ইস, কি বোকামি, কি নোংরামি! আমার তো কোনই দরকার ছিল না… সব ভান!’ ছাতাটা খুলতে খুলতে আর বন্ধ করতে করতে কিটি বলল।
‘কিন্তু কি উদ্দেশ্য?’
‘লোকের কাছে, নিজের কাছে, সৃষ্টিকর্তার কাছে নিজেকে ভালো বলে দেখাবার জন্যে, সবাইকে প্রতারিত করার জন্যে। না, এখন আর আমি ওদিকে যাচ্ছি না! খারাপ হব, কিন্তু অন্ততপক্ষে মিথ্যাচারী হব না, প্রতারক হব না!’
‘প্রতারক আবার কে?’ ভর্ৎসনার সুরে বলল ভারেঙ্কা, ‘আপনি এমনভাবে কথা বলছেন যেন…’ কিন্তু ক্ষিপ্ততার দমক পেয়ে বসেছিল কিটিকে, ভারেঙ্কাকে সে কথা শেষ করতে দিল না।
‘আমি আপনার কথা বলছি না, মোটেই আপনার কথা নয়। আপনি নিখুঁত। হ্যাঁ, আমি জানি যে আপনি একেবারে নিখুঁত। কিন্তু কি করা যাবে যদি আমি খারাপ হয়ে থাকি? আমি খারাপ না হলে এটা ঘটত না। বেশ, আমি যা তাই হই, কিন্তু ভান করব না। আন্না পাভলোভনাকে নিয়ে কি আমার দায়! ওরা যেমন চায় তেমনি থাকুক, আমিও থাকব যেমন চাই। আমি তো আর অন্য লোক হয়ে যেতে পারি না… এ কিছুই তা নয়, তা নয়!…’
‘কিন্তু কি তা নয়?’ বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করল ভারেঙ্কা।
‘সব কিছুই তা নয়। আমি প্রাণের তাগিদে ছাড়া অন্য কোনভাবে চলতে পারি না, আর আপনি চলেন নীতি মেনে। আমি আপনাকে ভালোবেসেছিলাম স্রেফ এমনি, আর আপনি আমাকে ভালোবেসেছেন আমাকে বাঁচাবার জন্যে, আমাকে শিখিয়ে তোলার জন্যে!
ভারেঙ্কা বলল, ‘আপনি আমার ওপর অন্যায় করছেন।’
‘অন্যের সম্পর্কে আমি কিছুই বলছি না, বলছি নিজের সম্পর্কে।’
‘কিটি!’ শোনা গেল মায়ের গলা, ‘বাবাকে তোর প্রবালগুলো দেখা।’
বন্ধুর সাথে মিটমাট না করে গর্বিত ভঙ্গিতে কিটি টেবিলের ওপর প্রবালের বাক্সটা নিয়ে চলে গেল মায়ের কাছে। ‘কি হল তোর? এত লাল হয়ে উঠেছিস?’ মা-বাবা দুজনেই একসাথে বলে উঠলেন।
কিটি বলল, ‘ও কিছু না। আমি এখুনি আসছি’, এই বলে যেখান থেকে এসেছিল, ছুটে গেল সেদিকেই। ভাবছিল, ‘এখনও ও এখানে! হায় সৃষ্টিকর্তা! কি বলব ওকে? কি করলাম আমি, কি বললাম! কিসের জন্যে মনে ঘা দিলাম ওর কি করি আমি? কি বলব ওকে?’ এই ভেবে দরজার কাছে থেমে গেল কিটি।
টুটি পরে ছাতা হাতে টেবিলের কাছে বসে ছিল ভারেঙ্কা, কিটি যে স্প্রিটা ভেঙে ফেলেছে, দেখছিল সেটাকে। মাথা তুলল সে।
‘ভারেঙ্কা, ক্ষমা করুন আমাকে, ক্ষমা করুন!’ তার কাছে গিয়ে কিটি বলল ফিসফিসিয়ে, ‘কি যে বলেছি কিছু মনে নেই আমার। আমি…’
ভারেঙ্কা হেসে বলল, ‘সত্যি, আপনার মনে দুঃখ দেবার কোন ইচ্ছে আমার ছিল না।’
সবই মিটমাট হয়ে গেল। কিন্তু যে জগৎটায় কিটি দিন কাটাচ্ছিল, পিতা আসার পর বদলে গেল তার সবটুকুই। যা কিছু সে শিখেছিল, তা সবই যে সে বর্জন করল তা নয়, কিন্তু বুঝতে পারল যে যা সে হতে চায় তা হতে পারবে বলে ভেবে সে আত্মপ্রতারণা করেছে। যেন সম্বিত ফিরল তার; যে উঁচুতে সে উঠত চেয়েছিল ভান বা বড়াই না করে তাতে টিকে থাকার সমস্ত দুরূহতা টের পেল সে; তাছাড়া দুঃখ, ব্যাধি, মৃত্যুর যে জগৎটায় সে ছিল, অনুভব করছিল তার সমস্ত দুঃসহতা, একটাকে ভালোবাসার জন্য সে যে শক্তি প্রয়োগ করছিল, সেটা যন্ত্রণাকর লাগল তার কাছে। ইচ্ছে হল, যত তাড়াতাড়ি পারে চলে যায় তাজা হাওয়ায়, রাশিয়ায়, এগুশোভোতে, সেখানে ছেলেমেয়েদের নিয়ে তার বোন চলে গেছে বলে সে চিঠিতে জেনেছে।
কিন্তু ভারেঙ্কার জন্য তার ভালোবাসা হ্রাস পেল না। বিদায় নেবার সময় কিটি অনুরোধ করল সে যেন রাশিয়ার আসে তাঁদের কাছে।
ভারেঙ্কা বলল, যাব যখন আপনি বিয়ে করবেন।’
‘আমি কখনো বিয়ে করব না।’
‘তাহলে আমি কখনও যাব না।’
‘বেশ, তাহলে এর জন্যেই বিয়ে কবর আমি। দেখবেন, যে কথা দিলেন, মনে রাখবেন!’ কিটি বলল।
যে ভবিষ্যদ্বাণী ডাক্তার করেছিলেন তা ফলে গেল। কিটি রাশিয়ায় বাড়ি ফিরল আরোগ্যলাভ করে। আগের মত নিশ্চিত আর হাসি-খুশি সে হয়ে উঠল না বটে, তবে মনের শান্তি ফিরল। তার কাছে মস্কোর দুঃখটা শুধু স্মৃতি হয়ে রইল।
আন্না কারেনিনা – ৩.১
এক
সের্গেই ইভানোভিচ কজ্নিশেভ মানসিক শ্রম থেকে বিশ্রাম নিতে চাইলেন, সচরাচরের মত তিনি বিদেশে না গিয়ে মে মাসে গ্রামে এলেন ভাইয়ের কাছে। তাঁর ধারণা, গ্রামীণ জীবনই সবচেয়ে ভালো। তিনি এখন ভাইয়ের কাছে এলেন সে জীবন উপভোগ করার জন্য। খুব খুশি হলেন কনস্তান্তিন লেভিন, সেটা আরও এই কারণে যে সে গ্রীষ্মে তিনি আর নিকোলাই ভাইয়ের আশা করছিলেন না। কিন্তু কজনিশেভের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা সত্ত্বেও ভাইকে নিয়ে ভেতরে ভেতরে অস্বস্তি বোধ করছিলেন কনস্তান্তিন লেভিন। গ্রামের প্রতি ভাইয়ের মনোভাব তাঁর কাছে অস্বস্তিকর, এমন কি অপ্রীতিকরই ঠেকেছিল। কনস্তান্তিন লেভিনের কাছে গ্রাম হল জীবনধারণের জায়গা, অর্থাৎ আনন্দ, দুঃখ, শ্রমের ভূমি; কজ্নিশেভের কাছে গ্রাম একদিকে হল খাটুনি থেকে বিশ্রাম, অন্যদিকে বিকৃতির হিতকর বিষনাশক ওষুধ যা তিনি সানন্দে এবং তার উপকারিতার চেতনা নিয়ে সেবন করতে লাগলেন। কনস্তান্তিন লেভিনের কাছে গ্রাম এই জন্য ভালো যে তা হল সন্দেহাতীত উপকারী শ্রমের আশ্রয; কজ্নিশেভের কাছে তা খুবই ভালো কারণ সেখানে কিছুই না করে থাকা যায় ও থাকা উচিত। তাছাড়া জনগণের প্রতি কজ্নিশেভের মনোভাব খানিকটা মোচড় দিচ্ছিল কনস্তান্তিনকে। কজ্নিশেভ বলতেন যে তিনি চাষীদের ভালোবাসেন। এবং তাদের চেনেন, প্রায়ই আলাপ করতেন তাদের সাথে আর ভান বা ঢং না করে সেটা তিনি করতে পরতেন ভালোই এবং এই রকম প্রতিটি আলাপ থেকে তিনি চাষীদের প্রশংসা করা এবং তিনি যে তাদের ভালো চেনেন তা প্রমাণের মত সাধারণ ইত্যাদি আহরণ করতেন। চাষীদের সম্পর্কে এই মনোভাব কনস্তান্তিন লেভিনের ভালো লাগেনি। কনস্তান্তিনের কাছে চাষীরা হল শুধু সাধারণ মেহনতে প্রধান শরিক। চাষীদের প্রতি সমস্ত শ্রদ্ধা এবং একটা রক্তের টান, যা নিশ্চয় তিনি তাঁর ধাই-মার দুধ খাওয়ার সাথে সাথে পেয়েছেন বলে তিনি নিজেই বললেন, যে সত্ত্বেও, সাধারণ কর্মকাণ্ডের শরিক হিসেবে এসব লোকেদের শক্তি, নম্রতা, ন্যায়বোধ দেখে মাঝে মাঝে উচ্ছ্বসিত হলেও সাধারণ কাজটায় যথন অন্য গুণের প্রয়োজন পড়ত, তখন চাষীদের ওপর তিনি চটে উঠতেন তাদের ঔদাসীনা, আলসেমি, মাতলামি, মিথ্যাবাদিতার জন্য। কনস্তান্তিন লেভিনকে যদি কেউ জিজ্ঞেস করত চাষীদের তিনি ভালোবাসেন কিনা, তাহলে নিশ্চয় তিনি ভেবে পেতেন না কি উত্তর দেবেন। চাষীদের, যেমন সাধারণভাবে সমস্ত লোকদের তিনি ভালোবাসতেনও বটে; আবার বাসতেনও না। বলাই বাহুল্য, সহৃদয় মানুষ হিসেবে লোকদের তিনি ভালো না বাসার চেয়ে ভালোই বাসতেন বেশি, চাষীদের বেলাতেও তাই। কিন্তু বিশেষ একটা ব্যাপার হিসেবে চাষীদের ভালোবাসা বা না বাসা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। কারণ চাষীদের সাথে তিনি শুধু দিনই কাটাতেন না, তাঁর সমস্ত আগ্রহ চাষীদের সাথে জড়িত ছিল শুধু তাই নয়, নিজেকে তিনি চাষীদেরই একাংশ বলে মনে করতেন। নিজের এবং চাষীদের মধ্যে বিশেষ কোন গুণ বা ত্রুটি তাঁর চোখে পড়ত না, নিজেকে দাঁড় করাতে পারতেন না চাষীদের বিপরীতে। তাছাড়া মনিব, মধ্যস্থ, আর সবচেয়ে বড় কথা, পরামর্শদাতা হিসেবে (চাষীরা তাঁকে বিশ্বাস করত, তাঁর পরামর্শ নেবার জন্য তাঁর কাছে আসত ভার্স্ট চল্লিশেক পথ ভেঙে) তিনি চাষীদের সাথে অতি নিকট সম্পর্কে দীর্ঘ দিন কাটালেও তাদের সম্পর্কে তাঁর কোন সুনির্দিষ্ট মতামত ছিল না এবং চাষীদের তিনি জানেন কিনা এ প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে চাষীদের তিনি ভালোবাসেন কিনা প্রশ্নটার মতই সমান মুশকিলে পড়তেন। চাষীদের তিনি চেনেন বলা আর লোকদের তিনি চেনেন বলা তাঁর কাছে একই কথা। সব ধরনের লোকদেরই তিনি অনবরত পর্যবেক্ষণ করতেন, আবিষ্কার করতেন, চাষাভুষা লোকেরাও তার অন্তর্গত, এদের তিনি মনে করতেন ভালো লোক, মনোগ্রাহী লোক, অবিরাম তাদের মধ্যে নতুন নতুন দিক লক্ষ্য করতেন, তাদের সম্পর্কে নিজের পুরানো মত বদলে পৌছাতেন নতুন মতে। কজ্নিশেভ ছিলেন উলটো। যে জীবনটা তিনি ভালোবাসতেন না তার বিপরীতে যেমন তিনি ভালোবাসতেন ও তারিফ করতেন গ্রাম্য জীবনের ঠিক তেমনি যে শ্রেণীর লোককে তিনি ভালোবাসতেন না, তাদের বিপরীতেই তিনি ভালোবাসতেন চাষীদের এবং ঠিক তেমনি চাষীদের তিনি জানতেন লোকসাধারণের বিপরীত হিসেবে। তাঁর প্রণালীবদ্ধ মানসে পরিষ্কার দানা বেঁধেছিল কৃষকজীবনের সুনির্দিষ্ট কতকগুলো রূপ যা অংশত খাস কৃষকজীবন থেকেই নেওয়া, কিন্তু প্রধানত তার বিপরীতটা থেকে। তিনি কখনো চাষীদের সম্পর্কে নিজের মতামত এবং তাদের প্রতি তাঁর সহানুভূতিশীল মনোভাব বদলাননি।
