ক্লডিয়া জানত স্টেলিংয়ের কাছে সে একজন অবসর যাপনের সঙ্গীমাত্র, একজন রক্ষিতা। রাতের শয্যাসঙ্গী হিসেবেই ক্লডিয়াকে নিয়েছিল স্টেলিং। এছাড়া অন্য কোনো আকর্ষণ ছিল না তার, কিংবা ক্লডিয়ার প্রতি তার কোনো অনুভূতিও কাজ করত না। প্রায় সময়ই দেখা যেত ক্লডিয়াকে ফোন করে সে জানিয়ে দিত তার আসতে এক ঘণ্টা দেরি হবে কিন্তু দেখা গেল ছয় ঘণ্টা পর সে এলো। কখনো কখনো এখনও তাদের রাত্রি যাপনের পরিকল্পনাই বাতিল করে দিয়েছে স্টেলিং।
এছাড়াও দুজনে মিলিত হওয়ার সময় স্টেলিং তাকে কোকেন সেবন করার জন্য পীড়াপীড়ি করত। তাতে অবশ্য মিলনের আনন্দ বেড়ে যেত কিন্তু কোকেনের প্রভাব ক্লডিয়ার মস্তিষ্কে কয়েক দিন পর্যন্ত তাকে আচ্ছন্ন করে রাখত। সে কোনো কাজ করতে পারত না এবং যা সে লিখত তা তার মনোপূত হতো না। এক সময় ক্লডিয়া উপলব্ধি করল, একজন পুরুষ মানুষের খামখেয়ালির ওপর তার সমস্ত জীবন নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে এবং এই বিষয়টাকেই সে সর্বাধিক অপছন্দ করত।
ক্লডিয়া ছিল স্টেলিংয়ের চতুর্থ অথবা পঞ্চম পছন্দ। এই বিষয়টিই ক্লডিয়াকে অপমানিত করেছিল। কিন্তু এজন্য কখনোই স্টেলিংকে দায়ী করেনি সে, তার এই অপমানকর পরিস্থিতির জন্য সে নিজেকেই দায়ী করেছিল। কারণ স্টিত স্টেলিং তার খ্যাতির সুবাদে আমেরিকার প্রায় যে কোনো মহিলাকেই পেতে পাত এবং সেই স্টেলিং ক্লডিয়াকে পছন্দ করেছে এটা ক্লডিয়ার জন্য গর্বের বিষয় মনে হয়েছিল। স্টেলিংয়ের বয়স বাড়বে, তার সৌন্দর্য, খ্যাতিও কমে আসবে, তার কোকেন সেবনের পরিমাণ ক্রমেই বেড়ে যাবে। তাই স্টেলিং তার খ্যাতির শিখরে থাকতেই সবকিছু অর্জনে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। তারই প্রেমে ক্লডিয়া পড়েছিল। তার জীবনের কিছু দুঃসময়ের মধ্যে এই প্রেমের কয়েকটি দিন অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক হয়ে উঠেছিল।
সাতাশতম দিনে স্টেলিং ফোন করে ক্লডিয়াকে যখন জানাল যে তার আসতে এক ঘণ্টা দেরি হবে। ক্লডিয়া তাকে বলল, কষ্ট করো না। স্টিভ, আমি তোমার রঙমহল ছেড়ে চলে যাচ্ছি।
অপর প্রান্তে স্টেলিং কিছুক্ষণ চুপ থেকে উত্তর দিল, আশা করি আমাদের বন্ধুত্ব অক্ষুণ্ণ থাকবে, সে আরও বলল, আমি সত্যিই তোমার সাহচর্য উপভোগ করেছি। ক্লডিয়ার চলে যাওয়ার কথা শুনে সে মোটেও আশ্চর্য হয়নি।
সিওর, বলল ক্লডিয়া এবং চুপ করে থাকল। এই প্রথম কোনো সম্পর্ক শেষ করার পর তার সাথে বন্ধুত্ব ধরে রাখতে চাইল না ক্লডিয়া। আসলে নিজের নির্বুদ্ধিতার কারণেই ক্লডিয়া পীড়িত হচ্ছিল। এটা নিশ্চিত বুঝল ক্লডিয়া, তাকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার কৌশল হিসেবেই স্টেলিং তার সাথে ওই ধরনের আচরণ করেছিল। কিন্তু তা বুঝতে ক্লডিয়ার অনেক সময় লেগেছে। এটা অত্যন্ত লজ্জাজনক। সে কিভাবে এতটা নির্বোধ হয়েছিল? অপমান ও আঘাতে বিপর্যস্ত ক্লডিয়া খুব কেঁদেছিল। কিন্তু এক সপ্তাহের মধ্যেই সে স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিল। সে দেখল ভালোবাসার শূন্যতা তাকে মোটেও পীড়িত করছে না। সে উপলব্ধি করতে পারল, তার সমস্ত সময় একান্তই তার নিজের। সেখানে কারো যন্ত্রণাময় স্মৃতির অনুপ্রবেশ নেই এবং সে নির্বিঘ্নে কাজ করতে পারছে। কোকেন এবং সত্যিকার ভালোবাসা থেকে মুক্ত মস্তিষ্ক নিয়ে লিখতে পারায় উৎফুল্ল ক্লডিয়া।
পরিচালক ক্লডিয়ার চিত্রনাট্য বাতিল করে দেওয়ার পর, পূর্ণোদ্যমে ম্যাসেলিনা-এর চিত্রনাট্য নতুন করে লেখায় মনোনিবেশ করে সে। ছয় মাসে একাগ্র প্রচেষ্টায় চিত্রনাট্য সম্পন্ন করে সে। ক্লডিয়া ডি লিনা পাঁচ বছর চলচ্চিত্র বাণিজ্যের সাথে জড়িত, তার এই স্বল্প সময়ের অভিজ্ঞতায় সে জেনেছিল যে কোনো মানবিক মূল্যবোধ এবং জীবনবোধ, যৌনতা, হত্যা প্রভৃতির মাধ্যমেই চলচ্চিত্রে উপস্থাপন করতে হয়। নতুন লেখা ম্যাসেলিনার চিত্রনাট্যে ক্লডিয়া তার অভিজ্ঞতার সর্বোচ্চ সমন্বয় ঘটিয়েছিল। ফলে ম্যাসেলিনার চূড়ান্ত চিত্রনাট্য হয়ে উঠেছিল নারীবাদী প্রচারণায় অনবদ্য ও উপভোগ্য। ক্লডিয়া তার চিত্রনাট্যে প্রধান নারী চরিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী অ্যাথেনা অ্যাকুইটেনকে নির্বাচিত করেছিল এবং ম্যাসেলিনাকে অ্যাথেনার মধ্যে বিমূর্ত করেছিল। তার পাশাপাশি আরো তিনজন তারকা অভিনেত্রীর জন্য, পার্শ্ব নারী চরিত্রের অবতারণা করেছিল সে। দামি তারকা অভিনেত্রীদের আকৃষ্ট করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ নারী চরিত্র সৃষ্টি করা অত্যন্ত দুরূহ কাজ এবং প্রায় অসম্ভব। কিন্তু ক্লডিয়া তা করেছিল। চিত্রনাট্যে একজন শক্তিমান খলনায়ক একান্ত অপরিহার্য। ক্লডিয়া তার বাবার স্মৃতি স্মরণ করে সৃষ্টি করেছিল খলনায়কের চরিত্র, মোহনীয়, নিষ্ঠুর সুদর্শন এবং উপভোগ্য। ক্লডিয়া প্রথমে একজন প্রভাবশালী ও বিত্তশালী মহিলা প্রযোজকের খোঁজ করেছিল। কিন্তু বেশিরভাগ স্টুডিওর প্রধান যারা চিত্রনাট্যের অনুমোদন দেবে তারা ছিল পুরুষ। চিত্রনাট্য হিসেবে ম্যাসেলিনা পছন্দ করলে ও অত্যন্ত খোলামেলা নারীবাদী প্রচারণামূলক কাহিনী এবং মহিলা প্রযোজক ও মহিলা পরিচালকের বিষয়ে তারা রাজি হয়নি। তারা চলচ্চিত্র নির্মাণের কোনো একটি ক্ষেত্রে পুরুষের অংশগ্রহণ আশা করেছিল। ক্লডিয়া সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ডিটা টমিকে দিয়েই ম্যাসেলিনার পরিচালনা করাবে। ডিটা টমিকে নির্বাচনের পেছনে আরেকটি কারণ হলো– মহিলাদের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য পেতে পছন্দ করে ডিটা টমি এবং ম্যাসেলিনার কাজে সে চারজন খ্যাতিমান সুন্দরী অভিনেত্রীর সঙ্গ লাভ করতে পারবে। এছাড়া কয়েক বছর আগে একটি ছবির কাজে তারা দুজন একসঙ্গে কাজ করেছে। সেই সুবাদে উভয়ের মধ্যে একটা সুসম্পর্কও গড়ে উঠেছিল। ডিটা টমি একজন প্রতিভাবান পরিচালক, অত্যন্ত স্পষ্টবাদী এবং মজার ব্যক্তিত্ব। চলচ্চিত্র জগতে ডিটাটমি কখনই চিত্রনাট্যকারের কৃতিত্বে নিজের কৃতিত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য অথবা নতুন করে চিত্রনাট্য লেখার দাবী জানাত না। তার সুনির্দিষ্ট অবদান ছাড়া কোনো বিষয়ে নিজের কৃতিত্ব দাবী করত না। চিত্রনাট্যকারকে কখনোই হেয় করত না ডিটা টমি। তার ওপর অন্যান্য পরিচালক ও তারকাদের মতো সে যৌন নিপীড়ক নয়। যদিও চলচ্চিত্র বাণিজ্যে যৌন নিপীড়ন বলে কিছু নেই, কারণ চলচ্চিত্র জগতে যৌনতা এবং যৌনাবেদন কাজেরই একটি অংশ।
