এ সবে আনন্দ হচ্ছিল কিটির, তাহলেও দুশ্চিন্তাও তাড়াতে পারছিল না। তার বন্ধুদের সম্পর্কে এবং যে জীবনটা সে এত ভালোবেসেছিল সে সম্পর্কে তাঁর হাসি-খুশি মতামত দিয়ে বাবা অজ্ঞাতসারে তাকে যে সমস্যায় ফেলেছিল তার সমাধান করতে পারছিল না সে। এই সমস্যার সাথে যোগ হয়েছিল পেত্রভদের সাথে তার সম্পর্কের পরিবর্তন যা আজ এর সুস্পষ্ট আর অপ্রীতিকর রূপে প্রকাশ পেয়েছে। সবাই হাসি-খুশি, কিন্তু কিটি তা হতে পারছে না, এতে আরও বেড়ে উঠছিল তার যন্ত্রণা। ছেলেবেলায় যখন শাস্তিস্বরূপ তাকে তার ঘরে বন্ধ করে রাখা হত আর তার কানে আসত বোনেদের উচ্ছল হাসি, তার যেমন লাগত, তেমনি একটা অনুভূতি হচ্ছিল তার।
‘তা রাজ্যের এই জিনিসগুলো কিনলে কেন?’ স্বামীকে কফির কাপ এগিয়ে দিয়ে হেসে বললেন প্রিন্স-মহিষী। ‘মানে বেড়াতে বেরোই। দোকানের কাছাকাছি হতেই জার্মান ভাষায় পীড়াপীড়ি করে : ‘বাবাজি, হুজুর, জাঁহাপনা।’ কিন্তু যেই ‘জাঁহাপনা’ বলে অমনি আর পারি না, খসে যায় দশ টালার।
‘এ শুধু একঘেয়ে লাগার ফলে’, প্রিন্স-মহিষী বললেন।
‘একঘেয়েমির ফলে তো বটেই। এত একঘেয়ে যে ভেবে পেতাম না কি করি।’
‘একঘেয়ে লাগবে কেন, প্রিন্স? জার্মানিতে এখন মন লাগার মত জিনিস কত’, বললেন মারিয়া ইয়েঙ্গেনিয়েভনা।
‘হ্যাঁ, মন লাগার সব জিনিসই আমি জানি : প্রন স্যুপ জানি, মটরশুটির সসেজ জানি। সবই জানা।’
‘না, যাই বলুন প্রিন্স, তাদের প্রথা-প্রতিষ্ঠান খুবই চিত্তাকর্ষক’, বললেন কর্নেল।
‘চিত্তাকর্ষক কিসে? সবাই ওরা তামার পয়সার মত তুষ্ট : সবাইকে হারিয়েছে। কিন্তু আমি তুষ্ট থাকব কিসে? আমি তো কাউকে হারাইনি। শুধু নিজেই নিজের হাইবুট খুলে নিজেই রাখ দরজার বাইরে। সকালে উঠে তখনই পোশাক পরে সালোঁতে যাও অখাদ্য চা খেতে। এ কি আর বাড়ির মত! তাড়াহুড়া না করে ঘুম ভাঙল, রাগ হল কিছু- একটায়, গজগজ করলাম, সুস্থ হয়ে উঠলাম ভালোরকম, সব কিছু ভেবে দেখলাম, তাড়াহুড়া নেই। ‘
‘কিন্তু সময় যে টাকা-আপনি সেটা ভুলে যাচ্ছেন’, বললেন কর্নেল।
‘কোন সময়! এমন সময় কাছে যখন গোটা মাসের দাম এক পয়সা, আবার এমন সময় আসে কখন কোন টাকাতেই আধঘণ্টা সময়ও কেনা যাবে না। তাই না কিটি? কি হল তোর, অমন ব্যাজার যেঃ
‘আমি ঠিক আছি।’
‘চললেন কোথায়? বসুন আরও কিছুক্ষণ’, ভারেঙ্কাকে বললেন প্রিন্স।
‘আমার বাড়ি যেতে হবে’, উঠে দাঁড়িয়ে ভারেঙ্কা বলল এবং আবার হেসে লুটিয়ে পড়ল।
পোশাক ঠিক করে নিয়ে সে বাড়ির ভেতর ঢুকল টুপি নেবার জন্য। টিকিও গেল তার পিছু পিছু। ভারেঙ্কাকে পর্যন্ত এখন অন্যরকম লাগছে। আগে তাকে যা বলে কল্পনা করেছিল তার চেয়ে খারাপ নয়, কিন্তু অন্যরকম।
‘ওহ্, অনেকদিন এমন হাসিনি’, ছাতা আর ব্যাগ নিয়ে ভারেঙ্কা বলল, ‘কি সুন্দর লোক আপনার বাবা!’ কিটি চুপ করে রইল।
‘আবার কখন দেখা হবে?’ জিজ্ঞেস করল ভারেঙ্কা।
‘মা পেত্রভদের ওখানে যাবে ভাবছিল। আপনি থাকবেন সেখানে?’ ভারেঙ্কাকে একটু বাজিয়ে দেখবার জন্য কিটি বলল।
‘থাকব’, ভারেঙ্কা বলল, ‘ওরা চলে যাবার তোড়জোড় করছে। আমি কথা দিয়েছি যে বাঁধাছাঁদায় সাহায্য করব।’
‘তাহলে আমিও যাব।’
‘না-না, আপনি কেন?’
‘কেন নয়? কেন নয়? কেন নয়?’ চোখ বড় বড় করে বলল কিটি ভারেঙ্কাকে যেতে না দিয়ে তার ছাড়া চেপে ধরল, ‘না-না, একটু দাঁড়ান, কেন নয়?
‘এমনি; আপনার বাবা এসেছেন। তাছাড়া আপনার সামনে ওঁরা সংকোচ বোধ করেন।’
‘না, আপনি বলুন, কেন আপনি চান না যে পেত্রভদের ওখানে আমি ঘনঘন যাই। আপনি সেটা চান না তো? কেন?’
ভারেঙ্কা শান্তভাবে বলল, ‘আমি তো তা বলিনি।’
‘না, বলুন দয়া করে!’
ভারেঙ্কা বলল, ‘সব বলব?’
‘সব, সব!’
‘বলার বিশেষ কিছু নেই, শুধু এই যে মিখাইল আলেক্সেয়েভিচ (এটি চিত্রকরের নাম) আগে তাড়াতাড়ি চলে যেতে চাইছিলেন, কিন্তু এখন যেতে চাইছেন না’, হেসে বলল ভারেঙ্কা।
‘তারপর! তারপর!’ বিষণ্নভাবে ভারেঙ্কার দিকে তাকিয়ে কিটি তাড়া দিল।
‘মানে, কেন জানি আন্না পাভলোভনা বলছিলেন যে উনি যেতে চাইছেন না কারণ আপনি এখানে আছেন। অবশ্য এটা বলা সঙ্গত হয়নি, কিন্তু এই নিয়ে, আপনাকে নিয়ে ঝগড়া বাঁধে। আর জানেনই তো, রোগীরা কেমন খিটখিটে হয়।’
কিটি আরও বেশি ভ্রূকুটি করে চুপ করে রইল আর ভারেঙ্কা একাই কথা বলে গেল, চেষ্টা করল তাকে নরম, শান্ত করে আনতে, দেখতে পাচ্ছিল যে কিটি ফেটে পড়তে যাচ্ছে, তবে জানত না সেটা কান্নায় নাকি কথায়।
‘তাই আপনার না যাওয়াই বরং ভালো…আপনি বুঝে দেখুন, রাগ করবেন না…’
‘আমার ঠিকই হয়েছে, ঠিকই হয়েছে!’ ভারেঙ্কার হাত থেকে ছাতটা কেড়ে নিয়ে তাড়াতাড়ি করে বলল কিটি, তাকিয়ে রইল বন্ধুর চোখ এড়িয়ে।
বান্ধবীর ছেলেমানুষি রাগ থেকে হাসি পেয়েছিল ভারেঙ্কার, কিন্তু ভর হল ওর মনে ঘা লাগবে। বলল, ঠিক হয়েছে মানে? আমি বুঝতে পারছি না।’
‘ঠিক হয়েছে কারণ এ সবই ছিল ভান, প্রাণ থেকে নয়, ভেবেচিন্তে করা। যে লোকটা আপন নয়, পর, তার জন্যে কি দায় ঠেকেছিল আমার? আর এখন দাঁড়াল যে ঝগড়ার কারণ হলাম আমি, আমাকে যা করতে বলা হয়নি, তাই আমি করেছি। এ জন্যে যে এ সবই ভান! ভান করার?’ আস্তে করে বলল ভারেঙ্কা।
