ধর্মের ইতিহাসে আকর্ষণীয় চরিত্রগুলোর একজন, জর্জ ফক্সের সাথে এমনই কিছু ঘটেছিল। সেই সময়টি ছিল সপ্তদশ শতাব্দীর ইংল্যান্ড, যখন চার্চ এবং সমাজের ক্ষমতাবানরা কোনো কারণ ছাড়াই অহংকারে অন্ধ হয়ে বাকি সবার চেয়ে নিজেদের বেশি শ্রেষ্ঠ ভেবে অতিরঞ্জিত নানা আচরণ করতে শুরু করেছিলেন। বিভিন্ন ধরনের পদবি আর তার সাথে আসা বিশেষ ধরনের পোশাক তারা ভালোবাসতেন। তাদের দাবি ছিল অধস্তনরা তাদের সামনে নতজানু হবে এবং মাথার টুপি সরিয়ে তাদের প্রতি সম্মান দেখাবে। যে পদবিগুলো তারা নিজেদের দিয়েছিলেন সেগুলোর মূল উদ্দেশ্য ছিল, তারা যে সাধারণ জনসাধারণের চেয়ে কত উপরে অবস্থান করছেন, সেই তথ্যটি যেন সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করতে পারে। ‘ইয়োর হলিনেস’, ‘ইয়োর এক্সেলেন্সি’, ‘ইয়োর গ্রেস’ ইত্যাদি। ইয়োর ম্যাজেস্টি’ ছিল একধরনের সম্বোধন, যা তাদের সবার উপর এমন একটি অবস্থানে তুলেছিল যে, সাধারণ মানুষরা তাদের পায়ের নিচে পিঁপড়ার মতো হন্তদন্ত হয়ে ছুটে বেড়াতে বাধ্য হতেন। খ্রিস্টানদের মধ্যে এই ধরনের আচরণ একই সাথে বিস্ময়কর, আবার বিস্ময়কর ছিল না। এটি বিস্ময়কর ছিল কারণ, সুস্পষ্টভাবে যিশুর শিক্ষার সাথে এটি সংগতিপূর্ণ ছিল না, যিনি তাদের বলেছিলেন, তার শিষ্যদের মধ্যে আত্মম্ভরিতার কোনো জায়গা নেই। কিন্তু এটি বিস্ময়কর ছিল না কারণ, এটাই ছিল পার্থিব উপায় এবং যতই নিজেকে পবিত্র আলখেল্লায় ঢেকে রাখার চেষ্টা করুক না কেন, ধর্ম সাধারণত পার্থিব পথই বেছে নেয়।
পঞ্চদশ আর ষোড়শ শতাব্দীতে প্রথম যে রিফরমেশন’ আন্দোলনটি ইউরোপকে আঘাত করেছিল, মনে হয়েছিল যেন এটি হয়তো এইসব আত্মাভিমানকে চ্যালেঞ্জ করবে। এবং খানিকটা মাত্রা অবধি এটি তা করেছিল। কিন্তু যে চার্চগুলো রোমের কর্তৃত্ববাদিতা প্রত্যাখ্যান করেছিল, সেগুলোই আবার খুব দ্রুত এর শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শন করতে অন্য ভিন্ন উপায় খুঁজে নিয়েছিল। কিছু গোষ্ঠী ছিল যারা ঠিক এই কারণেই ‘পিউরিটান’ (বা শুদ্ধিবাদী) খেতাব অর্জন করেছিল। তাদের বিশ্বাস ছিল, শুধুমাত্র তারাই সত্যিকারের খ্রিস্টান, বিশুদ্ধতম খ্রিস্টান। মানব অহংকারের দ্বারা সৃষ্ট সবধরনের শ্রেষ্ঠতার রূপের মধ্যে ধর্মীয় শ্রেষ্ঠতা হচ্ছে। সবচেয়ে অসহনীয়।
আধ্যাত্মিক আর সামাজিক শ্ৰেষ্ঠতা, এইসব দাবিগুলো জর্জ ফক্সকে মুগ্ধ করতে পারেনি। ঈশ্বরের কণ্ঠস্বরটি তাকে বলেছিল, উঁচু কিংবা নীচু কাউকে সম্মান দেখানোর জন্যে তার মাথার টুপি খোলা বা বিশেষ কোনো ধরনের সমোধন ব্যবহার করার কোনো দরকার নেই। তিনি ধনী কিংবা গরিব, উচ্চ কিংবা নিম্নশ্রেণীর সদস্য, সবাইকে অনানুষ্ঠানিক (Thou, Thee) তুমি বলেই সম্বোধন করতেন। আর সমাজের সেই বিশেষ শ্রেণির শ্রেষ্ঠতাকে স্বীকৃতি দিয়ে তিনি মাথা নত করে সম্মান দেখাতেন না বলে তারা তাকে নিয়মিত কারাগারে বন্দি করে রাখতেন, যাদের উচ্চতর পদমর্যাদা সংশ্লিষ্ট শ্রেষ্ঠত্বকে স্বীকৃতি দিতে তার এই অস্বীকার এই মানুষগুলোকে ক্ষুব্ধ করেছিলেন। একটি ঘটনায় এধরনের ধষ্টতা দেখানোর অভিযোগে তাকে যখন আদালতে হাজির করা হয়েছিল, তিনি ঘোষণা করেছিলেন, একমাত্র কর্তৃপক্ষ, যার সামনে দাঁড়িয়ে আতঙ্কে কাঁপবেন, তিনি হচ্ছেন ঈশ্বর। এই কথা শুনে বিচারক শ্লেষাত্মকভাবে তাকে একজন ‘কোয়েকার’ (যিনি কাপেন) নামে সম্বোধন করে মামলা থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। ফক্সের অনুসারীরা নিজেদের নাম দিয়েছিলেন ‘সোসাইটি অব ফ্রেন্ডস’, কিন্তু বিচারকের সেই তিরস্কার তাদের পরিচয়ের সাথে আটকে গিয়েছিল, এবং ‘কোয়েকার’ নামেই তারা পরিচিত হয়েছিলেন। আর সেই নামটি তারা এখনো ব্যবহার করেন।
১৬২৪ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডের লিস্টারশায়ারে জর্জ ফক্স জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তার বাবা ছিলেন একজন তাঁতি, আর তিনি নিজে একজন মুচির শিক্ষানবীশ ছিলেন। আগের বহু নবীদের মতোই তারুণ্যে তিনি আত্মঅনুসন্ধান এবং বোধিলাভের জন্যে গৃহত্যাগ করেছিলেন। সেই সময়টি ধর্মীয় গোলযোগের সময় ছিল। নানা ধরনের ধর্ম-বিক্রেতাদের হাঁকডাকে আধ্যাত্মিকতার বাজার ছিল কোলাহলপূর্ণ, যারা প্রত্যেকেই তাদের নিজস্ব ধরনের ধর্মবিশ্বাসের স্বতন্ত্রতা দাবি করেছিলেন। এবং যদিও সবাই পরস্পরের প্রতিপক্ষ ছিলেন আর বিরোধিতা করেছিলেন, কিন্তু তাদের মধ্যে একটি বিষয় ছিল সাধারণ। প্রত্যেকেই দাবি করেছিলেন, খ্রিস্টীয় ধর্মের তাদের সংস্করণটি হচ্ছে ঈশ্বরের কাছে যাবার একমাত্র নিশ্চিত উপায়। আর এমন দাবির একটি নিহিত্যার্থ ছিল, ঈশ্বরকে খুঁজতে আপনার একজন দালাল লাগবে, অনেকটা ঈশ্বরের রাজসভায় থাকা কোনো বন্ধুর মতো, যিনি আপনাকে তার সাথে পরিচয় করিয়ে দেবে।
যখন তার বয়স চব্বিশ, একটি দৈববার্তা তার মনে উন্মোচিত হয়েছিল, যা তাকে দেখিয়েছিল, তিনি এমন কাউকে খুঁজে তার সময় নষ্ট করছেন, যে-কিনা। তাকে ঈশ্বরের উপস্থিতিতে পৌঁছানোর সেই দরজাটি পার করে দেবেন। তিনি তার নিজের বাইরে এমন কিছুর অনুসন্ধান করছিলেন, যখন কিনা এর উত্তরটি তার নিজের শ্বাসপ্রশ্বাসের চেয়েও নিকটবর্তী ছিল। কোনো মধ্যস্থতাকারীরই সাহায্য নেবার প্রয়োজন নেই, যারা কিনা ঈশ্বরের আনুষ্ঠানিক দারোয়ান হিসাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছেন। ঈশ্বরের উপস্থিতিতে নিজেকে আবিষ্কার করতে তার যেমন প্রাচীন কোনো যাজকের নির্দেশনার দরকার নেই, তেমনি নতুন কোনো যাজকের সহায়তার প্রয়োজন নেই। ঈশ্বরের ঘরের দরজা সবসময়ই উন্মুক্ত। তাকে শুধু সেই দরজা দিয়ে হেঁটে ভিতরে প্রবেশ করতে হবে।
