কিটি বলল যে, তাদের ভেতর কিছুই হয়নি এবং সে একেবারেই বুঝতে পারছে না কেন আন্না পাভলোভনাকে তার ওপর যেন অসন্তুষ্ট বলে মনে হচ্ছে। নিতান্ত সত্যি কথাই বলল কিটি। তার প্রতি আন্না পাভলোভনার মনোভাব বদলাবার কারণ সে জানত না, তবে অনুমান করতে পারছিল। যে জিনিসটা সে অনুমান করছিল, সেটা সে মাকে বলতে পারত না, নিজেকেও না। এটা এমন একটা জিনিস যা জানা থাকলেও নিজের কাছে পর্যন্ত তা বলা যায় না। ভুল করাটা এতই ভয়ঙ্কর আর লজ্জার ব্যাপার।
এই পরিবারটির সাথে কিটি তার সম্পর্কের স্মৃতিচারণ করতে লাগল বারম্বার। দেখা হলে আন্না পাভলোভনার গোলগাল সহৃদয় মুখে যে সরল আনন্দ ফুটে উঠতো, সে কথা মনে পড়ল তার; মনে পড়ল রোগীকে নিয়ে তাদের গোপন কথাবার্তা, কাজ করা তার বারণ, কাজ থেকে তার মন সরিয়ে বেড়াতে নিয়ে যাবার জন্য তাদের চক্রান্ত; তাকে ‘আমার কিটি’ বলে যে ডাকত, কিটিকে ছাড়া যে শুতে চাইতো না, যে ছোট ছেলেটা তার ন্যাওটা হয়ে উঠেছিল তার কথা। কি ভালোই-না ছিল সব! তারপর মনে পড়ল লম্বা-ঘাড়, বাদামী কোট গায়ে শীর্ণাধিকশীর্ণ পেত্রভকে; তাঁর পাতলা হয়ে আসা কোঁকড়া চুল, সপ্রশ্ন নীল চোখ যাতে প্রথম-প্রথম ভয় লাগত কিটির, কিটির উপস্থিতিতে নিজেকে উৎফুল্ল উৎসাহিত দেখাবার জন্য তাঁর রুগ্ন প্রয়াস। সমস্ত ক্ষয়রোগীকে দেখেই তার যে বিতৃষ্ণা বোধ হত, তাঁর ক্ষেত্রেও যে বিতৃষ্ণা কাটিয়ে ওঠার জন্য কিটির প্রচেষ্টা, তাঁকে কি বলবে তা ভেবে ঠিক করার জন্য তার উদ্যোগ মনে পড়ল কিটির। উনি যে ভীরু-ভীরু মর্মস্পর্শী দৃষ্টিতে তার দিকে চাইত, তাতে সমবেদনা, অস্বস্তির বিচিত্র অনুভূতি এবং পরে দয়া-দাক্ষিণ্যের যে চেতনা জাগত, তা মনে পড়ল। কি ভালোই-না ছিল এই সব কিছুই! তবে এ সবই ছিল প্রথম দিকটায়। এখন, কয়েক দিন আগে হঠাৎ মাটি হয়ে গেল সব কিছু। আন্না পাভলোভনা কিটিকে দেখে একটা ভান করা ঔৎসুক্য প্রকাশ করলেন এবং ক্রমাগত লক্ষ্য করতে লাগলেন তাকে আর স্বামীকে।
তার উপস্থিতিতে পেত্রভের এই মর্মস্পর্শী আনন্দই কি আন্না পাভলোভনার শীতলতার কারণ?
‘হ্যাঁ’, মনে পড়ল কিটির, ‘আন্না পাভলোভনার মধ্যে কি যেন একটা ছিল অস্বাভাবিক, তাঁর সদয়তার সাথে যা মোটেই মেলে না, দু’দিন আগের মতও নয় যখন সখেদে তিনি বলেছিলেন, ‘এই তো, কেবলি আপনার অপেক্ষায় থেকেছে, আপনাকে ছাড়া কফি খেতেও চাইছিল না যদিও দুর্বল হয়ে পড়েছে ভয়ানক।’
‘হ্যাঁ, আমি যখন পেত্রভকে কম্বল দিলাম, সেটাও বোধ হয় তার খারাপ লেগেছিল। এ সবই নেহাৎ সহজ ব্যাপার, কিন্তু এমন অপ্রস্তুতের মত সে জিনিসটা নিলে আর এত বেশিক্ষণ ধরে ধন্যবাদ জানাল আমাকে যে আমার নিজেরই অপ্রস্তুত লাগছিল। তারপর আবার আমার ওই পোর্ট্রেটটা; ভারি চমৎকার এঁকেছে। কিন্তু প্রধান কথা তার দৃষ্টিটা— বিব্রত আর কমনীয়। হ্যাঁ-হ্যাঁ, তাই বটে!’ সভয়ে মনে মনে পুনরুক্তি করল কিটি, ‘না-না, এ হতে পারে না, হওয়া উচিত নয়। ভারি করুণ লাগে যে ওকে।’
তার নবজীবনের মাধুর্য এই সন্দেহটা বিষাক্ত করে দিল।
চৌত্রিশ
জল-চিকিৎসার কোর্স শেষ হবার আগে প্রিন্স শ্যেরবাৎস্কি যিনি কার্লসবাডের পর বাডেন-বাডেন আর কিসিনগেনে রুশ বন্ধুদের কাছে গিয়েছিলেন, তাঁর কথায় রুশী প্রাণে ডুব দিতে, তিনি ফিরে এলেন স্ত্রী-কন্যার কাছে।
প্রবাসজীবন সম্পর্কে প্রিন্স ও প্রিন্স-মহিষীর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল একেবারে বিপরীত। প্রিন্স-মহিষীর কাছে সবই লাগত অপরূপ, রুশ সমাজে তাঁর দৃঢ় প্রতিষ্ঠা সত্ত্বেও প্রবাসে তিনি চেষ্টা করতেন ইউরোপীয় মহিলাদের মত হতে যা তিনি ছিলেন না,–কেননা তিনি হলেন রুশী ভদ্রঘরের মেয়ে,—তাই দেখাবার ভান করতেন এজন্য যে তাঁর খানিকটা বিব্রত লাগছে। উলটো দিকে প্রবাসের সব কিছু বিছ্ছিরি লাগত প্রিন্সের, পীড়িত বোধ করতেন ইউরোপীয় জীবনে, নিজের রুশী অভ্যাসাদি আঁকড়ে থাকতেন আর ইচ্ছে করে দেখাতে চাইতেন যে উনি আসলে যা তার চেয়েও কম ইউরোপীয়। প্রিন্স ফিরলেন রোগা হয়ে, গালের চামড়া ঝুলে পড়েছে, কিন্তু অত্যন্ত খোশ মেজাজে। মেজাজ আরও শরিফ হয়ে উঠল যখন দেখলেন কিটি একেবারে সেরে উঠেছে। মিসেস শ্টাল ও ভারেঙ্কার সাথে কিটির সৌহার্দের খবরে এবং কিটির মধ্যে কি একটা পরিবর্তন প্রিন্স-মহিষী লক্ষ্য করেছেন সেটা জানায় প্রিন্স বিচলিত হন এবং তাঁকে ছাড়াই কেউ বা কিছু মেয়েকে আকৃষ্ট করল সাধারণত তিনি যে ঈর্ষা বোধ করতেন সেটা মাথাচাড়া দিলে, ভয় হল মেয়ে আবার তাঁর প্রভাব থেকে সরে তাঁর কাছে অনায়ত্ত কোন ক্ষেত্রে গিয়ে না পড়ে। কিন্তু তাঁর মধ্যে সব সময়ই যে প্রসন্নতা আর প্রফুল্লতা দেখা যেত, কার্লসবাডের পানিতে যা বিশেষ বেড়ে উঠেছিল, তার সমুদ্রে তলিয়ে গেল এসব অপ্রীতিকর সংবাদ।
আসার পরের দিন প্রিন্স তাঁর লম্বা ওভারকোট পরে স্টার্চ দেওয়া কলারের ফুলে ওঠা গাল আর রুশী বলিরেখা নিয়ে অতি খোশ মেজাজে মেয়ের সাথে গেলেন প্রস্রবণে।
চমৎকার ছিল সকালটা; বাগানওয়ালা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হাসিখুশি বাড়ি, ফুর্তিতে কর্মরতা বিয়ার-টানা রক্তিমাননা, রক্তপানি জার্মান পরিচারিকাদের চেহারা, জ্বলজ্বলে সূর্য চোখ জুড়াচ্ছিল; কিন্তু যতই তাঁরা প্রস্রবণের কাছে এসে পড়ছিলেন ততই ঘন ঘন দেখা যাচ্ছিল রুগ্নদের, সচ্ছল জার্মান জীবনের পরিস্থিতিতে তাদের চেহারা মনে হচ্ছিল আরও শোচনীয়। এই বৈপরীত্যে কিটি এখন আর অবাক হয় না। এসব পরিচিত মুখ আর তাদের স্বাস্থ্যের যে অবনতি বা উন্নতি কিটি লক্ষ্য করত, কিটির কাছে তার স্বাভাবিক ফ্রেম ছিল এই জ্বলজ্বলে রোদ, পল্লবের উৎফুল্ল ঝলক, সঙ্গীতের ধ্বনি, কিন্তু প্রিন্সের কাছে জুন মাসের প্রভাতী আলো আর ঝলক, ফ্যাশন-চল, ফুর্তি-জাগানো ওয়াল্জ বাজাচ্ছে যে অর্কেস্ট্রা তার ধ্বনি, বিশেষ করে স্বাস্থ্যবর্তী পরিচারিকাদের চেহারা ইউরোপের সর্বপ্রান্ত থেকে আগত, ভগ্নমনে চলমান শবগুলির সাথে মেলায় কেমন যেন অশালীন আর কদর্য ঠেকল।
