লেভিন লক্ষ্য করেননি কিভাবে সময় কাটছে। কতক্ষণ তিনি ঘাস কাটছেন জিজ্ঞেস করলে তিনি হয়ত বলতেন, আধঘণ্টা, অথচ দিবাহারের সময় কাছিয়ে এসেছিল। সারি দিয়ে ফেরার সময় বুড়ো লেভিনকে দেখাল কতকগুলো ছেলেমেয়ে। সামান্য দেখা যাচ্ছিল তাদের, লম্বা লম্বা ঘাস আর রাস্তা উজিয়ে নানা দিক থেকে তারা আসছিল ঘেসুড়েদের কাছে, রুটির পোঁটলা আর তাদের হাত টেনে ধরা ন্যাকড়া গোঁজা ভাসের ভাঁড় নিয়ে।
‘দেখছ তো, গুটি গুটি পোকা-মাকড়েরা আসছে’, ওদের দেখিয়ে বুড়ো বলল, হাত আড়াল করে সূর্যের দিকে তাকাল।
আরো দুটো সারি শেষ হতে বুড়ো থামল।
চূড়ান্ত স্বরে সে বলল, ‘খেতে হবে গো, মনিব!’ নদী পর্যন্ত গিয়ে ঘেসুড়েরা সারি পেরিয়ে গেল কাফতানগুলোর কাছে। খাবার নিয়ে এসে ছেলেমেয়েরা সেখানে বসে ছিল তাদের অপেক্ষায়। দূরের লোকেরা জুটল গাড়ির নিচে, কাছের লোকেরা উইলো ঝোপের তলে, তার ওপর ঘাস চাপিয়ে।
লেভিন গেলেন তাদের কাছে, বাড়ি যাবার ইচ্ছে হচ্ছিল না তাঁর।
মনিবের সামনে যত কিছু সংকোচ সব অনেক আগেই কেটে গিয়েছিল। খাবার তোড়জোড় করছিল চাষীরা। একদল হাত-মুখ ধুল, ছোকরারা গোসল করল নদীতে। অন্যেরা বিশ্রামের জায়গা ঠিকঠাক করল, রুটির পোঁটলা খুলল, বের করল ভাসের ভাঁড়। বুড়ো একটা পেয়ালায় রুটি ভেঙে ভেঙে ফেলল, তা থেঁতো করল চামচের বাঁট দিয়ে, বেরি সিজানো পাত্র থেকে পানি ঢালল, তার ওপর আরো খানিক পাঁউরুটি কেটে লবণ ছিটিয়ে পুব দিকে মুখ করে প্রার্থনা করতে শুরু করল।
পেয়ালার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে সে বলল, ‘খেয়ে দ্যাখো মনিব, আমার পান্তা।’
পান্তাটা এমনই সুস্বাদু যে বাড়ি গিয়ে খাবার সংকল্প ত্যাগ করলেন লেভিন। বুড়ার সাথেই তিনি খেলেন, আলাপ করলেন তার ঘর-সংসারের কথা নিয়ে, জীবন্ত আগ্রহ দেখালেন তাতে, তাঁর নিজের যে সমস্ত ব্যাপার-স্যাপারে বুড়োর আগ্রহ হতে পারে, সেগুলো বললেন। বড় ভাইয়ের চেয়ে বুড়োকেই তাঁর বেশি আপন মনে হল, তার প্রতি একটা কোমলতায় অজ্ঞাতসারে হাসলেন তিনি। বুড়ো যখন আবার উঠে প্রার্থনা সেরে মাথার তলে এক তাল ঘাস দিয়ে ওখানেই ঝোপের নিচে শুয়ে পড়ল, লেভিনও তাই করলেন, যদিও রোদ্দুরে নাছোড়বান্দা এঁটেল মাছি আর পোকাগুলো সুড়সুড়ি দিচ্ছিল তাঁর ঘর্মাক্ত মুখ আর দেহে। সাথে সাথেই ঘুমিয়েই পড়লেন তিনি। জাগলেন কেবল সূর্য যখন ঝোপের অন্য পাশে সরে তাঁর মুখে রোদ ফেলছিল। বুড়ো অনেক আগেই উঠে শান দিচ্ছিল ছোকরাদের কাস্তেতে।
চারপাশে তাকিয়ে দেখে লেভিন চিনতে পারলেন না জায়গাটা : এতই তা বদলে গিয়েছিল। মাঠটার বিরাট এলাকায় ঘাস কাটা হয়ে গেছে, বৈকালিক সূর্যের তির্যক কিরণে ইতিমধ্যেই গন্ধে ভুরভুরে সারিগুলো নিয়ে তা ঝকঝক করছে বিশেষ একটা নতুন ঝলকানিতে। নদীর কাছে কাটা ঝোপ, খোদ নদীটাই যা আগে দেখা যেত না আর এখন তার দাঁড়াচ্ছে, চলাফেরা করছে তারা, না-কাটা জায়গাগুলোয় ঘাসের খাড়া দেয়াল, খোলা মাঠের ওপরে পাক দেওয়া বাজপাখিগুলো—এ সবই একেবারে নতুন। সজাগ হয়ে উঠে লেভিন হিসাব করতে লাগলেন কতটা জায়গায় ঘাস কাটা হয়েছে, কতটায় এখনো কাটা যেতে পারে আজকেই।
বিয়াল্লিশ জন লোকের পক্ষে কাজ হয়েছে অসাধারণ। বেশি বেগার খাটুনির আমলে তিরিশ জনে যা কাটত দু’দিন ধরে তেমন একটা বড় মাঠের গোটাটাই কাটা হয়ে গেছে। হয়নি শুধু ছোট ছোট সারির কোণগুলো। কিন্তু লেভিনের ইচ্ছে হচ্ছিল সেদিন যত পারা যায় বেশি কাটা, রাগ হচ্ছিল সূর্যের ওপর যা এত দ্রুত ঢলে পড়ছে। কোনরকম ক্লান্তি বোধ হচ্ছিল না তাঁর; শুধু চাইছিলেন আরো, আরো তাড়াতাড়ি যত পারা যায় বেশি খাটতে।
বুড়োকে তিনি বললেন, ‘কি, মাষ্কার উঁচু জমিটাও সেরে ফেলব নাকি?’
‘সৃষ্টিকর্তার যা ইচ্ছে। সূর্য তো আর উঁচুতে নেই। তা ছোকরাগুলোর জন্যে ভোল্কা হবে তো?’
দুপুরে গড়িয়ে নেবার পর লোকগুলো যখন আবার উঠে বসল, ধূমপান শুরু করল ধূমপায়ীরা, বুড়ো ঘোষণা করল, মাষ্কার উঁচু জমির ঘাস কাটতে পারলে ভোদ্কা মিলবে।
‘এহ্, কাটব না আবার! চল তিত্! এমন হাঁকান হাঁকাব-না? রাতে খাবি পেট পুরে। চল যাই!’ শোনা গেল কলরব, রুটিগুলো শেষ করে চলল ঘেসুড়েরা, ‘তাহলে, রুখে থাকো হে সবাই!’ প্রায় ঘোড়ার মত দৌড়ে তিত্ চলল সামনে।
‘চল, চল!’ পেছনে পেছন এসে অনায়াসে তার পাল্লা ধরে বুড়ো বলল, ‘সামলে! কাটা পড়বি!’
জোয়ান, বুড়ো সবাই যেন পাল্লা দিয়ে ঘাস কাটতে লাগল। কিন্তু যতই ওরা তাড়াহুড়া করুক, ঘাস পয়মাল করছিল না তারা, একই রকম পরিচ্ছন্ন আর সুস্পষ্ট সারি পড়ছিল। কোণে কোণে যে জায়গাগুলো ছিল, পাঁচ মিনিটে তা কাটা শেষ। শেষের ঘেসুড়েরা সারি শেষ করতে-না-করতেই সামনের লোকরা রাস্তা পেরিয়ে চলে গেল মাষ্কার উঁচু জমিতে।
তখন সূর্য নেমে এসেছে গাছগুলোর মাথায়, আর পাত্র ঝমঝমিয়ে তারা ঢুকল উঁচু জমির বনের খাদে। সারা জায়গাটার মাঝখানে ঘাস কোমর সমান উঁচু, সরস, নরম, কোথাও কোথাও কাও-হুইট ফুলে চিত্রবিচিত্র।
লম্বালম্বি যাওয়া হবে নাকি আড়াআড়ি—এই নিয়ে সংক্ষিপ্ত একটু আলোচনার পর প্রখর এরমিলিন, বিশালকায় কালচে রঙের এক চাষী, সেও নামকরা ঘেসুড়ে, আগে গিয়ে সারিটা পাড়ি দিয়ে ফিরল। সবাই অনুসরণ করল তাকে, পাড়ের নিচে লম্বালম্বি গিয়ে আবার পাড় বেয়ে বনের কিনারা পর্যন্ত। সূর্য নামল বনের পেছনে। শিশির পড়তে শুরু করেছিল, পাড়ের ওপরকার ঘেসুড়েরাই শুধু রোদ্দুর পাচ্ছিল, কিন্তু নিচে ভাপ উঠছিল, উল্টো দিকটায় পড়েছে তাজা শিশিরসিক্ত ছায়া। জোর কাজ চলল।
