‘কি ভালো আপনি, কি ভালো!’ তাকে থামিয়ে চুমু খেয়ে চেঁচিয়ে উঠল কিটি, ‘আমি যদি অন্তত কিছুটা আপনার মত হতে পারতাম!’
‘কেন, আপনাকে হতে হবে অন্য কারো মত? আপনি যা, তাতেই তো আপনি ভালো’, তার বিনতী ক্লান্ত হাসি হেসে বলল ভারেঙ্কা।
‘না, মোটেই আমি ভালো নই। কিন্তু আমাকে বলুন তো…দাঁড়ান, দাঁড়ান, একটু বসা যাক’, আবার তাকে বেঞ্চিতে নিজের পাশে বসিয়ে বলরে কিটি, ‘আচ্ছা, বলুন তো, একজন আপনার ভালোবাসাকে তাচ্ছিল্য করল, চাইল না, সেটা কি অপমানকর নয়।’
‘না, তাচ্ছিল্য সে করেনি। আমার বিশ্বাস, আমাকে সে ভালোই বেসেছিল। তবে সে ছিল বাধ্য ছেলে…’
‘তা ঠিক, কিন্তু যদি মায়ের ইচ্ছেয় নয়, নিজেই সে?…’ কিটি বলল, টের পাচ্ছিল যে নিজের গোপনে ব্যথা সে ফাঁস করে ফেলছে, লজ্জায় রাঙা হয়ে ওঠা তার মুখ ডুবিয়ে দিচ্ছে তাকে।
‘তাহলে সে খারাপ কাজ করত, তার জন্যে আমার কোন কষ্ট হত না’, বুঝতে পারছিল সে ব্যাপারটা তাকে নিয়ে নয়, কিটিকে নিয়ে।
‘কিন্তু অপমান? অপমান যে ভোলা যায় না, ভোলা যায় না’, কিটি বলল শেষ বলনাচের সময় সঙ্গীত বিরতিতে তার দৃষ্টির কথা মনে করে।
‘অপমান কিসে? আপনি তা খারাপ কিছু করেননি?
‘খারাপের চেয়েও খারাপ, লজ্জা।’
ভারেঙ্কা মাথা নেড়ে হাত রাখলে কিটির হাতে।
বলল, ‘লজ্জা কিসে? যে লোকটা আপনার সম্পর্কে উদাসীন তাকে তো আর আপনি বলতে পারেন না যে তাকে ভালোবাসেন?’
‘অবশ্যই না একটা কথাও আমি বলিনি, কিন্তু সে তো জানত। না-না, চোখের চাহনি, হাবভাব,সে তো আছে। একশ’ বছর বাঁচলেও তা ভুলব না।’
‘তাতে কি হল? বুঝতে পারছি না আমি। আসল কথা, আপনি তাকে এখন ভালোবাসেন কিনা’, ভারেঙ্কা বলল সোজাসাপটা।
‘ঘৃণা করি ওকে; নিজেকে আমি ক্ষমা করতে পারছি না।’
‘তা কি হল?’
‘লজ্জা, অপমান।’
‘সব কিছু এমন করে মনে লাগা কি ভালো। এমন কোন মেয়ে নেই যার এ অভিজ্ঞতা হয়নি’, বলল ভারেঙ্কা, ‘এগুলো তেমন গুরুত্বের কিছু নয়।’
‘কিন্তু কোটা গুরুত্বের?’ অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে কৌতূহলে জিজ্ঞেস করল কিটি।
‘অনেক কিছুই’, হেসে বলল ভারেঙ্কা।
‘কিন্তু কি?’
‘আহ্, অনেক কিছু’, ভেবে পাচ্ছিল না ভারেঙ্কা কি বলা যায়। তবে এই সময় জানালা থেকে শোনা গেল প্রিন্স- মহিষীর গলা :
‘কিটি ঠাণ্ডা পড়ছে! হয় শাল নিয়ে যা, নয় ঘরের ভেতর আয়।’
‘সত্যি সময় হয়ে গেছে’, উঠে দাঁড়িয়ে ভারেঙ্কা বলল, ‘আমাকে আবার এখন মাদাম বের্তের কাছে যেতে হবে। ডেকে পাঠিয়েছেন।’
উদগ্র ঔৎসুক্যে কিটি তার হাত ধরে রইল, দৃষ্টিতে সানুনয় জিজ্ঞেস : ‘কি এটা, কি এই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যা এমন প্রশান্ত দেবে? আপনি জানেন বলুন, আমাকে!’ কিন্তু কিটির দৃষ্টি কি জিজ্ঞাসা করছিল তা মোটেই বোঝেনি ভারেঙ্কা, তার শুধু মনে হল যে তাকে আজ আবার মাদাম বের্তের কাছে যেতে হবে আর বারোটায় পৌঁছতে হবে মায়ের সাথে চা-পানের জন্য। ঘরে ঢুকে তার সুরলিপি গুটিয়ে সে বিদায় নিলে সকলের কাছ থেকে। উদ্যোগ করছিল যাবার।
কর্নেল বলল, ‘আপনাকে আমি পৌঁছে দেব, কেমন?
প্রিন্স-মহিষী সমর্থন করলেন, ‘সত্যি, রাত হয়েছে, একলা যাবে কেমন করে। আমি অন্তত পারাশাকে পাঠাই।’ কিটি দেখল যে ওকে পৌছে দেবার কথায় ভারেঙ্কাকে হাসি চাপতে হল কষ্ট করে।
‘না-না, আমি সব সময় একাই যাই। কখনো কিছুই হয় না আমার’, টুপি নিয়ে সে বলল। আরেকবার চুমু খেলে কিটিকে, তবে কোনটা যে গুরুত্বপূর্ণ তা কিছুই না বলে সতেজ পদক্ষেপে মিলিয়ে গেল গ্রীষ্মের আধো-আঁধারিতে, কি যে গুরুত্বপূর্ণ, কি তাকে দিচ্ছে এই ঈর্ষণীয় প্রশান্তি আর মর্যাদা, সে সাথে করেই সে রহস্য নিয়ে গেল।
তেত্রিশ
কিটির মাদাম টালের সাথে পরিচয় হল এবং ভারেঙ্কার সাথে বন্ধুত্বের সাথে সাথে সে পরিচয় তার ওপর প্রবল প্রভাব ফেলল তাই নয়, সান্ত্বনাও যোগাত তার দুঃখে। সান্ত্বনাটা এখানে যে এই পরিচয়ের কল্যাণে তার কাছে উদ্ঘাটিত হল এক নতুন জগৎ, অতীতের সাথে যার কোন মিল নেই, অপরূপ সমুন্নত এক জগৎ যার উচ্চতা থেকে শান্তভাবে দেখা যায় ওই অতীতকে। সে আবিষ্কার করল যে এতদিন যাবৎ প্রবৃত্তিনির্ভর যে জীবন সে পেয়ে এসেছে, তাছাড়াও আছে এক আত্মিক জীবন। সে জীবন তার কাছে আবির্ভূত হল ধর্মের মধ্য দিয়ে, ছোটবেলা থেকে কিটি যে ধর্মের সাথে পরিচিত, গির্জায় প্রভাবী ও সান্ধ্য যে উপাসনায় পরিচিতদের দেখা মিলতে পারত, পুরোহিতের সাথে স্লাভ স্তোত্র মুখস্থ করতে হত, তার সাথে এ ধর্মের কোন মিল নেই। এ হল সমুন্নত রহস্যময় এক ধর্ম, অপরূপ সব ধ্যান- ধারণা অনুভূতির সাথে তা জড়িত, যাতে বিশ্বাস হয় বিশ্বাস করতে বলা হয়েছে বলে শুধু নয়, ভালোবাসা যায় বলে। কিটি এসব জানতে পারে কারও কথা শুনে নয়। মাদাম শ্টাল কিটির সাথে কথা বলতেন যেন সে এক মিষ্টি শিশু, যাকে দেখে নিজের তারুণ্যের স্মৃতিতে মুগ্ধ হওয়া চলে। শুধু একবার তিনি বলেছিলেন যে মানুষের সমস্ত দুঃখ- কষ্টে সান্ত্বনা মেলে শুধু প্রেমে ও বিশ্বাসে, আমাদের যন্ত্রণায় কোন কষ্টই যিশু খ্রিস্টের কাছে তুচ্ছ নয়। তবে সাথে সাথেই তিনি অন্য প্রসঙ্গে চলে যান। কিন্তু তাঁর প্রতিটি ভাবভঙ্গি, প্রতিটি কথায়, কিটি যাকে স্বর্গীয় বলত, তাঁর তেমন প্রতিটি দৃষ্টিপাতে, ভারেঙ্কার কাছ থেকে তাঁর যে জীবন-কাহিনী কিটি শুনেছিল বিশেষ করে তা থেকে, সব কিছু থেকে কিটি জানল ‘কি গুরুত্বপূর্ণ’, কি সে এতদিন জানত না।
