গাড়ির কোণে ঠেস দিয়ে আন্না দু’হাতে মুখ ঢেকে ডুকরে উঠলেন। কারেনিন নড়লেন না, সম্মুখপানে স্থির দৃষ্টির বদল হল না তাঁর। কিন্তু মুখের ভাব তাঁর হঠাৎ হয়ে উঠল মৃতের মত সুগম্ভীর, পল্লীভবনে যাওয়া পর্যন্ত সেটা বজায় রইল। বাড়ির কাছে এসে তিনি একইভাবে মুখ ফেরালেন আন্নার দিকে
‘বেশ! কিন্তু বাহ্যিক শোভনতা বজায় রাখার দাবি করছি আমি যদ্দিন না, গলা তাঁর কেঁপে গেল, ‘যদ্দিন না নিজের সম্মান রক্ষার ব্যবস্থা করছি এবং সে কথা আপনাকে বলছি।’
আগে তিনি নেমে আন্নাকে নামতে সাহায্য করলেন। চারক-বারকদের সামনে তিনি নীরবে তাঁর হাতে চাপ দিয়ে আবার গাড়িতে উঠে রওনা দিলেন পিটার্সবুর্গে।
ঠিক তাঁর পরেই বেত্সির চারপাশি এল আন্নার কাছে চিরকুট নিয়ে :
‘আমি আলেকসেই-এর কাছে লোক পাঠিয়েছিলাম কেমন আছে জানতে। সে লিখেছে যে সুস্থ এবং অক্ষতই আছে, তবে মনমরা।’
আন্না ভাবলেন, ‘সে তো আসবেই! ওকে আমি সব বলে ভালোই করেছি।’
আন্না ঘড়ি দেখলেন। এখনও তিন ঘণ্টা বাকি, শেষ সাক্ষাতের স্মৃতি আগুন ধরিয়ে দিচ্ছিল তাঁর রক্তে।
‘মাগো, কি জ্বলজ্বলে! ভয়ংকর, তবু ভালোবাসি তার মুখ আর ঐ অলৌকিক আলোটা দেখতে… স্বামী! হ্যাঁ… যাগ্গে, সৃষ্টিকর্তা, সব চুকে গেছে।’
আন্না কারেনিনা – ২.৩০
ত্রিশ
যেখানে লোকেরা এসে জোটে তেমন সব জায়গার মত শ্যেরবাৎস্কিরা যে ছোট জার্মান স্বাস্থ্যপল্লীতে এসেছিলেন সেখানেও সমাজের যেন একটা কেলাসন ঘটেছিল। যাতে সে সমাজের প্রতিটি সদস্যের এক-একটা সুনির্দিষ্ট ও অপরিবর্তনীয় স্থান স্থির হয়ে যায়। জলকণা যেমন ঠাণ্ডায় সুনির্দিষ্ট ও অপরিবর্তনীয় রূপে হিম-স্ফটিকের বিশেষ একটা আকার নেয়, ঠিক তেমনি স্বাস্থ্যপল্লীতে নবাগতরা প্রত্যেকে তৎক্ষণাৎ তাদের স্বাভাবিক স্থানটিতে স্থিতিলাভ করে।
প্রিন্স শ্যেরবাৎস্কি স্ত্রী ও কন্যাসহ যে বাসা নিয়েছিলেন, তাঁর যা নামডাক এবং যেসব পরিচয় স্থাপিত হয়েছিল তাতে সাথে সাথেই তিনি কেলাসিত হয়ে গেলেন তাঁদের নির্দিষ্ট ও পূর্বনির্ধারিত স্থানে।
সে বছর স্বাস্থ্যপল্লীতে খাঁটি এক নৈকষ্য জার্মান প্রিন্স থাকায় সমাজের কেলাসন ঘটল আরও সোৎসাহে। প্রিন্স- মহিষীর ইচ্ছে হল অবশ্য-অবশ্যই তাঁর মেয়েকে নিয়ে যাবেন জার্মান। প্রিন্সেসের কাছে এবং পরের দিনই সে অনুষ্ঠানটি সম্পন্ন করলেন তিনি। প্যারিসে ছাপা অতি সাধারণ, অর্থাৎ অতি বাহারে একটা গ্রীষ্মকালীন পোশাকে লাবণ্যভরে কিটি নিচু হয়ে অভিবাদন জানাল। প্রিন্সেস বললেন, ‘আশা করি, এই সন্দুর মুখখানায় গোলাপেরা ফিরে আসবে শিগগিরই’, আর শ্যেরবাৎস্কিদের কাছে তৎক্ষণাৎ নির্ধারিত হয়ে গেল জীবনের নির্দিষ্ট একটা ধারা যা থেকে আর বেরিয়ে আসা চলে না। শ্যেরবাৎস্কিদের পরিচয় হল জনৈক ইংরেজ লেডির পরিবার, জার্মান কাউন্টেস আর গত যুদ্ধে আহত তাঁর ছেলের সাথে, একজন সুইডিশ পণ্ডিত এবং ম. কানুট ও তাঁর বোনের সাথে। তবে অজ্ঞাতসারেই শ্যেরবাৎস্কিদের প্রধান সমাজ হয়ে দাঁড়াল মস্কোর মহিলা মারিয়া ইয়েভগেনিয়েভনা রতিশ্যেভা এবং তাঁর কন্যা যাকে কিটির ভালো লাগত না। কেননা কিটির মতই সে অসুস্থ হয়ে পড়েছে ভালোবাসার জন্য, আর মস্কোর একজন কর্নেল, কিটি তাকে জানত ছেলেবেলাতে, দেখেছে উর্দি আর কাঁধপট্টি পরা চেহারায়, কিন্তু এখানে ক্ষুদে ক্ষুদে চোখ আর রঙচঙা গলাবন্ধনী পরা খোলা ঘাড়ে লাগত অসম্ভব হাস্যকর আর বিরক্তিজনক। কেননা ওর হাত থেকে রেহাই মিলত না—এদের নিয়ে। এসব যখন পাকাপোক্ত হয়ে গেল তখন ভারি একঘেয়ে লাগত কিটির এবং সেটা আরও এজন্য যে প্রিন্স চলে গেলেন কার্লাডে আর কিটি একা রইল মায়ের সাথে। যাদের সে জানত তাদের সম্পর্কে তার কোন আগ্রহ ছিল না, টের পেত যে ওদের কাছ থেকে নতুন কিছু আর মিলবে না। স্বাস্থ্যপল্লীতে তার প্রধান মানসিক ঔৎসুক্য ছিল যাদের সে জানত না তাদের লক্ষ্য করা, তাদের নিয়ে অনুমান। কিটির যা স্বভাব তাতে লোকের মধ্যে সবচেয়ে ভালোটাই সে দেখতে চাইত, বিশেষ করে যাদের সে চিনত না। এবং এখন কে কি, কেমন তাদের সম্পর্ক, কি ধরনের লোক তারা, এসব অনুমান করতে গিয়ে কিটি কল্পনায় দেখতে অতি আশ্চর্য আর চমৎকার সব চরিত্র আর তার সমর্থন পেত নিজের পর্যবেক্ষণে।
এ ধরনের লোকদের ভেতর কিটি আকৃষ্ট হয়েছিল স্বাস্থ্যপল্লীতে জনৈকা রুগ্ন রুশী মহিলার সাথে আগত একটা রুশী বালিকায়। মহিলাকে সবাই বলত মাদাম টাল। ইনি খুবই উঁচু সমাজের লোক, কিন্তু এত অসুস্থ যে হাঁটতে পারতেন না, শুধু ভালো আবহাওয়ার বিরল দিনগুলোতেই দেখা দিতেন ঠেলা চেয়ারে। তবে প্রিন্স-মহিষী বোঝালেন, রোগের জন্য ততটা নয়, অহংকারবশেই মাদাম শ্টাল রুশীদের কারো সাথে পরিচয় রাখেন না। রুশী মেয়েটা মাদাম শ্টালের সেবাশুশ্রূষা করত। তাছাড়া স্বাস্থ্যপল্লীতে গুরুতর রুগ্ন ছিল অনেকেই, তাদের সবার সাথে ও মিশত, অতি স্বাভাবিকভাবে দেখাশুনা করত তাদেরও। কিটি যা লক্ষ্য করেছে, রুশ মেয়েটা মাদাম টালের আত্মীয় নয়, আবার মাইনে করা সাহায্যকারিণীও নয় সে, মাদাম টাল তাকে ডাকতেন ভারেঙ্কা বলে, অন্যেরা বলত মাদমোয়াজেল ভারেঙ্কা। মাদাম টাল এবং তার কাছে অপরিচিত অন্যান্যদের সাথে মেয়েটার সম্পর্ক লক্ষ্য করায় কিটির কৌতূহলের কথা ছেড়ে দিলেও যা প্রায়ই হয়, মাদমোয়াজেল ভারেঙ্কার প্রতি একটা অব্যাখ্যাত অনুরাগ বোধ করত সে, আর চোখ- াচোখি হলে টের পেত, তাকেও ভালো লাগে মেয়েটার।
