দুই ভাইয়ের চাষীদের ব্যাপারে মতভেদ ঘটলে কজ্নিশেভ সব সময়ই ভাইকে পরাজিত করতেন ঠিক এই জন্য যে চাষীদের, তাদের চরিত্র, বৈশিষ্ট্য, রুচি সম্পর্কে তাঁর ছিল সুনির্দিষ্ট সব ধারণা; কনস্তান্তিন লেভিনের কিন্তু সুনির্দিষ্ট ও অপরিবর্তিত কোন ধারণা ছিল না, ফলে তর্কগুলোয় সব সময়ই তিনি তাঁর স্ববিরোধে ধরা পড়তেন।
সের্গেই ইভানোভিচ কজ্নিশেভের কাছে তাঁর ছোট ভাই খুবই ভালো ছেলে। হৃদয়টা বসানো আছে ভালোই (কথাটা বলতেন তিনি ফরাসিতে), কিন্তু বুদ্ধিটা বেশ ক্ষিপ্র হলেও তাৎক্ষণিক ধারণার বশবর্তী, সুতরাং স্ববিরোধে ভরা। বড় ভাই মাঝে মাঝে কৃপা করে লেভিনকে ব্যাপার-স্যাপারের তাৎপর্য বুঝিয়ে দিয়ে, কিন্তু তাঁর সাথে তর্ক করে তৃপ্তি পেতেন না, কেননা লেভিন হেরে যেতেন বড় বেশি সহজেই।
তাঁর বড় ভাইকে কনস্তান্তিন লেভিন মনে করতেন অতি-মেধাবী ও শিক্ষিত একজন লোক, সর্বাধিক মাত্রায় উচ্চমনা, সাধারণের কল্যাণে ক্রিয়াকলাপ চালাতে পারায় কৃতিত্ব আছে। কিন্তু যতই তাঁর বয়স হচ্ছে আর বড় ভাইকে ঘনিষ্টভাবে আনছেন ততই মনের গভীরে কেবলই তাঁর ধারণা হতে লাগল যে সাধারণের কল্যাণে ক্রিয়াকলাপ চালাতে পারার এই যে কৃতিত্বটা লেভিনের মোটেই নেই বলে তিনি টের পান, সেটা হয়ত-বা গুণ নয়, বরং উল্টো, শুভ, সাধু উন্নত বাসনার ঘাটতি সেটা নয়, জীবনশক্তির ঘাটতি, সেটার ঘাটতি যাকে বলা হয় হৃদয়, সেই আকাঙ্ক্ষার ঘাটতি যা জীবনের অসংখ্য পথের মধ্যে থেকে কেবল একটাকে বেছে নিতে, সেই একটাকেই চাইতে বাধ্য করে। ভাইকে লেভিন যত বেশি করে জানলেন, ততই লক্ষ্য করলেন যে কজ্নিশেভ এবং সাধারণ কল্যাণের অন্যান্য বহু কর্মী সাধারণ কল্যাণের জন্য এই ভালোবাসায় উপনীত হয়েছেন প্রাণের তাগিদে নয়, বুদ্ধি দিয়ে ভেবে দেখেছেন যে এ কাজে লিপ্ত হওয়া ভালো, তাই লিপ্ত হয়েছেন। লেভিনের এই অনুমান আরও দৃঢ় হল এই দেখে যে এক দফা দাবা খেলা কিংবা নতুন একটা যন্ত্রের বুদ্ধিমান কারিগরির চেয়ে সাধারণ কল্যাণ আর আত্মার অমরতার প্রশ্নটা তাঁর হৃয়দকে এতটুকু বেশি নাড়া দেয় না। তাছাড়া গাঁয়ে ভাইয়ের সাথে থাকতে কনস্তান্তিন লেভিনের অস্বস্তি হচ্ছিল আরও এজন্য যে গাঁয়ে, বিশেষ করে গ্রীষ্মে, লেভিনকে অনবরত চাষবাস নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হত আর যেমনটা দরকার সব কিছু সেভাবে ঢেলে সাজার পক্ষে গ্রীষ্মের লম্বা দিনগুলোতেও কুলাচ্ছিল না, অথচ কজ্নিশেভ বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। কিন্তু এখন তিনি বিশ্রাম নিলেও, অর্থাৎ নিজের রচনা নিয়ে না খাটালেও মানসিক কর্মে তিনি এত অভ্যস্ত যে মাথায় যে চিন্তাটা এসেছে সেটাকে একটা সুন্দর সংক্ষিপ্ত রূপ দিয়ে প্রকাশ করতে তিনি ভালোবাসতেন এবং ভালোবাসতেন কেউ তাঁর কথা শুনুক। আর সবচেয়ে সাধারণ স্বাভাবিক শ্রোতা তো হবে তাঁর ভাই। এবং তাই তাঁদের সম্পর্কের সৌহার্দপূর্ণ সহজতা সত্ত্বেও বড় ভাইকে একলা রেখে যেতে কনস্তান্তিনের অস্বস্তি হত। ঘাসের ওপর শুয়ে থাকতে, শুধুই শুয়ে থেকে রোদ পোয়াতে-পোয়াতে অলস বকবকানি চালিয়ে যেতে কজ্নিশেভ খুব ভালোবাসতেন। ভাইকে বলতেন, ‘তুই ভাবতে পারবি না এই নবাবী আলসেমিতে আমার কি আরাম। মাথার একটা চিন্তাও সেই। একেবারে ফাঁকা বেলুন।’ কিন্তু কনস্তান্তিন লেভিনের বসে বসে তাঁর কথা শুনতে খারাপ লাগত, বিশেষ করে এজন্য যে তিনি না থাকলে লোকগুলো গোবর-সার নিয়ে যাবে তৈরি না হয়ে ওঠা ক্ষেতে আর নজর না রাখলে যেমন-তেমন করে কোথায় যে ফেলবে, খোদাই জানেন। কালটিভেটারের ব্লেডগুলো স্ক্রু-আঁটা করে আঁটবে না, খুলে ফেলবে, বলবে এগুলো সব বাজে খেয়াল, এ কি আর আমাদের সেই সাবেকি লাঙল?
কজ্নিশেভ তাঁকে বলতেন, ‘খুব হয়েছে তোর রোদে রোদে ঘোরা।’
‘না, আমাকে শুধু এক মিনিটের জন্যে সেরেস্তায় যেতে হবে’, বলে লেভিন ছুটে যেতেন জমিতে।
দুই
জুন মাসের প্রথমদিকে লেভিনের ধাই-মা এবং হিসাবরক্ষক আগাফিয়া মিখাইলোভনা এক বয়াম ব্যাঙের ছাতা সদ্য লবণে জারিয়ে মাটির নিচের কুঠুরিতে নিয়ে যেতে গিয়ে পিছলে পড়ে কব্জি ভাঙলেন। এলেন জেমভোর ডাক্তার, সবেমাত্র কোর্স শেষ করা বকবকুনে একটা ছাত্র। হাত দেখে বললেন যে ভাঙেনি, কমপ্রেস দিলেন, রয়ে গেলেন দ্বিপ্রাহরিক আহারের জন্য, বোঝা যায় নামকরা কজ্নিশেভের সাথে আলাপে তিনি জমে গিয়েছিলেন, এবং নানা ব্যাপারে নিজের আলোকপ্রাপ্ত মতামত তাঁকে জানাবার জন্য সমস্ত স্থানীয় লোকনিন্দাগুলো আওড়ালেন, আর অভিযোগ করলেন যে জেমভোর ব্যাপার-স্যাপার খুবই খারাপ। কজ্নিশেভ মন দিয়ে শুনলেন, জিজ্ঞাসাবাদ করলেন, নতুন শ্রোতা পেয়ে চাঙ্গা হয়ে কথা বলে গেলেন। অব্যর্থ এবং ওজনদার মন্তব্য করলেন কয়েকটা, যার সসম্ভ্রম মূল্য দিলেন তরুণ ডাক্তার, মেজাজ তাঁর হয়ে উঠল তেমনি শরিফ যা লেভিনের পরিচিত, চমৎকার উৎসাহিত কথোপকথনের পর সাধারণত তাঁর এ রকম হয়। ডাক্তার চলে যাবার পর কজ্নিশেভ ছিপ নিয়ে নদীতে যাবার বাসনা প্রকাশ করলেন। মাছ ধরতে ভালোবাতেন তিনি আর এমন একটা নির্বোধ কাজ যে তিনি ভালোবাসতেন পারেন, তাতে যেন গর্বই হত তাঁর।
কনস্তান্তিন লেভিনের জমিতে এবং ঘেসো মাঠে যাবার দরকার ছিল। তিনি তাঁর ছোট গাড়িটায় করে পৌঁছে দেবার জন্য ডাকলেন ভাইকে।
