চলল সারির পর সারি। লম্বা সারি, ছোট সারি, কোনটার ভালো ঘাস, কোনটার খারাপ। সময়ে সব চেতনা লোপ পেল লেভিনের, মোটেই খেয়াল ছিল না বেলা গড়িয়ে গেছে নাকি গড়ায়নি। তাঁর কাজে এবার একটা বদল ঘটছিল যাতে অসীম সুখানুভব হচ্ছিল তাঁর। এক-এক সময় তিনি ভুলে যাচ্ছিলেন যাতে অসীম সুখানুভব হচ্ছিল তাঁর। এক- এক সময় তিনি ভুলে যাচ্ছিলেন কি করছেন, বেশ সহজ বোধ করছিলেন নিজেকে, তাঁর সারি তখন হয়ে দাঁড়াচ্ছিল প্রায় তিতের মতই সমান আর সুন্দর। কিন্তু যেই মনে পড়ত কি করছেন, চেষ্টা করতেন আরো ভালো করে করার, অমনি খাটুনির সমস্ত কষ্টটার বোধ হত তাঁর, সারি হয়ে দাঁড়াত খারাপ।
আরো একটা সারি শেষ করে তিনি আবার আরেকটা ধরতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তিত থেমে গেল, বুড়োর কাছে গিয়ে মৃদুস্বরে কি বলল। দুজনেই তারা তাকাল সূর্যের দিকে। ‘কি বলাবলি করছে ওরা, সারি ও ধরছে না কেন?’ ভাবলেন লেভিন, আন্দাজ করতে পারেননি যে না থেমে চাষীরা ঘাস কেটেছে চার ঘণ্টার কম নয়, সময় হয়েছে প্রাতরাশের।
বুড়ো বলল, ‘ছোট হাজারি, মনিব।’
‘সময় হয়ে গেছে নাকি? তা বেশ, ছোট হাজারিই হোক।’
তিতকে কাস্তে দিয়ে যে চাষীরা রুটির জন্য কাফতানগুলোর কাছে যাচ্ছিল তাদের সাথে লেভিন লম্বা-ঘাস-কাটা জায়গাটার সামান্য পানির ছিটে লাগা সারিগুলো দিয়ে গেলেন তাঁর ঘোড়ার কাছে। কেবল এখনই তিনি টের পেলেন যে আবহাওয়ার মেজাজ তিনি আন্দাজ করতে পারেননি, ভিজে গেছে তাঁর বিচালি। বললেন, ‘বিচালি নষ্ট হয়ে যাবে।’
‘ও কিছু না, মনিব। বাদলায় কাস্তে ধর, রোদে বিচালি জড়ো!’ বুড়ো বলল।
ঘোড়ার বাঁধন খুলে লেভিন বাড়ি গেলেন কফি খেতে।
কজ্নিশেভ সবেমাত্র উঠেছিলেন ঘুম থেকে। পোশাক-আশাক পরে তিনি খাবার ঘরে আসতে-না-আসতেই লেভিন তাঁর কফি শেষ করে ঘাস কাটার জায়গায় আবার গেলেন।
আন্না কারেনিনা – ৩.৫
পাঁচ
সকালের নাশতার পর লেভিন আগের সারিতে নয়, পড়লেন রসিক বুড়ো আর এক ছোকরা চাষীর মাঝখানের সারিতে বুড়ো তাঁকে ডেকেছিল পড়শী হতে। ছোকরা চাষী সবেমাত্র বিয়ে করেছে শরতে, এই প্রথমবার গ্রীষ্মে ঘাস কাটতে আসছে।
আগে আগে যাচ্ছিল বুড়ো, পা মুচড়িয়ে লম্বা সমতাল পদক্ষেপে, ভঙ্গি তার নিখুঁত, সমান, যেন হাঁটার সময় হাত দোলানোর বেশি মেহনত লাগছে না তার, এমনি খেলাচ্ছলে একই রকম উঁচু কাটা ঘাসের সারি বেঁধে যাচ্ছিল সে। যেন ও কিছু করছে না, ধারালো কাস্তেটা আপনা-আপনিই রসালো ঘাসে কেটে বসছে।
লেভিনের পেছনে আসছিল ছোকরা মিকা। মুখখানা তার মিষ্টি, এক গোছা তাজা ঘাস দিয়ে চুল বাঁধা, পরিশ্রম সে মুখ ক্রমাগত খিঁচড়ে যাচ্ছে; কিন্তু তার দিকে চাইলেই সে হাসে। বোঝা যায় যে, তার কষ্ট হচ্ছে সেটা স্বীকার করার চেয়ে বরং মরতে রাজী।
লেভিন যাচ্ছিলেন তাদের মাঝখানে দিয়ে। ঘাস কাটার ধূম যখন তুঙ্গে উঠল, লেভিনের তখন কষ্ট হয়নি তেমন দরদর ঘাম শীতল করে তুলছিল তাঁকে, পিঠ, মাথা, আস্তিন গুটানো হাত পুড়িয়ে রোদ তাঁকে দিচ্ছিল জোর আর কাজের গোঁ। ঘনঘন আসছিল সেই সব অচেতন মুহূর্তে যখন কি করছেন সে নিয়ে চিন্তা না করে থাকা যায়। কাস্তে ঘাস কেটে চলছে আপনা থেকেই। সুখের মুহূর্ত এগুলো। আরো আনন্দ হল যখন সারি যে নদীতে গিয়ে পড়েছে সেখানে এসে বুড়ো ভেজা ঘন ঘাস দিয়ে কাস্তে মুছে, নদীর টাটকা পানি দিয়ে ধুয়ে বেরি সিজানো পাত্র থেকে খানিকটা পানীয় দিলে লেভিনকে
‘নাও, আমার শরবত। কেমন, ভালো?’ বলল সে চোখ মটকে।
আর সত্যিই পাতার কুচি ভাসা, টিনের কৌটার মরচে ধরা স্বাদ মাখা এমন পানীয় লেভিন কখনো খাননি। এর পরেই শুরু হল কাস্তেতে হাত রেখে সুখাবিষ্ট মন্থার পাদচারণ যখন কপালের ঘাম মোছা, বুক ভয়ে নিঃশ্বাস নেওয়া, ঘেসুড়েদের গোটা সারিটা আর চারপাশে, মাঠে, বনে কি হচ্ছে তা দেখে নেওয়া সম্ভব।
যত বেশি লেভিন ঘাস কাটতে লাগলেন ততই ঘনঘন আসছিল সেই আত্মভোলা মুহূর্ত যখন তাঁর হাত কাস্তে হাঁকায় না, যখন কাস্তেই তার পেছনে টানে সজ্ঞান, জীবনে ভরপুর দেহকে, আর যেন যাদুবলে, কাজ নিয়ে কোন ভাবনা ছাড়াই সঠিক, চমৎকার কাজ হয়ে চলে আপনা-আপনি। সবচেয়ে সুখের মুহূর্ত এগুলো।
কঠিন লাগত যখন এই অচেতন গতি থামিয়ে ভাবতে হত, যখন ছাঁটতে হত ঢিবি অথবা না-নিড়ানোর সরেল- জমি। বুড়ো এটা করত অনায়াসে। চাঙড় এলে বুড়োর কাজের ভঙ্গি বদলে যেত, কখনো গোড়ালি দিয়ে, কখনো কাস্তের ডগা দিয়ে দু’দিক থেকে ছোট ছোট যা দিয়ে পরিষ্কার করত চাঙড়। আর তা করতে করতেই নজর করে দেখত আগে কি পড়ছে। কখনো সে কোন-একটা বেরি ছিঁড়ে খেত বা দিত লেভিনকে, কখনো কাস্তের ডগা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলত ডাল, কখনো তাকিয়ে দেখত তিতির পাখির বাসা, একেবারে কাস্তের মুখে পক্ষিণী উড়ে গেল যেখান থেকে। একবার পথে পড়া একটা সাপ ধরল, কাঁটার তোলার মত করে সেটা তার কাস্তেয় তুলে ধরে লেভিনকে দেখিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিল।
কিন্তু লেভিন এবং তাঁর পেছনকার ছোকরাটির পক্ষে কাজের ভঙ্গি বদলানো কঠিন হচ্ছিল। দুজনেই তাঁরা শ্রমসাধ্য কোন একটা ভঙ্গি আয়ত্ত করে কাজে মেতে উঠছিলেন যে তা বদলানো আর সেই সাথে সামনে কি পড়ছে দেখা সম্ভব হচ্ছিল না।
