তখন সেরকম একটা সময়, গ্রীষ্ম-শরতের সন্ধিকাল, যখন বর্তমান বছরের ফসলের ভাগ্য স্থিরীকৃত হয়ে গেছে। যখন শুরু হচ্ছে সামনের বছরের বপনের জন্য যত্ন, এগিয়ে এসেছে ঘাস কাটার সময়, যখন মঞ্জরি ধরেছে রাই গাছে, তখনও হালকা, ধূসর-সবুজ সে মঞ্জরি আন্দোলিত হয় বাতাসে, যখন মাঝে মাঝে হলদেটে ঘাসের ঝোপ নিয়ে দেরিতে চষা মাঠে অসমান হয়ে ছড়িয়ে পড়ে সবুজ ওট, যখন মাটি ঢেকে ফেলে আগে আগে ফলা বাক-হুইটের কোরকোদ্গম হয়ে গেছে, যখন লাঙলের ফাল না-বসা পথগুলো ছেড়ে দিয়ে গরু চরে চরে শক্ত হয়ে ওঠে পতিত জমিগুলোর অর্ধেকে হাল পড়েছে; যখন প্রতিদিন ঊষার মাঠে জড়ো করে রাখা শুকিয়ে ওঠা গোবর সারের গন্ধ মেশে মধুগন্ধী ঘাসের সৌরভের সাথে আর নাবালে কাস্তের অপেক্ষায় অটুট সমুদ্রের মত পড়ে থাকে ঘেসো মাঠ যার এখানে-ওখানে কালো হয়ে ওঠে আগাছা নিড়ানো সরেল শাকের স্তূপ।
এটা সেই সময় যখন প্রতি বছরে পুনরাবৃত্ত এবং প্রতি বছরে চাষীদের সমস্ত শক্তি দাবি করা ফসল তোলার আগে গাঁয়ের কাজে সামান্য বিরতি দেখা দেয়। ফসল হয়েছিল চমৎকার, ঝকঝকে গরম গ্রীষ্মের দিন, শিশির ঝরা ছোট রাত।
ঘেসো জমিটায় পৌঁছার জন্য দু’ভাইকে যেতে হয় বনের মধ্যে দিয়ে। পল্লবে ছাওয়া বনটার সৌন্দর্যে সর্বক্ষণ মুগ্ধ হয়ে থাকছিলেন কজ্নিশেভ, ভাইকে কখনো দেখাচ্ছিলেন ফুল ফোটার জন্য তৈরি হয়ে ওঠা, হলুদ উপপত্রে চিত্রবিচিত্র, ছায়ার দিকটায় কালো রঙের কোন-একটা বুড়ো লাইম, কখনো গাছের এই বছরে গজানো পান্নার ঝলমলে কচি ডাল। প্রকৃতির সৌন্দর্যের কথা বলতে বা শুনতে কনস্তান্তিন লেভিন ভালোবাসতেন না। যা তিনি দেখলেন তার সৌন্দর্য তাঁর কাছে লোপ পায় কথায়। বড় ভাইয়ের বক্তব্যে তিনি সায় দিচ্ছিলেন বটে, কিন্তু আপনা থেকে তাঁর মন চলে গিয়েছিল অন্য দিকে। বন পেরিয়ে আসার পর তাঁর সমস্ত মনোযোগ গ্রাস করে নিল ঢিবির ওপর ফেলে রাখা একটা মাঠের দৃশ্য, তার কোন জায়গা ঘাসে হলুদ, কোন জায়গা দলিত, চৌখুপি-মারা, কোথাও সারের ডাঁই, কোথাও হাল দেওয়া। সারি দিয়ে গাড়ি যাচ্ছিল মাঠে গাড়িগুলো গুনলেন লেভিন, যতটা সার দরকার তা সবই নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বলে খুশি হলেন। ঘেসো মাঠ দেখে মন তাঁর চলে গেল বিচালি কাটার প্রশ্নে। বিচালি তোলায় তিনি একটা বিশেষ উত্তেজনা বোধ করতেন সব সময়ই। ঘেসো মাঠটার কাছে গিয়ে লেভিন ঘোড়া থামালেন।
তখনো ঘন ঘাসের তলে তলে প্রভাতী শিশির থেকে গিয়েছিল। পা যাতে না ভেজে তার জন্য কজ্নিশেভ ভাইকে বললেন তাঁর গাড়ি করে মাঠ দিয়ে তাঁকে সেই উইলো ঝোপটায় পৌঁছে দিতে, যেখানে পার্চ মাছ আদার খায় ভালো। নিজের ঘাসগুলো ধামসাতে কনস্তান্তিন লেভিনের খুবই কষ্ট হলেও তিনি মাঠে গাড়ি হাঁকালেন। চাকা আর ঘোড়ার পায়ের কাছে জড়িয়ে যেতে লাগল লম্বা লম্বা ঘাস, ভেজা স্পোক আর ধুরায় লেগে তাদের বিচি থাকছিল।
বড় ভাই ঝোপের নিচে বসে ছিপ ঠিকঠাক করতে লাগলেন আর লেভিন ঘোড়াকে খুলে নিয়ে গিয়ে বেঁধে রাখলেন গাছের সাথে। তারপর নামলেন বাতাসে নিশ্চল ঘাসের বিশাল ধূসর-সবুজ সমুদ্রে। জলো জায়গাগুলোয় পাকন্ত বিচি ভরা ঘাস প্রায় কোমর সমান।
মাঠটা আড়াআড়ি পার হয়ে লেভিন রাস্তায় উঠলেন, দেখা হল চোখ-ফুলো একটা লোকের সাথে, মৌমাছির চাক নিয়ে যাচ্ছিল সে।
লেভিন জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি ফোমিচ? ধরলে নাকি?’
‘কোথায় আর ধরি কনস্তান্তিন দ্মিত্রিচ! নিজেরগুলো সামলে রাখতে পারলেই বাঁচি… এই দ্বিতীয়বার পালিয়েছিল। ছোঁড়াগুলোকে বলিহারি, ঘোড়া ছুটিয়ে যায়। ঐ যে আপনার এখানে লাঙল দেয় যারা। ঘোড়া খুলে গিয়ে পাল্লা ধরে
‘তা কি বলছ ফোমিচ। ঘাস কাটতে লাগব নাকি সবুর করব?’
‘কি আর বলি! আমরা তো সেন্ট পিটার উৎসব পর্যন্ত সবুর করি। আপনি কিন্তু বরাবর আগে শুরু করেন। তা দেখুন, সৃষ্টিকর্তা দেবেন, ঘাস তো খুবই ভালো। গরু-ঘোড়া খেয়ে বাঁচবে।’
‘কিন্তু আবহাওয়া কেমন হবে বলে ভাবছ?’
‘সেটা সৃষ্টিকর্তার হাত। আবহাওয়াও হয়ত ভালো থাকবে।
লেভিন ভাইয়ের কাছে এলেন। মাছ মেলেনি, কিন্তু তাতে কিছু এসে যায়নি। কজ্নিশেভের, বেশ ফুর্তির মেজাজেই আছে বলে মনে হল। লেভিন দেখতে পাচ্ছিলেন যে, ডাক্তারের সাথে আলাপটা তাঁকে চাগিয়ে তুলেছে। কথা বলার ঝোঁক এসেছে তাঁর। লেভিন কিন্তু চাইছিলেন তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে, যাতে পরের দিন ঘেসুড়েদের ডাকার হুকুম দিয়ে ঘাস কাটা নিয়ে যে সন্দেহটা তাঁকে খুবই ভাবাচ্ছিল সেটা চুকিয়ে দেন। বললেন, ‘যাওয়া যাক তাহলে।’
‘এত তাড়া কিসের? খানিক বসে থাকি না কেন? তবে জবর ভিজেছিস বটে! মাছ না মিললেও বেশ লাগছে। সমস্ত রকমের শিকারই ভালো, কেননা ব্যাপারটা প্রকৃতি নিয়ে। দ্যাখ কি সুন্দর এই ইস্পাতের মত পানিটা!’ উনি বললেন, ‘আর ঘাসে ভরা এই তীর’, বলে চললেন উনি, ‘সব সময়ই আমাকে মনে করিয়ে দেয় ওই ধাঁধাটার কথা। জানিস তো? ঘাস বলছে পানিকে : আর আমরা টলছি, কেবলই টলছি…’
লেভিন মনমরার মত জবাব দিলেন, ‘ওই ধাঁধা আমি জানি না।’
তিন
সের্গেই ইভানোভিচ কজ্নিশেভ বললেন, ‘শোন, তোর কথাই আমি ভাবছিলাম। ডাক্তারটি আমাকে যা বলল, তাতে তোদের উয়েদে যা ঘটছে সে যে সৃষ্টিছাড়া ব্যাপার; ছোকরার বেশ বুদ্ধিশুদ্ধি আছে। আমি তোকে আগেও বলেছি, এখনও বলছি : তুই যে সভায় যাস না এবং সাধারণভাবেই জেমস্ভোর ব্যাপার-স্যাপার থেকে নিজেকে সরিয়ে নিচ্ছিস, এটা খারাপ। সৎ লোকেরা যদি সরে যায়, তাহলে তো বলাই বাহুল্য, সৃষ্টিকর্তাই জানেন কি দাঁড়াবে। আমরা টাকা দিচ্ছি, তা যাচ্ছে মাইনেতে, অথচ স্কুল নেই, সহকারী ডাক্তার নেই, ধাই নেই, ওষুধের দোকান নেই, কিচ্ছুই নেই।’
