পেছনে ফেরার জন্য ওঁরা ঘুরতেই হঠাৎ আর উচ্চকণ্ঠ নয়, শোনা গেল চিৎকার। লেভিন থেমে গিয়ে চ্যাঁচাচ্ছিল, ডাক্তারও চটে উঠেছে। ভিড় জমে গেল তাদের ঘিরে। কিটিকে নিয়ে প্রিন্স-মহিষী তাড়াতাড়ি সরে গেলেন আর ব্যাপারটা কি জানার জন্য কর্নেল যোগ দিল ভিড়ে।
কয়েক মিনিট পরে সে এসে তাঁদের সঙ্গ ধরল।
প্রিন্স-মহিষী জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি হল ওখানে?’
কর্নেল জবাব দিল, ‘লজ্জার ব্যাপার! ভয় শুধু একটা জিনিসে–বিদেশে রুশীর সাথে সাক্ষাৎ। এই ঢ্যাঙা ভদ্রলোকটি গালাগালি করছিলেন ডাক্তারকে, ঠিকমত চিকিৎসা করছেন না বলে শাসাচ্ছিলেন, লাঠিও আস্ফালন করেছেন। একেবারে লজ্জার কথা!’
প্রিন্স-মহিষী বললেন, ‘ইস, কি বিচ্ছিরি! তা শেষ হল কিসে?’
‘হ্যাঁ, ওই যে, ওই ব্যাঙের ছাতা টুপি মাথায় মেয়েটা, রুশী বোধ হয়, ও এসে সামলালে, ধন্যবাদ ওকে’, বললে কর্নেল।
‘মাদমোয়াজেল ভারেঙ্কা?’ রুশি হয়ে জিজ্ঞেস করল কিটি।
‘হ্যাঁ-হ্যাঁ, সবার আগে সে ছুটে আসে, ভদ্রলোকটার হাত ধরে নিয়ে যায় তাঁকে। ‘
‘দেখলেন তো মা’, মাকে বলল কিটি, ‘অথচ ওর প্রশংসায় আমি পঞ্চমুখ বলে আপনি অবাক হন। ‘
পরের দিন থেকে অজানা বান্ধবীটিকে লক্ষ্য করে কিটির চোখে পড়ল যে মাদমোয়াজেল ভারেঙ্কার অন্য সমস্ত তত্ত্বাবধানস্থ লোক-এর যে সম্পর্ক, লেভিন আর মহিলাটির সাথেও তার সে সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। তাদের কাছে যেত সে, কথাবার্তা বলত, মহিলাটি বিদেশী ভাষা জানত না বলে তার দোভাষীর কাজ করে দিত।
ভারেঙ্কার সাথে পরিচয় করার জন্য মাকে আরও বেশি করে পীড়াপীড়ি করতে লাগল কিটি। আর যে মাদাম টাল কেমন একটা গুমর দেখিয়ে থাকেন, তাঁর সাথে পরিচয়ের জন্য যেন প্রথম এগিয়ে আসাটা প্রিন্স-মহিষীর পক্ষে যতই অপ্রীতিকর লাগুক, ভারেঙ্কা সম্পর্কে খবরাখবর নিলেন তিনি আর এ পরিচয়ে ভালো বিশেষ কিছু না হলেও খারাপ কিছু হবে না জেনে তিনি নিজেই প্রথম গেলেন ভারেঙ্কার কাছে, পরিচয় করলেন তার মেয়ে যখন প্রস্রবনে গেছে আর ভারেঙ্কা রুটির দোকানের সামনে থেমেছে, সেই সময়টা বেছে নিয়ে প্রিন্স-মহিষী গেলেন তার কাছে।
‘আপনার সাথে পরিচয় করতে দিন’, মর্যাদায় ভরা হাসি হেসে তিনি বললেন, ‘আমার মেয়ে আপনার প্রেমে পড়েছে’, বললেন, ‘আমাকে হয়ত আপনি চেনেন না, আমি…’
‘এটা পারস্পরিকের চেয়েও বেশি’, তাড়াতাড়ি করে জবাব দিলে ভারেঙ্কা।
প্রিন্স-মহিষী বললেন, ‘কাল আমাদের অভাগ্য দেশবাসীর কি উপকারই-না আপনি করেছেন।’
ভারেঙ্কা লাল হয়ে উঠল। বলল, ‘কই, মনে পড়ছে না তো। কিছুই করিনি মনে হয়।’
‘সে কি, ওই লেভিনকে যে একটা বিছ্ছিরি কাণ্ড থেকে উদ্ধার করলেন।’
‘ও হ্যাঁ, তার সঙ্গিনী আমাকে ডাকে। আমি ওকে শান্ত করার চেষ্টা করি। খুবই ও অসুস্থ, ডাক্তারের ওপর খুশি নয়। এই ধরনের রোগীদের সেবা-শুশ্রূষা করার অভ্যাস আছে আমার।’
‘শুনেছি যে আপনি থাকেন মেঁতনে, আপনার বড় কাকী বোধ হয় মাদাম শ্টালের সাথে। আমি ওঁর বৌমাকে জানতাম।’
‘না, উনি আমার বড় কাকী নন। আমি ওঁকে মা বলি, তবে ওঁর আপনার আমি নই। আমাকে উনি মানুষ করেছেন’, জবাব দিতে গিয়ে আবার লাল হয়ে উঠল ভারেঙ্কা।
কথাগুলো সে বললে এত সহজে, সহজ খোলামেলা মুখখানা ছিল এত মিষ্টি যে প্রিন্স-মহিষী বুঝলেন কেন তাঁর কিটি ভারেঙ্কার এত অনুরাগী।
জিজ্ঞেস করলেন, ‘তা এই লেভিনের কি হল?’
‘ও চলে যাচ্ছে’, জবাব দলে ভারেঙ্কা।
মা তার অজানা বন্ধুর সাথে পরিচয় করেছেন, এই আনন্দে জ্বলজ্বলে হয়ে এই সময় প্রস্রবণ থেকে ফিরল কিটি। ‘তাহলে কিটি তোর ভয়ানক যা ইচ্ছা ছিল আলাপ করার মাদমোয়াজেল…’
‘স্রেফ ভারেঙ্কা’, হেসে সে বললে, ‘সবাই আমাকে তাই বলে ডাকে।
আনন্দে লাল হয়ে উঠল কিটি। অনেকক্ষণ ধরে করমর্দন করল তার নতুন বান্ধবীর সাথে, সে হাত তার প্রত্যুত্তর দিল না, স্থির হয়ে রইল তার করবন্ধনে, কিন্তু মাদমোয়াজেল ভারেঙ্কার মুখ জ্বলজ্বল করে উঠল মৃদু, উৎফুল্ল, যদিও কিছুটা বিষণ্ণ হাসিতে, দেখা গেল বড় বড় কিন্তু সুন্দর, দাঁতগুলো।
বললে, ‘আমি নিজেই অনেকদিন থেকে চাইছিলাম।’
‘কিন্তু আপনি সব সময় এত ব্যস্ত…’
‘আরে মোটেই না, কোন কাজই নেই আমার’, জবাব দিলে ভারেঙ্কা, কিন্তু সেই মুহূর্তেই তার নবপরিচিতদের ছেতে যেতে হল, কেননা জনৈকা অসুস্থার ছোট ছোট দুই রুশ মেয়ে ছুটে এল তার কাছে।
চিৎকার করে বলল, ‘ভারেঙ্কা, তোমাকে মা ডাকছে!’
তাদের সাথে সাথে চলে গেল ভারেঙ্কা।
বত্রিশ
তার সম্পর্ক ভারেঙ্কার অতীত আর মাদাম টালের সাথে এবং স্বয়ং মাদাম শ্টাল সম্পর্কে প্রিন্স-মহিষী যেসব খুঁটিনাটি জানলেন তা এই :
মাদাম শ্টাল সম্পর্কে একদল বলত যে তিনি স্বামীকে জ্বালিয়ে মেরেছেন, আরেক বলত যে স্বামীই তাঁর নীতিহীন আচরণে তাঁকেই জ্বালিয়েছেন। হীন সব সময়ই ছিলেন এক রুগ্ন, উচ্ছ্বাসপ্রবণা মহিলা। স্বামীর সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করে যখন তাঁর প্রথম সন্তান হয়, সেটা জন্মলগ্নেই মারা যায়। মাদাম শ্টালের সংবেদনাধিক্য জানা থাকায় সংবাদটায় তাঁর মৃত্যু ঘটতে পারে এই আশংকায় তাঁর আত্মীয়রা সেই রাতেই, পিটার্সবুর্গের সেই গৃহেই আর সেই রাতে দরবারী বাবুর্চির যে মেয়েটার জন্ম হয়েছিল তাকে তাঁর সন্তান বলে চালায়। মেয়েটা ভারেঙ্কা। ভারেঙ্কা তাঁর মেয়ে নয়, এটা জানতে পারেন মাদাম টাল, কিন্তু মেয়েটাকে মানুষ করেই যান, সেটা আরো এই জন্য যে এই ঘটনার পর ভারেঙ্কার আত্মীয়-স্বজন কেউ ছিল না।
