‘নে, দর্শনের কথা রাখ তো। সমস্ত যুগের দর্শনের প্রধান কাজটাই হল ব্যক্তিগত ও সাধারণ স্বার্থের মধ্যে যে আবশ্যকীয় যোগাযোগ বর্তমান তা খুঁজে পাওয়া। কিন্তু সেটা প্রশ্ন নয, প্রশ্নটা এই যে তোর তুলনাটা আমার শুধু শুধরে দিতে হবে। যে মার্চ গাছ মাটিতে গোঁজা হয়নি, রোপণ করা হয়েছে, বপন করা হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়। কেবল সেই জাতিরই ভবিষ্যৎ থাকে, তাদেরই ঐতিহাসিক বলা যায় যারা নিজেদের প্রথা- প্রতিষ্ঠানের যা গুরুত্বপূর্ণ আর তাৎপর্যময়, তার সম্পর্কে সজাগ এবং মূল্য দেয় তাতে।’
এবং প্রশ্নটাকে কজ্নিশেভ নিয়ে গেলেন কনস্তান্তিন লেভিনের অনায়ত্ত দার্শনিক-ঐতিহাসিক ক্ষেত্রে এবং দেখিয়ে দিলেন লেভিনের দৃষ্টিভঙ্গির সমস্ত নীতিবিরুদ্ধতা।
‘ও কাজগুলো যে তোর ভালো লাগছে না, মাপ করিস আমাকে, তার কারণ আমাদের রুশী আলসা আর নবাবী। আমার দৃঢ় ধারণা এটা তোর একটা সাময়িক বিভ্রান্তি এবং তা কেটে যাবে।’
কনস্তান্তিন চুপ করে রইলেন। তিনি টের পাচ্ছিলেন যে তিনি সব দিক থেকে পরাস্ত, তবে সেই তিনি এও অনুভব করছিলেন যে তিনি যা বলতে চেয়েছিলেন সেটা বড় ভাইয়ের বোধগম্য নয়। শুধু জানতেন না বোধগম্য নয় কেন : সেটা কি এজন্য যে বলতে যা চেয়েছিলেন সেটা তিনি পরিষ্কার করে বলতে পারেননি, নাকি বড় ভাই বুঝতে চাননি অথবা বোঝা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয় বলে? কিন্তু এ নিয়ে তিনি তলিয়ে দেখতে গেলেন না, অন্যমনস্ক হয়ে পড়লেন একেবারে অন্য ভাবনায়, নিজের ব্যক্তিগত ব্যাপার নিয়ে।
কজ্নিশেভ চুপচাপ শেষ ছিপটা গুটালেন। ঘোড়াটা খুলে আনলেন, দুজনে রওনা দিলেন।
চার
বড় ভাইয়ের সাথে কথাবার্তার সময় যে ব্যক্তিগত ব্যাপারটা নিয়ে লেভিন ভাবছিলেন, সেটা এই : গত বছর একবার ঘাস কাটা দেখতে এসে লেভিন চটে ওঠেন গোমস্তার ওপর এবং শান্ত হবার জন্য ব্যবহার করেন তাঁর নিজস্ব পদ্ধতি-একজন চাষীর হাত থেকে কাস্তে টেনে নিয়ে লেগে যান ঘাস কাটতে।
তাঁর কাজটা এত ভালো লেগেছিল যে বারকয়েক নিজে ঘাস কাটায় নামেন; পুরো সাফ করেন বাড়ির সামনেকার ঘেসো মাঠটা আর এ বছর বসন্ত থেকেই পরিকল্পনা ঠিক করে রেখেছিলেন—দিনের পর দিন চাষীদের সাথে ঘাস কাটবেন। বড় ভাই আসার পর ভাবনায় পড়েন তিনি : কাটবেন কি কাটবেন না। গোটাগুটি দিনগুলো বড় ভাইকে একা রেখে যেতে সংকোচ হচ্ছিল তাঁর ভয়ও হচ্ছিল এর জন্য বড় ভাই আবার তাঁকে নিয়ে হাসাহাসি না করেন। কিন্তু মাঠ দিয়ে যাবার সময় ঘাস কাটার অভিজ্ঞতাটা মনে পড়ে তাঁর এবং প্রায় ঠিক করে ফেলেন কাটাবেন। আর বড় ভাইয়ের সাথে বিরক্তিকর আলাপটার পর আবার তাঁর মনে হল সংকল্পটার কথা। ভাবলেন, ‘শারীরিক, পরিশ্রম দরকার নইলে আমার স্বভাব একেবারেই বদখৎ হয়ে যাবে’ এবং স্থির করলেন এতে বড় ভাই বা চাষীদের সামনে নিজেকে যতই ব্ৰিত লাগুক, কাটবেনই।
সন্ধ্যায় কনস্তান্তিন লেভিন সেরেস্তায় গিয়ে কাজের হুকুম দিলেন। কাল সবচেয়ে সেরা আর বড় কালিনোভ মাঠের ঘাস কাটার জন্য ঘেসুড়েদের ডাকতে লোক পাঠালেন গাঁয়ে গাঁয়ে।
‘দয়া করে আমার কাস্তেটা তিতের কাছে পাঠিয়ে দেবেন, ও যেন শান দিয়ে কাল নিয়ে আসে; হয়ত নিজেই আমি নামব ঘাস কাটতে’, বিব্রত না হবার চেষ্টা করে বললেন তিনি।
‘জ্বি আচ্ছা।’
সন্ধ্যায় চায়ের সময় বড় ভাইকেও সে কথা বললেন লেভিন। বললেন, ‘মনে হচ্ছে আবহাওয়াটা টিকেই গেল। কাল ঘাস কাটা শুরু করব।’
‘এ কাজটা আমি খুবই ভালোবাসি’, বললেন কজ্নিশেভ।
‘ভয়ানক ভালো লাগে আমার। আমি নিজে মাঝে মাঝে ঘাস কেটেছি চাষীদের সাথে, কাল গোটা দিনটা কাটব ভাবছি।’
কজ্নিশেভ মাথা তুলে কৌতূহল ভরে তাকালেন ভাইয়ের দিকে।
‘তার মানে? চাষীদের সাথে সমানে সমানে, সারা দিন?’
লেভিন বললেন, ‘হ্যাঁ, কাটতে বেশ লাগে।’
শারীরিক ব্যায়াম হিসেবে জিনিসটা চমৎকার, তবে সবটা পেরে উঠবি কিনা সন্দেহ’, কোনরকম ঠাট্টা না করে বললেন কজ্নিশেভ।
‘আমি কেটে দেখেছি। প্রথমটা কষ্ট হয় বটে, পরে মেতে ওঠা যায়। পিছিয়ে পড়ব না মনে হয়…’
‘আচ্চা, চাষীরা এটাকে কেমনভাবে নেয় বল তো। মনিবের কাণ্ড দেখে হাসাহাসি করে নিশ্চয়।
‘না, আমি তা ভাবি না’ তবে কাজটা এত ফুর্তির আবার সেই সাথে কঠিন যে সময়ই থাকে না ভাবার।’
‘কিন্তু ওদের সাথে তুই খাবি কি করে? তোর জন্যে লাফিতের বোতল আর ভাজা টার্কি পাঠানো তো আর ভালো দেখায় না।’
‘না, আমি শুধু ওদের বিশ্রামের সময়টায় বাড়ি চলে আসব।’
পরের দিন সচরাচরের চেয়ে আগে উঠলেন কনস্তান্তিন লেভিন, কিন্তু কাজের বিলি-বন্দোবস্ত করতে গিয়ে আটকে গেলেন, ঘাস কাটার জায়গায় যখন পৌঁছলেন, ঘেসুড়েরা ততক্ষণে দ্বিতীয় সারি কাটতে শুরু করে দিয়েছে।
ঢিবির ওপর থেকেই তাঁর চোখে পড়ল মাঠের ঘাস কাটা অংশটা, তাতে ধূসর হয়ে ওঠা সারি, আর যেখান থেকে প্রথম সারি শুরু হয়েছিল, সেখানে ঘেসুড়েরা যে কাফতান খুলে রেখেছিল, তার কালো কালো স্তূপ।
যতই তিনি এগিয়ে যেতে লাগলেন, ততই তিনি বেশ দেখতে পাচ্ছিলেন কেউ কাফতান, কেউ-বা শুধুই কামিজ পরা, পরের পর এগিয়ে যাওয়া, নানান ঢঙে কাস্তে হাঁকানো সারিবন্দী চাষীদের। গুণে দেখলেন, বিয়াল্লিশ জন।
