কিন্তু মাদাম শ্টালের চরিত্র যতই সমুন্নত হোক, যতই মর্মস্পর্শী হোক তাঁর জীবন-কাহিনী, যতই উঁচুদরের, স্নিগ্ধ হোক-না কেন তাঁর কথা, তাঁর এমন কয়েকটা দিক কিটির চোখে পড়ল যা বিচলিত করল তাকে। কিটি লক্ষ করল যে, তার আত্মীয়-স্বজনদের কথা জিজ্ঞেস করে মাদাম টাল হাসতেন তাচ্ছিল্যভরে—যা খ্রিস্টীয় করুণার বিপরীত। আরও চোখে পড়ল যে জনৈক ক্যাথলিক যাজকের সাথে কিটি যখন তাঁকে দেখে, মাদাম টাল তখন চেষ্টা করে তাঁর মুখ রাখছিলেন বাতির ছায়ায় এবং বিশেষ রকমের কেমন একটা হাসি ছিল তাঁর মুখে। এই দুটো দিক যত তুচ্ছই হোক, কিটি বিচলিত হত তাতে, মাদাম টাল সম্পর্কে সন্দিহান বোধ করত সে। তবে ভারেঙ্কা, একাকিনী, আত্মীয়- স্বজনহীনা, বন্ধু-বান্ধবহীনা, প্রচণ্ড আশাভঙ্গ; কিছুই যে চায় না, কিছুতে কোন খেদ নেই, এমন একটা পূর্ণতার প্রতিমূর্তি ছিল সে যা কিটির কাছে কেবল স্বপ্ন। ভারেঙ্কাকে দেখে সে বুঝেছিল যে দরকার কেবল নিজেকে ভুলে যাওয়া, ভালোবাসতে হবে অন্যদের, তাহলেই মিলবে প্রশান্তি, সুখ, অপূর্বতা। কিটি তাই হতে চাইছিল। সবচেয়ে ‘গুরুত্বপূর্ণ কি’, সেটা এখন পরিষ্কার বুঝতে পেরে শুধু তাতেই উল্লসিত না হয়ে কিটি মনপ্রাণ নিবেদন করল এই নবোদ্ঘাটিত জীবনের জন্য। মাদাম টাল এবং অন্যরা যাদের নাম তিনি বলেছিলেন তাঁরা কি করেছেন, ভারেঙ্কার কাছ থেকে সে কাহিনী শুনে কিটি তার ভবিষ্যৎ জীবনের একটা ছক করে ফেলল। মাদাম শ্টালের ভাইঝি আলিনা সম্পর্কে তার কাছে অনেক গল্প করেছিল ভারেঙ্কা। কিটিও যেখানেই থাকুক তার মত অভাগাদের খুঁজে বের করবে, যথাসাধ্য সাহায্য করবে তাদের, বাইবেল দেবে, পাপী, তাপী, মুমূর্ষুদের কাছে বাইবেল পড়ে শোনাবে। আলিনা যা করতো, সেভাবে পাপীদের কাছে বাইবেল পড়ে শোনানোটা কিটির কাছে খুবই প্রীতিকর লেগেছিল। তবে এ সবই আপাতত তার গোপন স্বপ্ন, সে কথা সে তার মা বা ভারেঙ্কা, কাউকেই বলেনি।
কিন্তু বড় আকারে নিজের পরিকল্পনা হাসিল করার প্রতীক্ষায় থাকলেও এখনই, এই স্বাস্থ্যপল্লীতেই, যেখানে রুগ্ন আর অভাগা অনেক, সেখানেই ভারেঙ্কাকে অনুকরণ করে কিটি তার নবনীতি প্রয়োগের সুযোগ পেল সহজেই।
প্রথমে প্রিন্স-মহিষীর নজরে পড়েছিল শুধু এই যে তিনি যাকে বলতেন তার মাতন, সেই মাদাম শ্টাল এবং বিশেষ করে ভারেঙ্কার খুবই প্রভাবে পড়েছে কিটি। তিনি দেিেছলেন যে কিটি কেবল ভারেঙ্কার কাজকর্ম অনুকরণ করছে না, অজ্ঞাতসারে তার চলন, বলন, চোখ মিটমিট করার ধরনও নকল করছে। তবে পরে প্রিন্স-মহিষী লক্ষ্য করলেন যে এই মোহটা ছাড়াও মেয়ের মধ্যে ঘটছে কি একটা যেন গুরুতর আত্মিক ওলট-পালট।
প্রিন্স-মহিষী দেখলেন যে রোজ সন্ধ্যায় মাদাম শ্টালের উপহার দেওয়া ফরাসি বাইবেল পড়ছে কিটি যা আগে সে পড়ত না; সমাজের পরিচিতদের সে এড়িয়ে যাচ্ছে, ভারেঙ্কার তত্ত্বাবধানাধীন রোগীদের, বিশেষ করে পেত্রভ নামে এক রুগ্ন চিত্রকরের দরিদ্র পরিবারের দেখাশোনা করছে। স্পষ্টতই কিটির গর্ব হত এই জন্য যে এই পরিবারে সে করুণাময়ী ভগিনীর ব্রত পালন করছে। এ সবই খুব ভালো, তার বিরুদ্ধে আপত্তির কিছু দেখলেন না প্রিন্স-মহিষী, আর সেটা আরও এজন্য সে পেত্রভের স্ত্রী ছিলেন অতি সুচরিতা মহিলা আর জার্মান প্রিন্সেস কিটির ক্রিয়াকলাপ লক্ষ্য করে তার প্রশংসা করতেন, তাকে বলতেন সান্ত্বনা দাত্রী দেবী। এ সবই খুব ভালো হত যদি বাড়াবাড়ি না থাকত। কিন্তু প্রিন্স-মহিষীর চোখে পড়ল যে মেয়েটা তার চরমে গিয়ে পৌঁছছে, সে কথা তিনি তাকে বললেনও।
ফরাসি ভাষায় বললেন, ‘কখনোই কোন ব্যাপারেই চরমে যেতে নেই।’
মেয়ে কিন্তু কোন উত্তর দিল না; সে শুধু মনে মনে ভাবলে, যে খ্রিস্টশীলে বলা হয়েছে এক গালে চড় খেলে অন্য গাল পেতে দেবে, কাফতান কেড়ে নিলে দিয়ে দেবে কামিজটাও, তা অনুসরণে কোন চূড়ান্তপনার কথা আসে? কিন্তু এই চূড়ান্তপনাটা প্রিন্স-মহিষীর ভালো ঠেকল না এবং আরও বেশি ভালো ঠেকল না যে তিনি টের পাচ্ছিলেন, কিটি তার অন্তরটা পুরো মেলে ধরতে অনিচ্ছুক। সত্যিই কিটি তার নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও অনুভবগুলো লুকিয়ে রাখছিল মায়ের কাছ থেকে। লুকিয়ে রাখত এজন্য নয় যে সে তার মাকে শ্রদ্ধা করত না, ভালোবাসতো না, কেবল এই জন্য যে উনি তাঁর মা। মাকে ছাড়া সে বরং অন্য সকলের কাছেই এগুলি খুলে বলতে পারত।
‘কেন যেন আন্না পাভলোভনা অনেকদিন আমাদের এখানে আসেনি’, পেত্রভা সম্পর্কে প্রিন্স-মহিষী বললেন। ‘একদিন আমি ডেকে পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু কিসে যেন ওকে অসন্তুষ্ট মনে হল।
‘কই, আমি তো লক্ষ্য করিনি, মা’, কিটি লাল হয়ে বলল।
তুই অনেকদিন ওদের ওখানে যাসনি?
‘কাল আমরা বেড়াতে যাবার তোড়জোড় করছি পাহাড়ে’, কিটি বলল।
‘তা বেশ তো, যা’, মেয়ের বিচলিত মুখের দিকে তাকিয়ে এবং তার কারণ অনুমানের চেষ্টা করে প্রিন্স-মহিষী জবাব দিলেন।
সেদিনই খেতে এল ভারেঙ্কা, জানাল যে কাল পাহাড়ে যাবার ব্যাপারে মত পালটেছেন আন্না পাভলোভনা। প্রিন্স- মহিষী লক্ষ্য করলেন যে কিটি আবার লাল হয়ে উঠেছে।
‘কিটি, পেত্রভদের সাথে তোর কোন মনোমালিন্য হয়নি তো?’ ভারেঙ্কা চলে যাবার পর জিজ্ঞেস করলেন প্রিন্স- মহিষী। ‘আমাদের এখানে ছেলেমেয়েদের পাঠানো, নিজেই বা আসা বন্ধ করল কেন?’
