজাটা, দরজাটা বন্ধ কর!’ চেঁচিয়ে উঠলেন তিনি, ‘নিশ্চয় গোটা দশেক ঢুকিয়ে ফেলেছিস।’
কজ্নিশেভে মাছি সহ্য করতে পারতেন না, নিজের ঘরে জানালা খুলতেন কেবল রাতে, সযত্নে বন্ধ রাখতেন দরজা।
‘সৃষ্টিকর্তার দিব্যি, একটাও না। যদি ঢুকিয়ে থাকি, আমি নিজেই ধরব। কি পরিতৃপ্তি তুমি ভাবতে পারবে না! তুমি দিনটা কাটালে কেমন?
‘ভালোই। কিন্তু সত্যি, সারা দিন তুই কাটলি নাকি? নিশ্চয় তোর খিদে পেয়েছে রাক্ষুসে। সব তৈরি করে রেখেছে কুজ্মা।
‘না, খেতে ইচ্ছে করছে না, খেয়ে নিয়েছি ওখানে। এবার গিয়ে গা-হাত-পা ধোব।’
‘তা যা, ধুগে যা। আমি এখনই যাব তোর কাছে। কজ্নিশেভ ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়লেন, ‘তাড়াতাড়ি কর’, হেসে যোগ করলেন তিনি, বই-পত্তর নিয়ে তৈরি হলেন যাবার জন্য। হঠাৎ তাঁর নিজেরই ফুর্তি লাগল, ইচ্ছে হচ্ছিল না ভাইকে ভেড়ে থাকতে। ‘বৃষ্টির সময় কোথায় ছিলি?’
‘বৃষ্টি আবার কোথায়! সে তো শুধু কয়েক ফোঁটা। আমি এখনই আসছি। তাহলে দিনটা কাটিয়েছ ভালোই। তা বেশ।’ লেভিন চলে গেলেন সাজগোজ করতে।
মিনিট পাঁচেক পরে ভাইয়ের মিললেন ভাবার ঘরে। লেভিনের যদিও মনে হয়েছিল তিনি খেতে চান না, খাবার টেবিলে বসলেন শুধু কুমাকে ক্ষুণ্ণ না করার জন্য, তাহলেও খেতে শুরু করে তাঁর মনে হল খাবারগুলো অসাধারণ সুস্বাদু। কজ্নিশেভ তাঁকে দেখে হাসলেন। বললেন : ‘ও হ্যাঁ, তোর একটা চিঠি এসেছে। কুজ্মা নিয়ে এসো-না নিচে থেকে। তবে দেখে, দরজা বন্ধ করে রেখো কিন্তু।’
চিঠি লিখেছেন অব্লোন্স্কি লেভিন সেটা শুনিয়ে শুনিয়ে পড়লেন। পিটার্সবুর্গ থেকে অব্লোন্স্কি লিখেছেন : ‘ডল্লির কাছ থেকে আমি চিঠি পেয়েছি। সে আছে এগুশোভোতে; বিশেষ ভালো যাচ্ছে না ওর। যাও-না একটু ওর কাছে, পরামর্শ দিয়ে সাহায্য কর, তুমি তো সবই জান। তোমাকে দেখে খুব খুশি হবে। বেচারি একেবারে একলা। শাশুড়ী তাঁর স্বামী-কন্যা নিয়ে এখনো বিদেশে।’
‘বাঃ, অবশ্য অবশ্যই যাব!’ লেভিন বললেন, ‘চল যাই এক সাথেই, চমৎকার মেয়ে। তাই না?’
‘এখান থেকে বেশি দূর নয়?
‘ভার্স্ট তিরিশেক। বড়জোর চল্লিশ হতে পারে। তবে রাস্তাটা খুব ভালো। চমৎকার গাড়ি চলবে।’
‘তা বেশ’, তখনো হাসিমুখেই বললেন কজ্নিশেভ।
ছোট ভাইয়ের চেহারা দেখে স্রেফ শরিফ হয়ে উঠল তাঁর মেজাজ।
‘আচ্ছা খিদে বাপু তোর!’ প্লেটের ওপর ঝুঁকে পড়া লেভিনের বাদামি-লালচে রোদপোড়া মুখ আর ঘাড়ের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন।
‘খিদে চমৎকার! যত রাজ্যের রোগ-ভোগের পক্ষে এই যে কি উপকারী তোমার বিশ্বাস হবে না। চিকিৎসাবিদ্যাকে আমি সমৃদ্ধ করতে চাই নতুন একটা পরিভাষা দিয়ে : ArbeItscur ( জার্মান ভাষায় শ্রম দ্বারা আরোগ্য লাভ’ )।
