মাদমোয়াজেল ভারেঙ্কার প্রথম যৌবন বিগত এমন নয়, কিন্তু সে যেন যৌবনহীন এক সত্তা : তাকে ঊনিশও বলা যায়, ত্রিশও বলা যায়। তার আকৃতি বিচার করলে মুখের রুগ্ন বিবর্ণতা সত্ত্বেও তাকে কুশ্রীর চেয়ে বরং সুশ্রীই বলতে হয়। শরীরের বড় বেশি কৃশ আর মাঝারি দৈর্ঘ্যের সাথে মাথাটা বেমানান না হলে তার গড়নটা ভালোই : কিন্তু পুরুষের কাছে তার আকর্ষণ থাকার কথা নয়। সে ছিল এখনো পাপড়ি মেলে রাখা সুন্দর একটা ফুল যা বিবর্ণ হয়ে গেছে গন্ধহীন। তাছাড়া পুরুষের কাছে আকর্ষণীয় হওয়া তার পক্ষে আরও এই কারণে সম্ভব নয় যে কিটির মধ্যে যা ছিল বড় বেশি পরিমাণে সেটায় ঘাটতি ছিল তার, যথা—জীবনের সংযত বহ্নি আর নিজের আকর্ষণ সম্পর্কে সচেতনতা।
তাকে সব সময় মনে হত কাজে ব্যস্ত আর তাতে সন্দেহ থাকারও কথা নয়, এবং সেজন্যই মনে হত বাইরের কোন কিছুতে তার আগ্রহ থাকতে পারে না। নিজের সাথে এই বৈপরীত্যের দরুনই কিটি আকৃষ্ট হত তার দিকে। কিটি অনুভব করত তার ভেতরে, তার জীবনধারার মধ্যে কিটি এমন কিছুর সন্ধান পাবে যা এখন সে খুঁজে মরছে যন্ত্রণায় : জীবনে আগ্রহ, জীবনের মর্যাদা—এবং সেটা সমাজে পুরুষের সাথে বালিকার যে সম্পর্কটা কিটির কাছে কদর্য লাগে, খরিদ্দারের প্রত্যাশায় পশরার লজ্জাকর প্রদর্শনী বলে মনে হয় তার বাইরে। নিজের অজানা বান্ধবীটিকে কিটি যতই লক্ষ্য করছিল ততই সে নিঃসন্দেহ হয়ে উঠল যে মেয়েটাকে সে যা কল্পনা করেছে ঠিক সেইরকমেরই নিখুঁত প্রাণী সে, ততই তার সাথে ভাব করার তার ইচ্ছে হচ্ছিল।
দিনে বার কয়েক করে দেখা হত মেয়ে দুটোর আর প্রতি বার কিটির চোখ বলত : ‘কে আপনি? কি রকম লোক আপনি? আপনি তো সেই অপরূপ মানুষ যা আমি কল্পনা করেছি, তাই না? তবে দোহাই আপনার’, দৃষ্টি তার যোগ দিত, ‘ভাববেন না যে আমি জোর করে আপনার সাথে ভাব করতে চাইব। স্রেফ আপনাকে দেখে মুগ্ধ হই আমি, ভালোবাসি আপনাকে।’—’আমিও ভালোবাসি আপনাকে, ভারি ভারি মিষ্টি আপনি। সময় থাকলে আরও বেশি ভালোবাসতাম, দৃষ্টি দিয়ে জবাব দিত অজানা মেয়েটা। আর সত্যিই কিটি দেখেছে যে মেয়েটা সব সময়ই ব্যস্ত; হয় সে একটা রুশ পরিবারের ছেয়েমেয়েদের নিয়ে আসছে প্রস্রবণ থেকে, নয় রোগীণীর জন্য কম্বল এনে তাকে টাকা দিচ্ছে, অথবা চেষ্টা করছে তিতিবিরক্ত কোন রোগীকে খুশি করতে কিংবা কফির সাথে খাবার মত বিস্কুট কিনে দিচ্ছে কারও জন্য।
শ্যেরবাৎস্কিরা আসার অল্প কিছু পরেই সকালের প্রস্রবণে দেখা দিতে থাকল আরো দুটো লোক, সকালের বিরূপে মনোযোগ আকর্ষণ করল তারা। একজন ভারি লম্বা, কিছুটা কুঁজো একটা পুরুষ, প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড হাত গায়ে মাপসই নয় এমন একটা খাটো পুরানো ওভারকোট, কালো কালো নিরীহ অথচ সেই সাথে ভয়ংকর চোখ, অন্যজন সুশ্রী একটা নারী, মুখে দাগ-ফুটকি, পরনে অতি কদর্য রুচিহীন পোশাক। এরা যে রুশী তা জানতে পেরে কিটি কল্পনায় এক অপূর্ব মর্মস্পর্শী রোমান্স রচনা করতে শুরু করেছিল। কিন্তু প্রিন্স-মহিষী স্বাস্থ্যাবাসের তালিকা থেকে জেনে এলেন যে এরা নিকোলাই লেভিন আর মারিয়া নিকোলায়েভনা, কিটিকে তিনি বোঝালেন কি বদলোক এই লেভিন, লোক দুটো সম্পর্কে কিটির সব স্বপ্ন উবে গেল। মা তাকে যা বলেছেন তার জন্য ততটুকু নয়, যতটুকু লোকটা কনস্তান্তিনের ভাই বলে, এ দুটো লোককে হঠাৎ কিটির মনে হল অতিমাত্রায় অপ্রীতিকর। এই লেভিন এখন তার মাথা ঝাঁকাবার অভ্যাস দ্বারা একটা অদম্য বিতৃষ্ণা জাগিয়ে তুলল কিটির মনে
তার মনে হল, বড় বড় ভয়ংকর যে চোখ দিয়ে লোকটা একদৃষ্টে তাকে দেখে, তাতে ফুটে উঠছে বিদ্বেষ আর বিদ্রূপ। সে ওর সাথে সাক্ষাৎ এড়িয়ে চলার চেষ্টা করতে লাগল।
একত্রিশ
দিনটা খুবই বিছ্ছিরি। সারাটা সকালই বৃষ্টি পড়েছে। রোগীরা গ্যালারিতে ভিড় করেছে ছাতি নিয়ে।
মা আর মস্কো কর্নেলের সাথে কিটি যাচ্ছিল। ফ্রাঙ্কফুর্টে রেডিমেড কেনা তার ইউরোপীয় ফ্রক-কোটটা নিয়ে ফুর্তিতে বাবুয়ানি দেখাচ্ছিল কর্নেলটি। গ্যালারির এক পাশ দিয়ে যাচ্ছিল লেভিন। তাকে এড়াবার জন্য ওরা চলল অন্য পাশ দিয়ে। নিচের দিকে কান নামানো কালো একটা টুপি আর গাঢ় রঙের একটা পোশাক পরে ভারেঙ্কা অন্ধ একটা ফরাসি মহিলাকে নিয়ে যাচ্ছিল গ্যালারি বরাবর আর কিটির সাথে দেখা হলেই প্রতিবার বন্ধুর মত তারা দৃষ্টি বিনিময়ে করছিল।
নিজের অচেনা বন্ধুকে অনুসরণ করে আর সে যে প্রসবণের কাছেই এবং তাদের সাক্ষাৎ হতে পারে এটা লক্ষ্য করে কিটি বলল, ‘মা, ওর সাথে একটু কথা বলব?’
মা বললেন তা তোর যখন অতই ইচ্ছে, তাহলে আমি নিজেই ওর কাছে যাব। ওর মধ্যে কি এমন পেলি তুই? সঙ্গিনী তো। যদি চাস, মাদাম শ্টালের সাথে পরিচয় করে নেব। আমি ওঁর বৌমাকে চিনতাম—গরবে মাথা তুলে যোগ দিলেন প্রিন্স-মহিষী।
কিটি জানত যে মাদাম টাল যেন ইচ্ছে করেই তাঁর সাথে পরিচয় এড়িয়ে গেছেন বলে প্রিন্স-মহিষী ক্ষুব্ধ। পীড়াপীড়ি করল না কিটি। ফরাসিনীকে যখন ভারেঙ্কা গেলাস এগিয়ে দিচ্ছিল তখন তাকে দেখে কিটি বললেন, ‘আশ্চর্য, কি মিষ্টি! দ্যাখো, দ্যাখো, কত সহজ আর মিষ্টি।’
‘তো মাতন-এ আমার মজাই লাগছে’, প্রিন্স-মহিষী বললেন, ‘না, বরং ফিরে যাই।’ লেভিন তার সঙ্গিনী আর একজন ডাক্তারের সাথে তাদের দিকেই এগিয়ে আসছে দেখে যোগ করলেন তিনি। উচ্চকণ্ঠে সক্রোধ লেভিন কি যেন বলছিল ডাক্তারকে।
