‘আছে দুই পক্ষ’, পুরানো তর্কটা আবার চালিয়ে গেলেন কারেনিন, ‘যারা দৌড়াচ্ছে আর যার দেখছে, আর দৃশ্যটাকে ভালোবাসা যে দর্শকদের নিচু মানের সুনিশ্চিত লক্ষণ তা আমি মানি, কিন্তু…’
‘প্রিন্সেস, বাজি!’ বেত্সির উদ্দেশে নিচু থেকে শোনা গেল অব্লোন্স্কির গলা, ‘আপনি কার পক্ষে?’
বেত্সি বললেন, ‘আমি আর আন্না প্রিন্স কুজোভলেভের পক্ষে।’
‘আমি ভ্রন্স্কির পক্ষে। বাজি দস্তানা।’
‘রাজি!’
‘কিন্তু কি সুন্দর। তাই না?
তাঁর আশেপাশে যখন এসব কথা হচ্ছিল, ততক্ষণ কারেনিন চুপ করে ছিলেন, কিন্তু আবার শুরু করলেন। ‘মানছি, কিন্তু পৌরুষের খেলা…’ চালিয়ে যেতে চাইছিলেন তিনি।
কিন্তু সেই সময়েই দৌড় শুরু হল, থেমে গেল সমস্ত কথাবার্তা। কারেনিনও চুপ করে গেলেন এবং সবাই ওপরে উঠে দৃষ্টি নিবদ্ধ করল নদীর দিকে। দৌড়ে আগ্রহ ছিল না কারেনিনের। তাই সওয়ারদের দিকে না তাকিয়ে তিনি তাঁর ক্লান্ত চোখ বুলাতে লাগলেন দর্শকদের ওপর। দৃষ্টি তাঁর স্থির হল আন্নার কাছে এসে।
তাঁর মুখটা বিবর্ণ, কঠোর। স্পষ্টতই একজনকে ছাড়া আর কিছুই এবং কাকেও দেখছিলেন না তিনি। খামচে খামচে তিনি চেপে ধরছিলেন পাখা নিঃশ্বাস পড়ছিল না। তাঁর দিকে তাকিয়ে দেখেই তাড়াতাড়ি চোখ ফিরিয়ে নিলেন তিনি দেখতে লাগলেন অন্যান্য মুখ।
‘হ্যাঁ, ঐ মহিলাটি এবং অন্যান্যরাও অতি উত্তেজিত; তা খুবই স্বাভাবিক’, মনে মনে ভাবছিলেন তিনি। আন্নার দিকে তাকাতে চাইছিলেন না তিনি, কিন্তু আপনা থেকেই চোখ তাঁর চলে যাচ্ছিল সেদিকে। আবার তাঁর মুখের দিকে তাকাতে তাকাতে চেষ্টা করলেন সে মুখে যা পরিষ্কার লেখা আছে সেটা না পড়তে আর নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধেই সভয়ে পড়লেন যা তিনি জানতে চাইছিলেন না।
নদীতে কুজোলেভের প্রথম পতনে চঞ্চল হয়ে উঠেছিল সবাই, কিন্তু আন্নার বিবর্ণ বিজয়গর্বিত মুখে কারেনিন পরিষ্কার দেখতে পেলেন, যার দিকে আন্না তাকিয়ে ছিলেন, সে পড়েনি। মাখোতিন আর ভ্রন্স্কি বড় প্রতিবন্ধকটা পেরিয়ে যাবার পর পরবর্তী অফিসার যখন সেখানে পড়ে গিয়ে মাথা ভাঙলেন এবং দর্শকদের মধ্যে রয়ে গেল আতংকের একটা গুঞ্জন, কারেনিন দেখতে পেলেন যে আন্না ঘটনাটা লক্ষ্যই করলেন না এবং চারিপাশে লোক কি কথা বলাবলি করছে সেটা বোঝা শক্ত হচ্ছিল তাঁর পক্ষে। কারেনিন ক্রমেই ঘন ঘন এবং একাগ্র দৃষ্টিতে চাইছিলেন তাঁর দিকে। ছুটন্ত ভ্রন্স্কির দৃশ্যে একেবারে তন্ময় হলেও আন্না টের পাচ্ছিলেন পাশ থেকে স্বামীর নিরুত্তাপ চোখের দৃষ্টি তাঁর ওপর নিবদ্ধ।
আন্না মুহূর্তের জন্য তাকালেন। তাকিয়ে দেখলেন জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে, একটু ভুরু কুঁচকে আবার মুখ ফিরিয়ে নিলেন।
যেন তিনি বললেন, ‘আহ্, আমার বয়েই গেল’, এবং তাঁর দিকে আর একবারও তাকালেন না।
খুবই দুর্ভাগ্যজনক হল ঘোড়দৌড়টা। এতে সতের জন সওয়ারের মধ্যে অর্ধেকের বেশি লোক পড়ে গিয়ে হাড়গোড় ভাঙে। দৌড়ের শেষের দিকে সবাই উত্তেজিত হয়ে ওঠে, সে উত্তেজনা আরো বাড়ে কারণ জার অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন।
ঊনত্রিশ
সবাই চিৎকার-চেঁচামেচি করে তাদের অসন্তোষ জানাচ্ছিল, কার যেন বলা একটা উক্তির পুনরুক্তি করছিল : ‘শুধু সিংহ ছেড়ে দেওয়া সার্কাসটাই বাকি।’ সবারই এমন বীভৎস লাগছিল যে ভ্রন্স্কি যখন পড়ে যান আর আন্না সরবে হাহাকার করে ওঠেন, তখন সেটা কারো কাছে অস্বাভাবিক কিছু ঠেকেনি। কিন্তু তার পরেই আন্নার যে ভাবান্তর দেখা গেল সেটা নিশ্চিতই অশোভন। একেবারে অস্থির হয়ে উঠলেন তিনি, ছটফট করতে লাগলেন ধরা পড়া পাখির মত; কখনো উঠে দাঁড়িয়ে কোথায় যেন যাবার উপক্রম করেন, কখনো আবার বেত্সিকে বলেন : ‘যাওয়া যাক, যাওয়া যাক।’
কিন্তু বেত্সি তাঁর কথা শুনছিলেন না, ঝুঁকে পড়ে তিনি কথা বলছিলেন তাঁর দিকে আগত জেনারেলের সাথে।
কারেনিন আন্নার কাছে এসে সম্ভ্রমভরে হাত এগিয়ে দিলেন।
‘আপনার আপত্তি না থাকলে চলুন যাই’, বললেন ফরাসি, ভাষায়; কিন্তু আন্না শুনছিলেন জেনারেলের কথা, স্বামীকে খেয়াল করলেন না।
জেনারেল বললেন, ‘শুনলাম ওরও পা ভেঙেছে। এ একেবারে অনাসৃষ্টি কাণ্ড।
স্বামীর কথার জবাব না দিয়ে আন্না দূরবীন তুলে দেখতে লাগলেন যে জায়গাটায় ভ্রন্স্কি পড়েছেন। কিন্তু সেটা এত দূরে আর এত লোকে ভিড় করেছে যে কিছুই ঠাহর করা যায় না। দূরবীন নামিয়ে উনি চলে যাবার উপক্রম করলেন, কিন্তু এই সময় এক অফিসার ঘোড়া ছুটিয়ে এসে কি যেন খবর দিল জারকে। আন্না মুখ বাড়িযে সেটা শোনাবার চেষ্টা করলেন।
‘স্তিভা! স্তিভা!’ চেঁচিয়ে ভাইকে ডাকতে লাগলেন তিনি।
কিন্তু সে ডাক ভাইয়ের কানে গেল না। আবার চলে যেতে চাইছিলেন আন্না।
‘আপনি যদি যেতে চান তাহলে আমি আরো একবার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছি’, আন্নার বাহু ছুঁয়ে বললেন কারেনিন। বিতৃষ্ণায় সরে গেলেন আন্না, তাঁর মুখের দিকে না তাকিয়েই জবাব দিলেন : ‘না-না, আমাকে রেহাই দিন। আমি এখানেই থাকব।’
এবার তাঁর চোখে পড়ল, ভ্রন্স্কি যেখানে পড়ে গিয়েছিলেন সেখান থেকে বৃত্ত পেরিয়ে একজন অফিসার ছুটে আসছে মঞ্চের দিকে। বেত্সি রুমাল নেড়ে তাকে ডাকলেন।
অফিসার খবর আনল যে সাওয়ার জখম হয়নি কিন্তু পিঠ ভেঙে গেছে ঘোড়াটার।
