যা তিনি আশা করেছিলেন যুক্তিটা এল তার চেয়ে অনেক সহজভাবে।
কজ্নিশেভ বললেন, ‘এটাকে তুই কল্যাণ বলে যদি মানিস, তাহলে সৎ লোক হিসেবে তুই ও-কাজটাকে ভালো না বেসে, তার প্রতি সহানুভূতি পোষণ না করে। সুতরাং তার জন্যে খাটতে ইচ্ছুক না হয়ে পারিস না।’
‘কিন্তু আমি এখনও মানছি না যে কাজটা ভালো’, লাল হয়ে বললেন কনস্তান্তিন লেভিন।
‘সে কি? তুই যে এখনই বললি … ‘
‘মানে, আমি ওটাকে ভালো বলেও মানি না, সম্ভবও মনে করি না।’
‘তা ধরে নিচ্ছি’, লেভিন বললেন। যদিও মোটেই তা ধরে নিচ্ছিলেন না, ‘ধরে নিচ্ছি নয়, তাই। তাহলেও আমি দেখতে পাচ্ছি না কেন ও নিয়ে আমি মাথা ঘামাব।’
‘না, এ নিয়ে যখনই কথাই উঠল, তাহলে আমাকে দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে বুঝিয়ে দাও’, লেভিন বললেন। ‘এখানে দর্শন আসে কোথা থেকে, আমি বুঝি না’, কজ্নিশেভ বললেন এমন সুরে যাতে লেভিনের মনে হল যেন দর্শন নিয়ে কথা বলার অধিকার তিনি ভাইকে দিতে চান না। সেটা চটিয়ে দিল লেভিনকে।
তিনি উত্তেজিত হয়ে বললেন, ‘এই জান! আমি মনে করি যে যতই বল আমাদের সমস্ত ক্রিয়াকলাপের চালিকা হল ব্যক্তিগত সুখ। এখন জেমভো প্রতিষ্ঠানটা অভিজাত হিসেবে আমার কোন কল্যাণ লাগছে, তা আমি কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। রাস্তাগুলো ভালো হয়নি এবং হতেও পারে না; খারাপ রাস্তায়ও আমার ঘোড়াগুলো বয়ে নিয়ে যাবে আমাকে। ডাক্তার, চিকিৎসা-কেন্দ্রে আমার দরকার নেই। সালিশ আদালত আমার চাই না—কখনো আমি তার দ্বারস্থ হইনি, হবও না। স্কুল আমার কাছে নিষ্প্রয়োজন শুধু নয়, ক্ষতিকরই—সে তো তোমাকে বলেছি। জেমস্তভো প্রতিষ্ঠান আমার কাছে শুধু দেসিয়াতিনা পিছু আঠারো কোপেক দেওয়া, শহরে যাওয়া, ছারপোকার সাথে রাত কাটানো আর যত রাজ্যের আজেবাজে কথা শুনে যাওয়ার বাধ্যতা, আমার ব্যক্তিগত কোন স্বার্থ তা মেটায় না।’
‘দাঁড়া’, হেসে বাধা দিলেন কজ্নিশেভ, ‘চাষীদের মুক্তির জন্যে খাটতে ব্যক্তিগত কোন স্বার্থ আমাদের প্রলুব্ধ করেনি, অথচ খেটেছি আমরা।’
‘তা নয়!’ আরো উত্তেজিত হয়ে বাধা দিলেন লেভিন, ‘চাষীদের মুক্তিটা অন্য ব্যাপার। ব্যক্তিগত স্বার্থ তাতে ছিল। যে জোয়ালটা আমাদের, সমস্ত ভালো লোকদের পিষ্ট করেছিল সেটা আমরা ছুঁড়ে ফেলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পৌরসভার সদস্য হওয়া, কত জন মেথর দরকার, যে শহরে আমি থাকি না সেখানে কিভাবে পাইপ বসাতে হবে— তা নিয়ে আলোচনা চালানো; জুরি হয়ে বসে হ্যাম চুরি-করা কোন চাষীর বিচার করা, আসামীর উকিল আর অভিশংসক যেসব আজেবাজে কথা ফাঁদছেন ছ’ঘণ্টা ধরে তা এবং বিচারপতি কিভাবে আমার বুড়ো বোকাটা আলিওশাকে জিজ্ঞেস করবেন, ‘অভিযুক্ত সাহেব, আপনি কি হ্যাম চুরির ঘটনাটা স্বীকার করছেন?’
‘অ্যাঁ? এসব শোনা…’
মেতে উঠে কনস্তান্তিন নকল করতে লাগলেন বিচারপতি আর বোকা আলিওশাকে; তাঁর মনে হয়েছিল এতে কাজ দেবে।
কিন্তু কাঁধ নাড়ালেন কজ্নিশেভ।
‘তা তুই কি বলতে চাস?’
‘আমি শুধু বলতে চাই যে আমাকে, আমার স্বার্থকে স্পর্শ করছে যেসব অধিকার তা আমি রক্ষা করব প্রাণপণে; যখন আমাদের, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের খানাতল্লাশি করা হয়, সশস্ত্র পুলিশেরা আমাদের চিঠিপত্র পড়ে, তখন সর্বশক্তিতে এসব অধিকার রক্ষা করতে, আমার শিক্ষার, স্বাধীনতার অধিকার রক্ষা করতে প্রস্তুত ছিলাম। বাধ্যতামূলক সৈন্যভুক্তির ব্যাপারটা আমি বুঝি যা আমার সন্তানদের, ভাইদের ভাগ্যকে, খোদ আমাকেই স্পর্শ করছে; যা আমাকে নিয়ে তা আলোচনা করতে আমি প্রস্তুত; কিন্তু জেমভোর চল্লিশ হাজার টাকাটার কি ব্যবস্থা হবে তা স্থির করা অথবা বোকা আলিওশার বিচার করা—এটা আমি বুঝিও না, পারিও না।’
কনস্তান্তিন এমনভাবে বললেন যেন তাঁর কথা বাঁধ ভেঙে লাগবে সাবেকি কজ্নিশেভ হাসলেন।
‘আর কাল যদি তোর বিচার হয়, তোর কি ভালো লাগবে সাবেকি ফৌজদারি আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে?’
‘বিচার আমার হবে না। কারও গলা আমি কাটব না কখনো, ওসবের প্রয়োজন নেই আমার, তাহলে বলি!’ আবার একেবারে অপ্রাসঙ্গিক কথায় লাফিয়ে গিয়ে বলে চললেন লেভিন, ‘জেমভো প্রতিষ্ঠানগুলো এবং এসব কিছুই সেই কাটা বার্চ গাছগুলোর মত যা আমরা ট্রিনিটি দিনে পুঁতি যাতে ইউরোপে আপনা-আপনি গজানো বনের মত দেখায়। মনে-প্রাণে এসব বার্চে পানি দিতে বা বিশ্বাস করতে আমি পারি না।’
শুধু কাঁধ কোঁচাকালেন কজ্নিশেভ, বিতর্কের মধ্যে হঠাৎ এখন কোথা থেকে এসব বার্চ এসে পড়ায় তাঁর বিস্ময় প্রকাশ করতে চাইলেন ভঙ্গিটায়, যদিও তখনই বুঝলেন এতে করে কি বলতে চাইছেন তাঁর ভাই।
মন্তব্য করলেন, ‘দাঁড়া, এ যে কোন যুক্তি হল না।’
কিন্তু নিজের যে ত্রুটির কথা কনস্তান্তিন লেভিন জানতেন, সাধারণ কল্যাণের প্রতি উদাসীনতা, সেটাকে সমর্থন করতে চাইছিলেন তিনি, তাই বলে চললেন : ‘আমি মনে করি কোন কাজই পাকাপোক্ত হতে পারে না যদি ব্যক্তিগত স্বার্থে তার ভিত্তি না থাকে। এটা হল একটা সাধারণ সত্য, দার্শনিক সত্য’, দার্শনিক শব্দটার দৃঢ় পুনরাবৃত্তি করে বললেন তিনি, যেন দেখাতে চাইলেন যে সকলের মত তাঁরও অধিকার আছে দর্শন নিয়ে কথা বলার।
আরেকবার হাসলেন কজ্নিশেভ। ভাবলেন, ‘নিজের ঝোঁকগুলোকে সমর্থনের জন্যে ওরও কি একটা দর্শন আছে দেখছি।’
