কিন্তু তাদের দুজনের সময়ই শেষ হয়ে এসেছিল। নক্স স্কটিশ অভিজাতশ্রেণির সদস্যরা মেরি কুইন অব স্কটের সাথে যে সমঝোতা করেছিলেন, তার বিরুদ্ধে প্রচারণা অব্যাহত রেখেছিলেন। তিনি ভয় পেয়েছিলেন, নিশ্চয়ই ক্যাথলিক মেরি কোনো-না-কোনো একটি উপায়ে পোপ পশুটিকে স্কটিশ প্রটেস্টান্টবাদের বিশুদ্ধ মন্দিরে ঢোকাতে সক্ষম হবেন। মেরি ছিলেন একজন তরুণী রানি, যাকে ক্যাথলিক ধর্মাচারগুলো সান্ত্বনা দিয়েছিল এবং তিনি আসলেই বুঝতে পারছিলেন না, কেন ক্যাথলিসজম এই মানুষটির মনে এত তীব্র ঘৃণার জন্ম দিয়েছে, তার বিরুদ্ধে যিনি প্রায় বিরতিহীনভাবেই প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। জন নক্স আর মেরি কুইন অব স্কটের মধ্যে এই সংঘর্ষ প্রদর্শন করে কীভাবে ধর্ম অন্যথায় ভালো আর সমবেদনাপূর্ণ মানুষদের মধ্যে সহিংসতা উসকে দিতে পারে। নক্স অবশ্যই খারাপ কোনো মানুষ ছিলেন না। তিনিও তার ধর্মবিশ্বাসের জন্যে বহু যন্ত্রণা সহ্য করেছিলেন। কিন্তু সবকিছুই তিনি সাদা আর কালো দেখতেন। কোনো ধূসর রং, কোনো মধ্য উপায় না, ‘না মিডডিস’!
আর ঘটনাচক্রে রাজরক্ত বহন করার কারণে, বারবার স্বজনহারানোর শোকের সাথে সংগ্রামরত ভালোবাসার কাঙাল মেরি এই ধর্মীয় সংঘর্ষে অনিচ্ছাসত্ত্বেও জড়িয়ে পড়েছিলেন, যে-ধর্মটি তাকে যন্ত্রণায় পুড়িয়েছিল ঠিকই তবে কখনোই তার হৃদয় জয় করতে পারেনি। সুরক্ষা আর ভালোবাসা পাবার প্রয়োজনীয়তাই তাকে ভুল কিছু সিদ্ধান্ত নিতে প্ররোচিত করেছিল। ১৫৬৫ খ্রিস্টাব্দে যখন তার বয়স বাইশ, তিনি তার ক্যাথলিক জ্ঞাতিভাই, বদমেজাজি এবং অজনপ্রিয় মাতাল হিসাবে পরিচিত লর্ড ডার্নলিকে বিয়ে করেছিলেন, নক্স এই বিয়ের বিরুদ্ধেও প্রচারণা করেছিলেন। ১৫৬৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি ডার্নলির ছেলে জেমসের জন্ম দেন, যিনি চতুর্থ জেমস অব স্কটল্যান্ড এবং প্রথম জেমস অব ইংল্যান্ড হয়ে একদিন এই দুটি রাজ্যকে পরস্পরের সাথে যুক্ত করেছিল। ডার্নলি ১৫৬৭ খ্রিস্টাব্দে আততায়ীর হাতে খুন হয়েছিলেন। মেরির পরবর্তী স্বামী লর্ড বোথওয়েল আরেকজন বেপরোয়া মানুষ ছিলেন, যিনি প্রথমে তাকে অপহরণ ও পরে ত্যাগ করেছিলেন। ধারাবাহিক এই বিবাহ-ব্যর্থতা স্কটিশ অভিজাত পরিবারগুলোর কাছে যথেষ্ট অনুভূত হয়েছিল। রানি তাদের রাজ্যে স্থিতিশীলতার প্রতি হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছেন, এমন দাবিতে তাকে প্রথমে গ্রেফতার ও পরে তার ছেলে জেমসের পক্ষে সিংহাসনত্যাগে বাধ্য করা হয়েছিল।
এবং এর সাথে তার জীবনের ট্র্যাজেডিটির শেষ অঙ্কের পর্দা উঠেছিল। তিনি পালিয়ে যান এবং ইংল্যান্ডের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন, আত্মবিশ্বাসী ছিলেন যে, তার জ্ঞাতিবোন রানি এলিজাবেথ তাকে অবশ্যই সহায়তা করবেন। কিন্তু এটিও তিনি ভুল বুঝেছিলেন। এলিজাবেথের কাছে মেরির উপস্থিতি ছিল একটি হুমকির মতো। ইংল্যান্ডে এলিজাবেথ একটি মাত্রায় ধর্মীয় স্থিতিশীলতা অর্জন করতে পেরেছিলেন। তিনি খুব সতর্কভাবে রিফরমেশন আন্দোলনের রাজনৈতিক পরিণতিগুলো সামলে নিয়েছিলেন। তিনি ক্যাথলিকদের নির্যাতন করেননি যেভাবে তার বোন ব্লাডি মেরি প্রটেস্টান্টদের নির্যাতন করেছিলেন। কিন্তু এই ভারসাম্যটি তখনো নড়বড়ে ছিল, আর মেরি কুইন অব স্কট হয়তো এই ভারসাম্যটি বেশি অস্থিতিশীল করে তুলতে পারেন, এমন আশঙ্কা করতে তিনি বাধ্য হয়েছিলেন। ক্যাথলিক উচ্চাশা আর অসন্তোষের কেন্দ্রে পরিণত হতে পারেন মেরি : মেরিকে কেন ইংল্যান্ডের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করছি না, যেন আমরা ক্যাথলিকবাদে ফিরে যেতে পারি? তিনি ছিলেন প্রকৃত রানি। এলিজাবেথ ছিলেন অ্যান বোয়েলিনের মেয়ে। এবং অনেকেই ছিলেন যারা অ্যানের সাথে হেনরির বিয়ের বৈধতায় বিশ্বাস করেননি। এলিজাবেথের বিরুদ্ধে তাই অসন্তোষ সৃষ্টি করার এটি একটি জোরালো কারণ হতে পারে, এবং মেরিকে ইংল্যান্ডের প্রকৃত রানি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার একটি আন্দোলনও গড়ে ওঠার সম্ভাবনা আছে।
সুতরাং এলিজাবেথ পরবর্তী উনিশ বছর মেরিকে ইংল্যান্ডে ধারাবাহিকভাবে কিছুদিন গ্রামের বাড়িতে গৃহবন্দি করে রেখেছিলেন। যখন তিনি শুনেছিলেন যে, মেরি হয়তো তাকে সিংহাসনচ্যুত করতে ষড়যন্ত্র করছেন, তিনি খুব দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। ১৫৮৭ খ্রিস্টাব্দে মেরির শিরশ্চেদ করা হয়। তার মৃত্যুদণ্ডের সময় তিনি লাল রঙ পরার ওপর জোর দিয়েছিলেন, যে-রঙটি ক্যাথলিক শহীদদের রঙ। শরীর থেকে তার মাথাটি বিচ্ছিন্ন করতে বেশ কয়েকবার আঘাত করতে হয়েছিল জল্লাদকে। আর জল্লাদ যখন তার মাথা উপরে তুলে ধরেছিল, যেভাবে সাধারণত দেখানো হয় কারো মৃত্যুর প্রমাণ দিতে, তখন শুধু মেরির মাথার পরচুলাটি তার হাতের মুঠোয় উঠে এসেছিল, মেরির ছিন্ন মাথাটি তখনো ঝুড়িতে পড়েছিল।
ইউরোপের ধর্মীয় এই যুদ্ধগুলো অব্যাহত ছিল আরো কয়েক শতাব্দী। প্রটেস্টান্টদের বিরুদ্ধে ক্যাথলিক, এক গোষ্ঠীর প্রটেস্টান্টদের বিরুদ্ধে অন্য আরেক গোষ্ঠীর প্রটেস্টান্টরা। কিন্তু কখনো কখনো যুদ্ধের অস্পষ্ট এই কুয়াশাচ্ছন্ন সময়ের মধ্যেই মাঝে মাঝে কিছু গোষ্ঠীর আবির্ভাব হয়েছিল, যারা রিফরমেশনের ফলে সৃষ্ট ঘৃণা আর রাজনৈতিক সংঘর্ষের সীমানা অতিক্রম করে যেতে পেরেছিলেন। এরকমই একটি গোষ্ঠী একটি ডাকনাম জুটিয়েছিল, যা পরে বিখ্যাত হয়েছিল : কোয়েকারস। আমরা পরের অধ্যায়ে তাদের নিয়ে আলোচনা করব আর এই আলোচনা আমাদের আটলান্টিক অপরপ্রান্তে আমেরিকায় নিয়ে যাবে।
৩২. বন্ধুরা
কোনো একটি মানবমনের মধ্যে যখন ঈশ্বরের কণ্ঠ কথা বলে ওঠে, তখন তার পরিণতি যে অবশ্যই হলিউডের মহাকাব্যিক সিনেমা মাত্রার কোনো ঘটনা হতে হবে–যেমন, মিশর থেকে ইজরায়েলাইটদের অভিনিষ্ক্রমণ অথবা মক্কা থেকে মুহাম্মদের হিজরত অথবা ভিটেনবার্গে মার্টিন লুথারের ইনডালজেন্স বিক্রির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ–এমন কিছু ভাবলে ভুল হবে। মাঝে মাঝে এই কণ্ঠস্বর এতই ব্যক্তিগত কোনোকিছু করতে নির্দেশ দিতে পারে যে, আসলেই বিস্ময়কর যে, সেটি কেউ স্মরণ করতে পারেন। কিন্তু তারপরও এটি ইতিহাস বদলে দিতে পারে।
