মাঠের অসমান নাবালে পুরানো বাঁধটা যেখানে ছিল সেখানে দিয়ে ধীরে ধীরে এগোচ্ছে ওরা। নিজের লোকদের কয়েকজনকে চিনতে পারলেন লেভিন। ছিল সেখানে কাস্তে হাঁকাবার জন্য নুয়ে পড়া, অতি লম্বা একটা সাদা শার্ট গায়ে বুড়ো এরমিল; ছিল সেখানে লেভিনের ভূতপূর্ব কোচোয়ান ছোকরা-বয়সী ভাস্কা, প্রতিটি সারিতে ফলাও করে কাস্তে হাঁকাচ্ছিল সে; তিতও ছিল, ঘাস কাটার তারই কাছে লেভিনের হাতেখড়ি। ছোটখাট রোগা এই চাষীটি সামনে না ঝুঁকে, যেন কাস্তে নিয়ে খেলা করতে করতে কেটে ফেলছিল তার চওড়া সারিটা।
ঘোড়া থেকে নেমে লেভিন তাকে বেঁধে রাখলেন রাস্তার কাছে। তিতের কাছে যেতে সে ঝোপ থেকে দ্বিতীয় একটা কাস্তে বের করে এগিয়ে দিল।
হেসে টুপি খুলে কাস্তেটা দিয়ে সে বলল, ‘তৈরি মনিব, দাড়ি কামানো চলবে, ঘাস কাটবে নিজে নিজেই।’ লেভিন কাস্তেটা নিয়ে পরখ করে দেখলেন। নিজের নিজের সারি শেষ করে হাসি-খুশি ঘর্মাক্ত জানাচ্ছিল লেভিনকে। তারা সবাই তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল লেভিনকে, কিন্তু মেষচর্মের কোট পরা, শ্মশ্রুহীন অকুঞ্চিত-মুখ দীর্ঘদেহী বৃদ্ধ রাস্তায় না-আসা পর্যন্ত কেউ কিছু তাঁকে বলল না।
সে বলল, ‘দেখো মনিব, ধরেছ যখন–ছেড়ো না!’ ঘেসুড়েদের চাপা হাসির শব্দ কানে এল লেভিনের।
‘চেষ্টা করব না ছাড়তে’, তিতের পেছনে গিয়ে শুরু করার অপেক্ষা করতে করতে লেভিন বললেন।
‘দেখো’, বুড়ো পুনরাবৃত্তি করল।
তিত জায়গা খালি করে দিল, লেভিন চললেন তার পিছু পিছু। ঘাস এখানে ছোট, রাস্তার কাছে যেমন হয়। অনেকদিন ঘাস কাটেননি লেভিন, লোকদের দৃষ্টিপাতে অস্বস্তি লাগছিল, প্রথমদিকটা ঘাস কাটলেন খারাপ, যদিও কাস্তে চালাচ্ছিলেন সজোরেই। তাঁর পেছনে কাদের গলা শোনা গেল : ‘ঠিকমত বসানো হয়নি, হাতলটা লম্বা, দেখেছ, ওকে নুইতে হচ্ছে কেমন করে’, একজন বলল।
‘গোড়ালি লাগাও’, বলল দ্বিতীয় জন।
বুড়ো বলে চলল, ‘ও কিছু না, ঠিক হয়ে যাবে। ওই দ্যাখো, চলতে লেগেছে… চওড়া সারি নিচ্ছ গো, জেরবার হয়ে পড়বে, অমন কাটতে নেই মনিব, নিজের জন্যেই তো খাটছ! অথচ দ্যাখো, কত ঘাস বাদ যাচ্ছে! আমরা অমন করলে মজা টের পেতাম যে।’
এবার পাওয়া গেল নরম ঘাস, লেভিন শুনছিলেন, কিন্তু উত্তর দিচ্ছিলেন না, চেষ্টা করছিলেন যথাসম্ভব ভালো করে কাটতে, যাচ্ছিলেন তিতের পেছনে। একশ’ পা গেল তাঁরা। না থেমে এতটুকু ক্লান্ত না দেখিয়ে তিত এগোচ্ছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পেরে উঠবেন না ভেবে ভয় করতে লাগল লেভিনের : ভারি ক্লান্ত তিনি।
লেভিন টের পাচ্ছিলেন যে শক্তি ফুরিয়ে আসছে, ঠিক করলেন যে তিতকে থামতে বললেন। কিন্তু ঠিক এই সময়েই তিত নিজেই থেমে গেল, নিচু হয়ে কিছু ঘাস ছিঁড়ে কাস্তেটা মুছে শান দিতে লাগল, লেভিন সিধে হয়ে নিঃশ্বাস ছাড়লেন, তাকিয়ে দেখলেন আশপাশ। তাঁর পেছনে যে চাষীটা আসছিল স্পষ্টতই সে হয়রান হয়ে গেছে, কেননা লেভিন পর্যন্ত না পৌঁছিয়েই থেমে গিয়ে কাস্তেতে শান দিতে শুরু করেছে সে। তিত তার নিজের এবং লেভিনের কাস্তেতে শান দিয়ে আরো এগোতে থাকল।
দ্বিতীয়বারেও একই ব্যাপার। না থেমে, ক্লান্ত না হয়ে তিত চলল কাস্তের পর কাস্তে হাঁকিয়ে। লেভিন যাচ্ছিলেন তার পেছন পেছন, চেস্টা করছিলেন পিছিয়ে না পড়ার, কিন্তু ক্রমে কঠিন আর কষ্টকর হয়ে পড়ছিল তাঁর পক্ষে। একটা সময় এল যখন তিনি টের পেলেন যে তাঁর শক্তি আর নেই, কিন্তু ঠিক সেই সময়েই তিত থেমে শান দিতে লাগল।
এভাবেই তাঁরা শেষ করলেন প্রথম সারিটা। লম্বা এই সারিটা লেভিনের বিশেষ কষ্টকর লেগেছিল; তবে প্রথম সারিটা পাড়ি দেবার পর তিত কাঁধে কাস্তে লাগিয়ে ঘাস-কাটা জায়গায় তার জুতার হিলে যে ছাপ পড়েছিল তা ধরে ধরে দীর পদক্ষেপে আসতে থাকল এবং লেভিনও ঠিক সেভাবে চললেন নিজের ছাঁটা জায়গাটা দিয়ে। তখন মুখ থেকে দরদর করে নাক থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় ঘাম ঝরতে থাকলেও, আর গোটা পিঠটা এমন পানিতে চুবানোর মত করে ভিজে উঠলেও লেভিনের খুব ভালো লাগছিল। খুবই তাঁর খুশি লাগছিল এজন্য যে তিনি এখন জানেন যে পারবেন।
তৃপ্তিটা মাটি হচ্ছিল কেবল এই দেখে যে, সারিটা তাঁর ভালো হয়নি। নিজের এবড়োখেবড়ো ঝটকা-মারা সারিটার সাথে তিতের সুতার মত কাটা সারিটার তুলনা করে তিনি ভাবলেন, ‘কাস্তেটা কম করে দেহকাণ্ডটা বেশি করে চালাতে হবে।’
লেভিন লক্ষ্য করেছিলেন, প্রথম সারিটা কাটার সময় তিত এগোচ্ছিল খুবই দ্রুত, খুব সম্ভব মনিবকে যাচাই করে নেবার জন্য, সারিটাও দাঁড়াল লম্বা। পরের সারিগুলোর কষ্ট হল না অতটা, তাহলেও চাষীদের কাছ থেকে পিছিয়ে না পড়ার জন্য সমস্ত শক্তি খাটাতে হল লেভিনকে।
চাষীদের কাছ থেকে পিছিয়ে না পড়া আর যথাসম্ভব ভালোভাবে খাটা ছাড়া অন্য কোন ভাবনা, কোন বাসনা ছিল না লেভিনের। তিনি শুনছিলেন কেবল কাস্তের আওয়াজ, দেখছিলেন সামনে সরে যাচ্ছে তিতের খাড়া মূর্তি, ঘাস-কাটা জায়গাটার বাঁকা বৃত্ত, ধীরে ধীরে ঢেউয়ের মত লুটিয়ে পড়া ঘাস, তাঁর কাস্তের ধারালো দিকটার কাছে ফুলের চুড়ো আর আগে সারির শেষ, যেখানে শুরু হবে বিশ্ৰাম।
কাজের মাঝখানে তিনি হঠাৎ টের পেলেন তপ্ত ঘর্মাক্ত কাঁধে ঠাণ্ডার একটা প্রীতিকর অনুভূতি, ভেবে পাচ্ছিলেন না, কি এটা, আসছে কোথা থেকে। কাস্তেটার শান দেবার সময় চাইলেন আকাশের দিকে। ভেসে যাচ্ছে একটা নিচু ভারী মেঘ, বৃষ্টি পড়ছে বড় বড় ফোঁটার। একদল চাষী কাফতানগুলোর কাছে গিয়ে তা গায়ে চড়াল, অন্যেরা ঠিক লেভিনের মতই সুখপ্রদ তাজা শীতলতায় কাঁধ কোঁচকাল সানন্দে।
