আদরের কন্যা যখন তাঁর বাহুলগ্না হয়েছে তখন একটা গর্ব আর যৌবন ফিরে আসার মত একটা অনুভূতি হলেও এখন নিজের বলিষ্ঠ চলন, মেদপুষ্ট দীর্ঘ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের জন্য যেন অস্বস্তি আর লজ্জা হল। নিজেকে প্রায় জনসমক্ষে নগ্ন কোন লোকের মত মনে হল তাঁর 1
‘তোর নতুন বন্ধুদের সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দে তো’, কনুই দিয়ে মেয়ের হাতে চাপ দিয়ে তিনি বললেন, ‘আমি তোর এই অখাদ্য সোডেনকেও ভালোবেসে ফেলেছি তোকে এমন সারিয়ে তুলেছে বলে। শুধু বড় মন খারাপ লাগে তোদের এখানে। এ লোকটা কে?’
পরিচিত অপরিচিত যাদের দেখা গেল, কিটি বলল তারা কে। বাগানে ঢোকার মুখে দেখা হল অন্ধ মাদাম বের্তে আর তাঁর সহচরীর সাথে। কিটির গলা শুনতে পেয়ে বৃদ্ধা ফরাসিনীর মুখখানা যে রকম মর্মস্পর্শী হয়ে উঠল তাতে আনন্দ হল প্রিন্সের। তখনই উনি অত্যধিক ফরাসি সৌজন্য কথা বলতে লাগলেন প্রিন্সের সাথে, তাঁর এমন চমৎকার মেয়ে বলে প্রিন্সকে প্রশংসা করলেন, একেবারে আকাশে তুললেন কিটিকে, বললেন সে একটি রত্ন, মুক্তা, সান্ত্বনাদাত্রী দেবী।
‘তাহলে ও দুই নম্বর দেবী’, প্রিন্স বললেন হেসে, ‘মাদমোয়াজেল ভারেঙ্কাকে কিটি বলে দেবী পয়লা নম্বরের।’
‘ও, মাদমোয়াজেল ভারেঙ্কা, সে সত্যিকারেরই দেবী, এতে আর বলার কি আছে, কথার সূত্র ধরে বললেন মাদাম বের্তে।
গ্যালারিতে দেখা হয়ে গেল স্বয়ং ভারেঙ্কার সাথেই। মনোরম একটা লাল হাত-ব্যাগ নিয়ে সে তাড়াতাড়ি এগিয়ে এল তাদের দিকে।
কিটি তাকে বলল, ‘এই যে বাবা এসে গেছেন। ‘
ভারেঙ্কার সব কিছু যেমন সহজ, স্বাভাবিক, তেমনিভাবে সে একটা ভঙ্গি করল যা মাথা নোয়ানো আর অর্ধোপবেশন অভিনন্দনের মাঝামাঝি এবং তৎক্ষণাৎ প্রিন্সের সাথে স্বাভাবিক সহজ কথাবার্তা শুরু করল যা সে করে সবার সাথেই।
‘বলাই বাহুল্য আমি আপনার কথা জানি, খুবই জানি’, প্রিন্স তাকে বললেন হেসে; কিটি বুঝল তাকে ভালো লেগেছে প্রিন্সের, তাই আনন্দ হল তার, ‘কোথায় যাবার অত তাড়া আপনার?’
‘মা এখানে আছেন’, কিটির দিকে ফিরে সে বলল, ‘সারা রাত তাঁর ঘুম হয়নি, ডাক্তার বলেছেন বাইরে বেরোতে। আমি তাঁর কাজ নিয়ে যাচ্ছি।’
‘তাহলে এটিই পয়লা নম্বরের দেবী!’ ভারেঙ্কা চলে যেতে বললেন প্রিন্স।
কিটি দেখতে পাচ্ছিল যে প্রিন্স ভারেঙ্কাকে নিয়ে হাসাহাসি করতে চান কিন্তু তা পারছেন না, কারণ ভারেঙ্কাকে তাঁর ভালো লেগেছে।
‘তা এবার তোর সব বন্ধুদের দেখা যাবে’, যোগ দিলেন প্রিন্স, ‘মাদাম টালকেও, যদি আমাকে চিনতে তাঁর আপত্তি না থাকে।’
‘ওঁকে তুমি চিনতে নাকি, বাবা?’ মাদাম শ্টালের উল্লেখে প্রিন্সের চোখে বিদ্রূপের শিখা জ্বলে উঠতে দেখে সভয়ে জিজ্ঞেস করল কিটি।
‘ওঁর স্বামীকে চিনতাম, ওঁকেও খানিকটা, পাইয়েটিস্টদের দলে উনি নাম লেখাবার আগে।’
‘পাইয়েটিস্ট কি বাবা?’ কিটি বলল, মিসেস শ্টালের ভেতরকার যে গুণাবলির সে অত কদর করে, তার আবার কোন নাম থাকতে পারে ভেবে তয় হয়েছিল তার।
‘আমি নিজেই ঠিক জানি না। শুধু এটুকু জানি যে, সব কিছুর জন্য উনি ধন্যবাদ দেন সৃষ্টিকর্তাকে! যত কিছু দুর্ভাগ্য ঘটেছে, স্বামী যে মারা গেল, তার জন্য সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ। হাস্যকরই দাঁড়াচ্ছে। কেননা দুজনের বনিবনা ও ছিল না।’
‘এ কে? কি করুণ মুখ!’ বেঞ্চিতে বসা একটা অদীর্ঘদেহী রোগীকে দেখে প্রিন্স জিজ্ঞেস করলেন। লোকটার পরনে বাদামি ওভারকোট, সাদা পেন্টালুন যা তার মাংসহীন পায়ের হাড়ের ওপর অদ্ভুত সব ভাঁজ ফেলেছে।
ভদ্রলোক তাঁর পাতলা হয়ে আসা কোঁকড়া চুল থেকে স্ট্র হ্যাট খানিকটা তুললেন, দেখা দিল টুপির দরুন অসুস্থ-রক্তিম একটা উঁচু কপাল।
কিটি লাল হয়ে উঠে বলল, ‘ইনি পেত্রভ, চিত্রকর। আর উনি তাঁর স্ত্রী’, কিটি যোগ দিলে আন্না পাভলোভনাকে দেখিয়ে। ওঁরা যখন এগিয়ে আসছিলেন ঠিক সেই সময়েই ভদ্রমহিলা যেন ইচ্ছে করেই পথ থেকে ছুটে গেলেন ছেলেকে আনতে।
‘কি করুণ আর কি মিষ্টি ওঁর মুখ!’ প্রিন্স বললেন, ‘তুই ওঁর কাছে গেলি না যে? কি যেন উনি বলতে যাচ্ছিলেন তোকে?’
‘বেশ, তাহলে যাই’, নির্দ্বিধায় ঘুরে এল কিটি, ‘আজ কেমন আছেন?’ পেত্রভকে জিজ্ঞেস করল সে।
লাঠিতে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে পেত্রভ সসংকোচে তাকালেন প্রিন্সের দিকে।
প্রিন্স বললেন, ‘এটা আমার মেয়ে। আসুন পরিচয় করা যাক।’
মাথা নুইয়ে হাসলেন চিত্রকর, উদ্ঘাটিত হল আশ্চর্য ঝকঝকে সাদা দাঁত।
‘কালকে আমরা আপনাকে আশা করেছিলাম, প্রিন্সেস’, কিটিকে তিনি বললেন।
কথাটা বলতে গিয়ে তিনি টলে উঠলেন, আর সেটার পুনরাবৃত্তি করে দেখাতে চাইলেন যে ওটা তাঁর ইচ্ছে করে করা।
‘আমি আসব ভেবেছিলাম, কিন্তু ভারেঙ্কা বলল যে আন্না পাভলোভনা তাকে বলতে পাঠিয়েছেন যে আপনারা যাবেন না।’
‘যাব না মানে?’ লাল হয়ে উঠে এবং তৎক্ষণাৎ কেশে ফেলে পেত্রভ বললেন, চেয়ে চেয়ে খুঁজতে লাগলেন স্ত্রীকে, ‘আনেতা, আনেতা!’ জোরে ডাকলেন তিনি, তাঁর সরু সাদা ঘাড়ে দড়ির মত ফুটে উঠল মোটা মোটা শিরা।
আন্না পাভলোভনা কাছে এলেন।
‘আমরা যাব না, এ কথা তুমি প্রিন্সেসকে বলতে পাঠিয়েছিলে কেন?’ গলা ভেঙে গিয়ে উত্ত্যক্ত স্বরে ফিসফিস করলেন তিনি।
‘ধন্যবাদ, প্রিন্সেস!’ আন্না পাভলোভনা বললেন একটা ভান করা হাসি হেসে, যা মোটেই তাঁর আগেকার হাসির মত নয়। প্রিন্সকে বললেন, ‘পরিচয় করে খুব খুশি হলাম। সবাই অনেকদিন থেকে আপনাকে আশা করছিল।’
