‘আমরা যাব না, এ কথা বলতে পাঠালে যে বড়’, আরো রেগে, স্পষ্টতই গলার স্বর তাঁকে মানছে না, যেমনটা চেয়েছিলেন কথায় তেমন সুর ফুটছে না বলে আরো উত্ত্যক্ত হয়ে ভাঙা গলায় আরেকবার ফিসফিস করলেন চিত্রকর।
‘ওহ্ সৃষ্টিকর্তা! আমি যে ভেবেছিলাম আমরা যাচ্ছি না’, স্ত্রী জবাব দিলেন বিরক্তিভরে 1
‘কেন, যখন…’ কাশি এল তাঁর, হতাশায় হাত ঝাঁকালেন 1
প্রিন্স টুপিটা সামান্য তুলে চলে গেলেন মেয়েকে সাথে করে।
‘ওহ্!’ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন প্রিন্স, ‘ওহ্, কি অভাগা!’
‘হ্যাঁ, বাবা’, কিটি বলল, ‘আর জানো, ওঁর তিনটা ছেলেমেয়ে। কোন চাকর-বাকর নেই, আয়ও নেই বললেই হয়। কি খানিকটা পান একাডেমি থেকে।’ চাঙ্গা হয়ে শোনাতে লাগল কিটি, তার সাথে আন্না পাভলোভনার সম্পর্কের বিচিত্র পরিবর্তনের ফলে তার মধ্যে যে উত্তেজনা জেগেছিল, চেষ্টা করল সেটা চাপা দিতে।
আরে, ওই তো মাদাম টাল’, কিটি বলল একটা ঠেলা গাড়ি দেখিয়ে, তাতে ছাতার নিচে ধূসর আর নীলে জড়ানো কি একটা পড়ে ছিল বালিশে ঠেস দিয়ে।
তিনিই মাদাম টাল। তাঁর পেছনে মুখ ভার করে দাঁড়িয়ে ছিল একজন ঘণ্ডা গোছের জার্মান মুনিষ, যে তাঁকে ঠেলে নিয়ে যায়। পাশেই শণচুলো এক সুইডিশ কাউন্ট, কিটি তাকে নামে চেনে। জনকতক রোগী ঠেলাটার কাছে ঘুরঘুর করছে, মহিলাটিকে দেখছে যেন তিনি অদ্ভূত একটা ব্যাপার।
প্রিন্স এগিয়ে গেলেন তাঁর কাছে। সাথে সাথেই কিটি তাঁর চোখে দেখতে পেল বিদ্রূপের শিখা যা তাকে বিচলিত করেছিল। প্রিন্স মাদাম টালের কাছে গিয়ে কথা বললেন চমৎকার ফরাসি ভাষায় যা আজকাল খুব কম লোকেই বলে আর সেটা বললেন অসাধারণ সশ্রদ্ধ ও সুমধুর ভঙ্গিতে।
‘জানি না আমাকে আপনার মনে আছে কিনা, তবে আমার কন্যার প্রতি আপনার সহৃদয়তার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ দেব বলে আমার কথা আপনাকে মনে করিয়ে দিতে হবে।’
‘প্রিন্স আলেক্সান্দর শ্যেরবাৎস্কি’, মাদাম টাল বললেন তাঁর স্বর্গীয় চোখ তুলে আর তাতে অসন্তোষ নজরে পড়ল কিটির, ‘খুব খুশি হলাম। আপনার মেয়েকে ভারি ভালোবেসে ফেলেছি আমি।’
‘আপনার স্বাস্থ্য এখনো খারাপ যাচ্ছে?’
‘হ্যাঁ, ওতে আমি অভ্যস্ত হয়ে গেছি’, এই বলে মাদাম টাল পরিচয় করিয়ে দিলেন সুইডিশ কাউন্টের সাথে।
প্রিন্স বললেন, ‘আপনি কিন্তু বদলেছেন খুবই কম। দশ কি এগারো বছর আপনাকে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি।’
‘হ্যাঁ, সৃষ্টিকর্তা আমাদের ক্রুশ দেন, আর বইবার শক্তিও দেন। প্রায়ই অবাক লাগে, এ জীবন লম্বা হয়ে চলেছে কিসের লক্ষ্যে?…ওই দিকটায়!’ বিরক্তিভরে তিনি বললেন ভারেঙ্কাকে, যে ঠিকমত তাঁর পায়ে কম্বল ঢাকা দিতে পারছিল না।
‘নিশ্চয় ভালো কাজ করার জন্য’, প্রিন্স বললেন হাসি চোখে।
‘সে বিচারের ভার আমাদের নয়’, প্রিন্সের মুখভাব লক্ষ্য করে মাদাম শ্টাল বললেন, ‘তাহলে বইটা আমাকে পাঠাচ্ছেন তো প্রিয়বর কাউন্ট? অনেক ধন্যবাদ আপনাকে’, যুবক সুইডিশটিকে বললেন তিনি।
‘এই!’ কাছেই দণ্ডায়মান মস্কো কর্নেলকে দেখে চেঁচিয়ে উঠলেন প্রিন্স। মস্কো কর্নেল এসে জুটল তাঁদের সাথে। মাদাম শ্টালকে অভিবাদন করে মেয়ে আর কর্নেলকে নিয়ে প্রিন্স চলে গেলেন।
‘এই আমাদের আভিজাত্য, প্রিন্স!’ শ্লেষ করার ইচ্ছায় বললেন মস্কো কর্নেল, তাঁর সাথে মাদাম শ্টালের পরিচয় নেই বলে তাঁর ওপর কর্নেলের একটা রাগ ছিল।
‘সেই একই রকম রয়ে গেছে’, প্রিন্স জবাব দিলেন।
‘ওঁর অসুখের আগে আপনি ওঁকে জানতেন প্রিন্স, মানে শয্যাশায়ী হবার আগে?’
‘হ্যাঁ, শয্যাশায়ী হন আমার সাথে পরিচয় থাকার সময়েই’, প্রিন্স বললেন।
‘শুনেছি, দশ বছর উঠে দাঁড়াতে পারছেন না।’
‘উঠে দাঁড়ান না। কারণ, ওঁর পা খাটো। ওঁর গড়নটা খুবই কুৎসিত….’
‘হতে পারে না, বাবা!’ চেঁচিয়ে উঠল কিটি।
‘কু-লোকে তাই বলে। তোর ভারেঙ্কাকে জবর সইতে হচ্ছে’, প্রিন্স যোগ করলেন, ‘ওহ্, ধন্য এসব রোগী মর্যাদাবতী!’
‘আহ্, না বাবা!’ উত্তেজিত হয়ে আপত্তি করল কিটি, ‘ভারেঙ্কা ওঁকে মহাপুরুষ জ্ঞান করে। তাছাড়া কত ভালো কাজ করেন উনি। যাকে খুশি জিজ্ঞেস কর না। সবাই ওঁকে আর আলিনা টালকে জানে।’
‘তা হতে পারে’, কনুই দিয়ে কিটির হাতে চাপ দিয়ে প্রিন্স বললেন, ‘তবে ভালো কাজটা এমনভাবে করাই ভালো যাতে যাকেই জিজ্ঞেস করা যাক কেউ জানবে না।’
কিটি চুপ করে গেল কিছুই তার বলার নেই বলে নয়; বাবার কাছেও সে তার গোপন ভাবনা উদ্ঘাটিত করতে চাইছিল না। তবে আশ্চর্য ব্যাপার, পিতার দৃষ্টিভঙ্গি মেনে নেবে না, তার পূততমে তাঁকে প্রবেশ করতে দেবে না বলে কিটি যতই তৈরি হোক, মাদাম শ্টালের যে মহামানবের মূর্তি সে তার প্রাণের মধ্যে বহন করে এসেছে পুরো এক মাস, সেটা চিরকালের মত অদৃশ্য হল পোশাক পরানো মানুষরূপী এক মূর্তির মত, যখন বোজা যায় যে ওটা পোশাক। রইল শুধু খর্বপদ এক নারী যে শুয়ে থাকে কারণ গড়নটা তার কুৎসিত, আর নিরীহ ভারেঙ্কাকে সে কষ্ট দেয় কারণ কম্বলটা সে ঠিকমত জড়াতে পারেনি। কল্পনার কোন প্রয়াসেই আগের মাদাম টালকে আর ফেরানো গেল না।
পঁয়ত্রিশ
ঘরের লোকজন, চেনা-পরিচিত, এমন কি যে জার্মান বাড়িওয়ালার ওখানে তাঁরা উঠেছিলেন, তাঁকেও–প্রিন্স তাঁর খোশমেজাজে সংক্রমিত করলেন। কিটির সাথে প্রস্রবণ থেকে ফিরে এবং কর্নেল, মারিয়া ইয়েঙ্গেনিয়েভনা আর ভারেঙ্কাকে কফি খেতে নিমন্ত্রণ করে প্রিন্স বাগানে বাদাম গাছের তলায় টেবিলে আর চেয়ারগুলো এনে সেখানে টেবিল সাজাতে বললেন। প্রিন্সের ফুর্তিতে বাড়িওয়ালা আর চাকর-বাকররাও চাঙ্গা হয়ে উঠল। তাঁর বদান্যতার কথা তারা জানত। আধঘণ্টা পরে ওপরতলার বাসিন্দা, হামবুর্গের রুগ্ণ ডাক্তারও বাদাম গাছের তলে সমবেত হাসি-খুশি সুস্থ রুশীদের এই দলটাকে জানালা দিয়ে দেখতে লাগল ঈর্ষাভরে। পাতাগুলোর কম্পমান ছোট ছোট ছায়ার তলে, সাদা টেবিলক্লথের ওপর কফিপট, রুটি, মাখন, পনির, ঠাণ্ডা ফাউল সাজানো টেবিলের কাছে বসে বেগুনি রিবন লাগানো টুপি পরে প্রিন্স-মহিষী কাপ আর মাখন মাখানো রুটি এগিয়ে দিচ্ছিলেন। প্রিন্স বসেছিলেন অন্য প্রান্তে, খেতে খেতে উচ্চকণ্ঠে ফুর্তিতে কথা বলছিলেন। নিজের কাঝে প্রিন্স রাখলেন তাঁর কেনা জিনিসগুলো—খোদাই করা ছোট ছোট বাক্স, হুইসিল, নানা ধরনের কাগজ-কাটা ছুরি, যা তিনি গাদা গাদা কিনেছিলেন প্রতিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে। সেগুলো তিনি সবাইকে বিলি করতে লাগলেন, দাসী লিস্হেন আর গৃহস্বামীকেও। এঁর সাথে তিনি হাসি-ঠাট্টা করছিলেন তাঁর মজাদার ভুল-ভাল জার্মান ভাষায়, বোঝাচ্ছিলেন যে কিটি সেরে উঠেছে এখানকার পানির গুণে নয়, তাঁর বাড়ির চমৎকার খানা, বিশেষ করে প্রন স্যুপের জন্য। প্রিন্স-মহিষী, কিন্তু স্বাস্থ্যকেন্দ্রে থাকার গোটা সময়টাই তাঁর মধ্যে এত সজীবতা আর ফুর্তি কখনো দেখা যায়নি। বরাবরের মত কর্নেল হাসছিলেন প্রিন্সের রসিকতায়। কিন্তু ইউরোপের প্রসঙ্গে, যা তিনি মন দিয়ে অধ্যয়ন করেছেন বলে ভাবতেন, তিনি পক্ষ নিলেন প্রিন্স-মহিষীর। রসিক প্রিন্স যা-কিছু বলছিলেন তাতে হেসে কুটিপাটি হচ্ছিলেন দয়াবতী মারিয়া ইয়েঙ্গেনিয়েভনা আর কিটি কখনও দেখেনি, প্রিন্সের রসিকতায় ভারেঙ্কাও ক্ষীণ তবে সংক্রামক হাসিতে নেতিয়ে পড়ছিল।
