এ কথা শুনে আন্না ধপ করে বসে পড়ে মুখ ঢাকলেন পাখা দিয়ে। কারেনিন দেখতে পেলেন যে আন্না কাঁদছেন, শুধু চোখের পানি নয়, ফোঁপানিও আটকাতে পারছেন না যাতে স্ফীত হয়ে উঠছে তাঁর বুক। কারেনিন তাঁকে সামলে ওঠার সময় দিয়ে আড়াল করে দাঁড়ালেন।
কিছুক্ষণ পরে তিনি আন্নার উদ্দেশে বললেন, ‘তৃতীয় বার আমি আমার হাত এগিয়ে দিচ্ছি।’ আন্না তাঁর দিকে তাকালেন, ভেবে পাচ্ছিলেন না কি বলবেন। প্রিন্সেস বেত্সি এলেন তাঁর সাহয্যে।
‘না, কারেনিন। আমি আন্নাকে এনেছি, ওকে আমিই পৌঁছে দেব বলে কথা দিয়েছি।’
‘মাপ করবেন প্রিন্সেস’, উনি বললেন সম্ভ্রমভরে হেসে, কিন্তু স্থির দৃষ্টিতে চোখে চোখে তাকিয়ে, ‘কিন্তু আমি দেখতে পাচ্ছি যে আন্না মোটেই সুস্থ নন, আমি চাই উনি আমার সাথে চলুন।
আন্না সন্ত্রস্ত দৃষ্টিতে তাকালেন চারপাশে, বাধ্যের মত উঠে দাঁড়িয়ে স্বামীর বাহুলগ্না হলেন।
‘আমি লোক পাঠাব ওর কাছে, খবর জেনে তোমাকে বলে আসব’, ফিসফিসিয়ে বললেন বেত্সি।
মঞ্চ থেকে বেরোবার পথে যাদের সাথে দেখা হচ্ছিল তাদের সাথে বরাবরের মতই কথা বলছিলেন কারেনিন আর বরাবরের মতই প্রশ্নের জবাব দিয়ে আলাপ চালাতে হচ্ছিল আন্নাকে; কিন্তু তিনি নিজে প্রকৃতিস্থ ছিলেন না, স্বামীর বাহুলগ্না হয়ে যাচ্ছিলেন যেন কোন-এক স্বপ্নের ভেতর দিয়ে
‘জখম হয়েছে কি হয়নি? সত্যি? আসবে কি আসবে না? আজকে কি দেখতে পাব?’ ভাবছিলেন তিনি।
কারেনিনের গাড়িতে তিনি উঠলেন নীরবে, নীরবে বেরিয়ে এলেন গাড়ি-ঘোড়ার ভিড় থেকে। কারেনিন স্বচক্ষে যা দেখেছেন তা সত্ত্বেও তিনি স্ত্রীর সত্যিকার অবস্থা সম্পর্কে ভাবতে চাইছিলেন না। তিনি দেখছিলেন, শুধু বাহ্য লক্ষণ। তাঁর চোখে পড়েছিল যে স্ত্রীর ব্যবহারটা শোভন হয়নি, সেটা তাঁকে বলা তাঁর উচিত বলে তিনি মনে করেছিলেন। কিন্তু এর বেশি কিছু না-বলা শুধু এটুকু বলা তাঁর পক্ষে খুবই কঠিন হচ্ছিল। আন্নার আচরণ কি রকম অশোভন হয়েছে তা বলার জন্য মুখ খুললেন তিনি, কিন্তু অনিচ্ছাক্রমেই বললেন একেবারে অন্য কথা। বললেন, ‘কিন্তু এসব নিষ্ঠুর দৃশ্য দেখার কি ঝোঁক আমাদের। আমি দেখেছি…’
আন্না ঘৃণাভরে বললেন, ‘কি? বুঝতে পারছি না।’
তিনি ক্ষুব্ধ হলেন এবং সাথে সাথেই বলতে শুরু করলেন যা বলতে চাইছিলেন। উনি বললেন, ‘আপনাকে আমার বলা উচিত।’
‘এবার বোঝাপড়া’, আন্না ভাবলেন এবং তাঁর ভয় হল।
‘আপনাকে আমার বলা উচিত যে, আজকে আপনার ব্যবহার অশোভন হয়েছে’, উনি বললেন ফরাসি ভাষায়। স্বামীর দিকে ঝট করে মাথা ঘুরিয়ে আন্না সরাসরি তাকালেন তাঁর চোখে চোখে, কিন্তু আগের মত আমোদের অন্তরাল তাতে ছিল না, ছিল একটা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ভাব, যা দিয়ে বহু কষ্টে তিনি লুকাতে চাইছলেন তাঁর ত্রাস। উচ্চকণ্ঠে বললেন, ‘কিসে অশোভন ব্যবহার করলাম?’
কোচোয়ানের সামনে খোলা জানালাটার দিকে আঙুল দেখিয়ে তিনি বললেন, ‘সাবধান!’
তারপর উঠে শার্সি টেনে দিলেন।
‘অশোভন আপনি কি দেখলেন?’ আবার জিজ্ঞেস করলেন আন্না।
‘একজন ঘোড়াওসয়ার যখন পড়ে যায় তখন যে হতাশা আপনি চাপা দিতে পারেননি, সেটা।’
আন্না আপত্তি করবেন ভেবে তিনি কিছুটা অপেক্ষা করলেন; কিন্তু নিজের সামনের দিকে তাকিয়ে চুপ করে রইলেন আন্না।
‘আমি আপনাকে আগেই বলেছিলাম যে সমাজে এমনভাবে চলবেন যাতে নিন্দুকেরা অপনার বিরুদ্ধে কিছু বলতে না পারে। এক সময় আমি আমাদের আভ্যন্তরীণ সম্পর্কের কথা তুলেছিলাম; এখন সে কথা বলছি না। বলছি বাহ্য সম্পর্কের কথা। আপনি অশোভন আচরণ করেছেন। আমি চাই যেন তার পুনরাবৃত্তি না হয়।’
আন্না তাঁর কথার আধখানাও শোনেননি, তিনি ভয় পাচ্ছিলেন তাঁকে আর ভাবছিলেন, ‘সত্যিই কি ভ্রনস্কি ঘায়েল হয়নি। তার সম্পর্কেই কি লোকে বলছিল যে সে অক্ষত, শুধু পিঠ ভিঙেছে ঘোড়ার?’ স্বামীর কথা শেষ হতে আন্না শুধু ভান করা একটা উপহাসের হাসি হাসলেন, কোন জবাব দিলেন না, কেননা স্বামী যা বলছিলেন তা শোনেননি তিনি কারেনিন শুরু করেছিলেন বেশ সাহস নিয়েই, কিন্তু যখন তিনি পরিষ্কার বুঝতে পারলেন কি কথা তিনি বলছেন, তখন আন্না যে ভয় পাচ্ছিলেন সেটা সঞ্চারিত হল তাঁর মধ্যেও। হাসিটা দেখে একটা অদ্ভুত বিভ্রান্তি তাঁকে পেয়ে বসল।
‘আমার সন্দেহে ও হাসছে। সেবার যা বলেছিল এখন তাই বলবে; আমার সন্দেহের কোন ভিত্তি নেই, ওটা হাস্যকর।’ এখন, সব কিছু যখন অবারিত হবার মুখে তখন তিনি সবচেয়ে বেশি করে চাইছিলেন যে আন্না সেবারের মত উপহাসের সুরে বলুন যে তাঁর সন্দেহের কোন ভিত্তি নেই। তিনি যা জেনেছেন সেটা তাঁর কাছে এত ভয়ংকর যে কোন ভিত্তি নেই। তিনি যা জেনেছেন সেটা তাঁর কাছে এত ভয়ংকর যে তিনি এখন সব কিছু বিশ্বাস করতে প্রস্তুত। কিন্তু আন্নার সন্ত্রস্ত বিমর্ষ মুখের ভাবটা এমন যে প্রতারণারও অবকাশ নেই। বললেন, ‘হয়ত ভুল হচ্ছে আমার। সেক্ষেত্রে ক্ষমা চাইছি।’
‘না, ভুল করেননি’, স্বামীর নিরুত্তাপ মুখের দিকে মরিয়া দৃষ্টিতে আন্না বললেন ধীরে ধীরে, ‘না, ভুল হয়নি আপনার। হতাশ হয়ে উঠেছিলাম আমি, না হয়ে পারি না। আপনার কথা আমি শুনছি, কিন্তু ভাবছি তার কথা। আমি ওকে ভালোবাসি, আমি ওর প্রণয়িনী, আপনাকে আমি সইতে পারি না। ভয় করি, ঘৃণা করি আপনাকে… আপনার যা খুশি করুন আমাকে নিয়ে।
