দশ বছরের বেশি মাদাম টাল বিদেশ থেকে নড়েননি, থাকতেন দক্ষিণে, শয্যাশায়ী। কেউ কেউ বলত যে, মাদাম শ্টাল অতি পরোপকারী ধর্মপ্রাণী মহিলার একটা ভড়ং জুটিয়েছেন, কেউ কেউ আবার বলত যে আসলে তিনি অতি নীতিনিষ্ঠ এক মানুষ, তাঁকে যেমন দেখায় তেমনি অপরের মঙ্গলের জন্যই তিনি দিন টাকান। কেউ জানত না— কি তাঁর ধর্ম।—ক্যাথলিক, প্রটেস্ট্যান্ট নাকি রুশী সনাতনী। কিন্তু একটা ব্যাপার নিঃসন্দেহে, সমস্ত গির্জা আর ধর্মমতের প্রধানদের সাথে তাঁর বন্ধুত্বের সম্পর্ক
ভারেঙ্কা তাঁর সাথে সব সময়ই বিদেশে থেকেছে, এবং মাদাম শ্টালকে যারা জানত, মাদমোয়াজেল ভারেঙ্কাকে তারা যা বলে ডাকত, তাকেও তারা তেমনি জানত আর ভালোবাসত।
এসব খুঁটিনাটি জেনে প্রিন্স-মহিষী তাঁর কন্যার সাথে ভারেঙ্কার ভাব করায় উদ্বেগের কিছু দেখলেন না, সেটা আরও এই জন্য যে ভারেঙ্কার শিক্ষা-দীক্ষা ছিল চমৎকার : দিব্যি বলত ফরাসি, ইংরেজি, আর প্রধান কথা, মাদাম শ্টালের কাছ থেকে ভারেঙ্কা এই বার্তা আনল যে অসুস্থতাবশত প্রিন্স-মহিষীর সঙ্গ পরিচয়স্থাপনে তিনি বঞ্চিত বলে খুব দুঃখিত।
ভারেঙ্কার সাথে পরিচিত হয়ে কিটি কেবলই তার অনুরক্ত হয়ে উঠতে লাগল তার ভেতর নতুন নতুন গুণ আবিষ্কার করতে শুরু করল প্রতিদিন।
ভারেঙ্কা ভালো গান গায় শুনে প্রিন্স-মহিষী সন্ধ্যায় তাকে গাইতে ডাকলেন নিজের বাড়িতে।
‘কিটি বাজায়, পিয়ানো আছে আমাদের, তেমন ভালো নয় অবশ্য, তবে আপনি আমাদের খুবই আনন্দ দেবেন’, প্রিন্স মহিষী বললেন তাঁর হাসির ভান নিয়ে যা কিটির কাছে এখন ঠেকল খুবই অপ্রীতিকর, কারণ সে দেখতে যাচ্ছিল যে গাইবার ইচ্ছে ভারেঙ্কার নেই। তবে ভারেঙ্কা এল সন্ধ্যায়, এল তার সুরলিপির খাতা নিয়ে। প্রিন্স-মহিষী নিমন্ত্রণ করেছিলেন সকন্যা মারিয়া ইয়েভগেনিয়েভনা আর কর্নেলকে।
অপরিচিত লোকেরা এখানে আছে, এতে মনে হল ভারেঙ্কা সম্পর্কে নির্বিকার, সাথে সাথেই সে গেল পিয়ানোর কাছে। নিজেই সে নিজের সঙ্গত করতে পারত না, কিন্তু সুরগুলো তুললে চমৎকার। কিটি ভালো বাজালে তার সাথে।
প্রথম গানটা খাশা গাওয়া হলে প্রিন্স-মহিষী বললেন, ‘অসাধারণ গুণী আপনি।’
সকন্যা মারিয়া ইয়েভগেনিয়েভনা তাকে ধন্যবাদ দিয়ে প্রশংসা করলেন।
জানালার দিকে তাকিয়ে কর্নেল বলল, ‘দেখনু কত লোক জুটেছে আপনার গান শুনতে’, সত্যিই জানালার নিচে বেশ একটা ভিড় জমেছিল।
‘আপনার আনন্দ পেয়েছেন বলে আমি ভারি খুশি’, সহজভাবে বলল ভারেঙ্কা।
সগর্বে কিটি চাইল তার বান্ধবীর দিকে। তার নৈপুণ্য, কণ্ঠস্বর, মুখভাবে সে উচ্ছ্বসিত, কিন্তু তার চেয়েও বেশি এজন্য যে ভারেঙ্কা স্পষ্টতই তার গান সম্পর্কে কিছু ভাবছিল না, প্রশংসায় সে একেবারে নির্বিকার; যেন শুধু জিজ্ঞেস করছিল : আরও গাইতে হবে, নাকি এই যথেষ্ট?
তিনি মনে মনে ভাছিল ‘আমি হলেকি গর্বই-না হত? জানালার নিচে ওই ভিড় দেকে কি আনন্দই-না হত আমার! অথচ ওর কিছুই এসে যায় না। ও শুধু চলেছে আপত্তি না ক’রে মাকে খুশি করার ইচ্ছায়। কি আছে ওর ভেতর? সব কিছু তুচ্ছ করে স্বাধীন, নিশ্চিন্ত হবার শক্তি সে পায় কোথা থেকে? কি যে হচ্ছে করে সেটা জানতে, তার কাছ থেকে সেটা শিখতে!’ প্রশান্ত ওই মুখখানার দিকে তাকিয়ে কিটি ভাবলে। প্রিন্স-মহিষী ভারেঙ্কাকে আরও গাইতে বললেন, সেও আরেকটা গান গাইলে তেমনি শান্ত গলায়, চমৎকার, সুন্দর পিয়ানোর কাছে খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে, রোগা রোদপোড়া হাতে তাল দিয়ে।
খাতায় পরের গানটা ছিল ইতালীয়। কিটি তার মুখবন্ধ বাজিয়ে তাকাল ভারেঙ্কার দিকে।
‘এটা থাক’, লাল হয়ে উঠে বলল ভারেঙ্কা।
সভয়ে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে কিটি তাকিয়ে রইল ভারেঙ্কার মুখে।
‘মানে অন্য একটা’, পাতা উলটিয়ে তাড়াতাড়ি সে বলল, তখনই সে বুঝেছিল যে গানটার সাথে কিছু-একটার সম্পর্ক আছে।
সুরলিপিতে আঙুল দিয়ে ভারেঙ্কা বলল, ‘না, এটা গাওয়া যাক।’ আগের মতই একই রকম শান্ত নিরুত্তাপ সুন্দর গলায় সে গানটা গাইল।
গান শেষ হতে সবাই ধন্যবাদ দিল, তাকে গেল চা খেতে। কিটি আর ভারেঙ্কা গেল বাড়ির লাগোয়া বাগানটায়। কিটি বলল, ‘ওই গানটার সাথে আপনার কোন স্মৃতি বিজড়িত আছে, তাই না?’ তারপর তাড়াতাড়ি করে যোগ দিলে, ‘না-না, কিছু বলতে হবে না। শুধু জানতে চাই, সত্যি কিনা?’
‘না, তা কেন? বলব’, সহজভাবে উত্তরের অপেক্ষা না করে ভারেঙ্কা বলে গেল ‘হ্যাঁ, এটা স্মৃতিই বটে। একসময় তা খুবই কষ্টকর ছিল। একটা লোককে আমি ভালোবাসতাম, গানটা গেয়েছিলাম তার কাছে।’
বড় বড় চোখ মেলে কিটি নীরবে সহৃদয়ে চাইল ভারেঙ্কার দিকে।
‘আমি ওকে ভালোবেসেছিলাম, সেও আমাকে ভালোবাসত; কিন্তু মায়ের আপত্তি ছিল, বিয়ে করে সে অন্যকে। এখন সে থাকে আমাদের কাছ থেকে সামান্য দূরে মাঝে মাঝে দেখতে পাই তাকে। আপনি ভাবেননি যে আমারও একটা রোমান্স ছিল?’ সে বলল মুখ তার সামান্য খেলে গেল সেই আগুনটা যা একদিন তাকে গোটাই জ্বালিয়ে তুলেছিল বলে কিটি অনুভব করল।
‘ভাবিনি মানে? আমি যদি পুরুষ হতাম, তাহলে আপনাকে জানার পর আর কাউকে ভালোবাসতে আমি পারতাম না। শুধু বুঝি না, মায়ের জন্যে কেমন করে সে ভুলতে পারল আপনাকে, অসুখী করল। হৃদয় বলে কিছু ছিল না ওর। ‘আরে না, খুব ভালো লোক সে, আমিও অসুখী নই; বরং খুবই সুখী। তাহলে, আর আর গান গাইব না তো?’ বাড়ির দিকে যেতে গিয়ে সে বলল।
