‘চেষ্টা তো আমি করেছিলাম’, মৃদুস্বরে অনিচ্ছাভরে লেভিন বললেন, ‘পারি না! কি করা যাবে!
‘পারিস না কেন? সত্যি বলছি আমি বুঝি না। উদাসীনতা, অকর্মণ্যতার কথা আমি মানি না; সত্যিই কি তবে নেহাৎ আলস্য?’
‘ওর কোনটাই নয়। আমি চেষ্টা করেছিলাম, দেখলাম কিছুই করতে পারি না’, লেভিন বললেন।
বড় ভাই যা বলছিলেন তাতে বিশেষ মন যাচ্ছিল না লেভিনের। নদীর ওপারে খেতের দিকে ভালো করে তাকিয়ে তিনি কালোমত কি-একটা লক্ষ্য করলেন, কিন্তু ধরতে পারছিলেন না সেটা ঘোড়া, নাকি ঘোড়ার পিঠে গোমস্তা।
‘কেন, তুই কিছু করতে পারিস না? চেষ্টা করে দেখলি, তোর মতে হল না, আর তুইও অমনি হাল ছেড়ে দিলি। তোর আত্মসম্মান নেই?’
‘আত্মসম্মান’, লেভিন বড় ভাইয়ের কথার মর্মাহত বললেন, ‘আমি বুঝতে পারছি না। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাকে যদি কখনো বলা হত যে, সমাকলন অংক অন্যরা বোঝে আমি বুঝি না, সেটা হত আত্মসম্মানের ব্যাপার। কিন্তু এক্ষেত্রে এ সব কাজের খানিকটা সামর্থ্য আছে এবং বড় কথা, কাজগুলো অতি-জরুরি, প্রথমেই এ বিষয়ে নিঃসন্দেহ হওয়া দরকার।’
‘কি বলছিস! ওটা কি জরুরি নয়?’ তিনি যা নিয়ে ভাবিত সেটা যে ভাইয়ের কাছে গুরুত্বহীন মনে হচ্ছে এবং বিশেষ করে ভাই যে স্পষ্টতই তাঁর কথা প্রায় শুনতেও না, এতে আহত হয়ে বললেন কজ্নিশেভ।
‘আমার কাছে জরুরি বলে মনে হয় না। আমাকে স্পর্শ করে না, কি করা যাবে?…’ লেভিন বললেন এবং ধরতে পারলেন যে তিনি যাকে দেখেছিলেন সে তাঁর গোমস্তা এবং নিশ্চয় হাল দেওয়া থেকে চাষীদের সে ছেড়ে দিচ্ছে। লাঙল উলটে ধরছে তারা। হাল দেওয়া শেষ হয়ে গেল নাকি?’ মনে মনে ভাবলেন তিনি।
‘কিন্তু শোন’, সুকুমার বুদ্ধিমান মুখখানায় ভ্রূকুটি ফুটিয়ে বড় ভাই বললেন, ‘সব কিছুরই একটা সীমা আছে। খাপছাড়া, অকপট লোক হওয়া, মিথ্যে ভালো না-বাসা খুবই ভালো—এসবই আমি জানি; কিন্তু তুই যা বলছিল তার হয় কোন অর্থ নেই নয় অর্থটা খুবই খারাপ। এটাকে তুই কি করে গুরুত্বহীন বলে ভাবতে পারিস যখন যে চাষীদের তুই ভালোবাসিস বলছিস…’
‘আমি তা কখনো বলিনি’, মনে মনে ভাবলেন কনস্তান্তিন লেভিন।
‘…তারা মরছে কোন সাহায্য না পেয়ে। বিটকেলে মহিলাদের হাতে মারা যাচ্ছে শিশুরা, চাষীরা অজ্ঞতার মধ্যে পড়ে থাকছে, তাদের ওপর মাতব্বরি করছে যত রাজ্যের কলমবাজ, অথচ তোর হাতে রয়েছে সাহায্য করার উপায়, কিন্তু করছিস না। কারণ তোর মতে, ওটা গুরুত্বপূর্ণ নয়।
কনস্তান্তিন লেভিন টের পেলেন যে, এখন তাঁর পক্ষে খোলা আছে শুধু দুটো পথ : হল বড় ভাইয়ের কথায় সায় দেওয়া, নয় মেনে নেওয়া যে সাধারণ কল্যাণের জন্য তার ভালোবাসা কম। এটা তাঁকে অপমানিত ও দুঃখিত করল।
দৃঢ়ভাবে বললেন, ‘একটাও বটে, ওটাও বটে। আমি দেখতে পাচ্ছি না কি করে সম্ভব হত…’
‘সে কি? টাকার ভালো বিলি-ব্যবস্থা করে চিকিৎসায় সাহায্য দেওয়া যেত না?
‘আমার মনে হয়, যেত না…বসন্তের বান, শীতের বরফ-ঝড়, চাষের মৌসুম নিয়ে আমাদের উয়েদের চার হাজার বর্গ ভার্স্ট এলাকায় সবখানে চিকিৎসা-সাহায্যের সম্ভাবনা আমি দেখছি না। তা ছাড়া ওষুধপত্রে আমার বিশ্বাসও নেই।
‘নে, খুব হয়েছে, এটা অন্যায়… আমি তোকে হাজারটা দৃষ্টান্ত দিতে পারি… কিন্তু স্কুল?’
‘স্কুল কি হবে?’
‘কি বলছিস তুই? শিক্ষার উপকারিতা নিয়ে কোন সন্দেহ থাকতে পারি কি? শিক্ষা যদি তোর পক্ষে ভালো হয়, তাহলে সবার পক্ষেই ভালো।’
কনস্তান্তিন লেভিন টের পাচ্ছিলেন যে, নৈতিক দিক থেকে তিনি কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। তাই উত্তেজিত হয়ে সামাজিক কল্যাণের জন্য তাঁর উদাসীনতার প্রধান কারণটা বলে ফেললেন।
‘সম্ভবত এসবই বেশ ভালো, কিন্তু কেন আমি ব্যস্ত চিকিৎসা-কেন্দ্র খোলা নিয়ে যখন কখনো আমি তা ব্যবহার করব না, স্কুল-নিজের ছেলেমেয়েদের আমি পাঠাব না যেখানে, চাষীরাও যেখানে পাঠাতে চায় না তাদের ছেলেমেয়েদের আর পাঠানো যে দরকার তেমন একটা দৃঢ়বিশ্বাস আমার এখনো নেই’, লেভিন বললেন।
এই অপ্রত্যাশিত আপত্তি মুহূর্তের জন্য বিস্মিত করল কজ্নিশেভকে। তবে তখনই তিনি আক্রমণের নতুন পরিকল্পনা ফাঁদলেন।
চুপ করে রইলেন তিনি, একটা ছিপ তুলে আবার সেটা ফেললেন, হেসে ভাইকে বললেন : ‘নে, তবে বলি…. প্রথমত চিকিৎসা-কেন্দ্রের দরকার ছিল। এই তো আমরা আগাফিয়া মিখাইলোভনার জন্যে জেমভোর ডাক্তারকে ডাকলাম।’
‘তবে আমার ধারণা, হাত বাঁকাই থেকে যাবে।’
‘সেটা এখানে সুনিশ্চিত নয়…তাপর সাক্ষর চাষী, মুনিষ যে তোর বেশি দরকার, বেশি কাজের।’
উঁহু, যাকে খুশি জিজ্ঞেস কর’, দৃঢ়ভাবে বললেন, ‘কনস্তান্তিন লেভিন, মুনিষ হিসেবে সাক্ষরেরা অনেক খারাপ। রাস্তা মেরামত করবে না তারা; সাঁকো বানানো মাত্র তার কাঠ চুরি যাবে।’
‘তবে’, মুখ হাঁড়ি করে বললেন কজ্নিশেভ। বিরোধিতা সইতে পারতেন না তিনি, বিশেষ করে এমন বিরোধিতা যা ক্রমাগত সরে যাচ্ছে একটা থেকে আরেকটায়, কোন সম্পর্ক না রেখে হাজির করছে নতুন যুক্তি, ফলে বোঝাই যায় না কোনটার জবাব দিতে হবে, ‘তবে ওটা কোন কথা নয়। শোন বলি। শিক্ষা যে জনগণের পক্ষে কল্যাণকর সেটা তুই স্বীকার করিস কি?’
1
‘করি’, ঝট করে বলে বসলেন লেভিন এবং তখনই বুঝলেন যে তিনি যা ভাবেন সেটা বলা হল না। তিনি টের পেলেন যে, এটা স্বীকার করল তাঁকে দেখিয়ে দেওয়া হবে যে তিনি বাজে কথা বলছেন যার কোন অর্থ হয় না। কি করে দেখিয়ে দেওয়া হবে সেটা তিনি জানতেন না, কিন্তু এটা জানতেন যে নিঃসন্দেহে যুক্তিযুক্তরূপেই তা দেখানো হবে এবং তার অপেক্ষায় রইলেন তিনি।
