মাথা নিচু করে নিজের হাতের দিকে চুপচাপ তাকিয়ে আছে হেগেন। নিচু গলায় তাকে পটাতে চেষ্টা করছে সলোযো। আগের সেই প্রচণ্ড প্রতাপ ছিল না ডনের। তার শক্তি কমে যাচ্ছিল। তা নাহলে এমন বে-কায়দায় তাকে পাই? তারপর তোমার ব্যাপারটাই ধরো, তুমি ইতালীয় পর্যন্ত নও, সিসিলীয় হওয়া তো দূরের কথা, অথচ তোমাকে সে কনসিলিয়রি করল–অন্যান্য পরিবারগুলো ব্যাপারটা খুব খারাপ ভাবে নিয়েছে। ডন কর্লিয়নির ওপর তারা আস্থা হারিয়েছিল।
হেগেনের দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে আছে সঁলোযো। এত কথায় কিছু কাজ হচ্ছে কিনা বোঝার চেষ্টা করছে সে। কিন্তু হেগেনের মুখ যেন পাথর দিয়ে খোদাই করা, ভাবের কোন প্রকাশ সেখানে নেই।
আমাকে আবার ভুল বুঝো না, একটু ব্যঙ্গের সাথে বলল ধূর্ত সলোযো। ভেব না ডনকে খুন করে খুব ভয় পেয়ে গেছি। আসলে সামগ্রিক যুদ্ধ চাই না। তাতে তোমাদের একা নয়, সবার ক্ষতি হবে-আমারও। কিন্তু, যুদ্ধ যদি হয়ই, আমিও তৈরি।
একবার চোখ তুলল হেগেন। কিন্তু তার মুখ দেখে কিছু বোঝা যাচ্ছে না।
টাকার চেয়ে আমাদের বেশি দরকার কর্লিয়নিদের রাজনৈতিক প্রভাবের ছত্রছায়া, সলোযো বলল। তোমাদের ওই জিনিসটা এখনও আছে বলেই এত মূল্য পাচ্ছ। ডন মারা যাওয়ায় সেই প্রভার কদ্দিন তোমাদের থাকবে তা অবশ্য সঠিকভাবে কিছু বলা যায় না। সনিকে বোঝাও লড়াই করতে গেলে খুব তাড়াতাড়ি জিনিসটি হারাতে হবে তাকে। ওর একার সাথে নয়, ক্যাপোরেজিমিদের সাথেও আলোচনা করো, নিজেরা ভাল করে বুঝে দেখো, ঠিক করো কি চাও তোমরা-রক্তপাত, নাকি শান্তি?
হুইস্কির গ্লাসে চুমুক দিয়ে সেটা একটু দূরে নামিয়ে রাখল হেগেন। সাথে সাথে দরজার পাশে দাঁড়ানো লোকটা এগিয়ে এসে সেটা আবার ভরে দিল। নিরপেক্ষ সুরে হৈগেন বলল, চেষ্টা করব। এর বেশি কিছু এই মুহূর্তে আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়। কিন্তু আপনাকে আমি সাবধান করে দিচ্ছি, সনির গোয়ার্তুমিটা ভয়ঙ্কর। তাছাড়া, লুকা ব্রাসিকে ঠেকাবার ক্ষমতা সনিরও নেই। আপনার সাথে সন্ধি করলে সনিকেও ক্ষমা করবে না সে। আমাকে তো নয়ই।
অদ্ভুত শান্ত ভঙ্গিতে সলোযো বলল, লুকার কথা ভেবে ভয় পেতে হবে না। তার ব্যবস্থা আমি করব, সে-দায়িত্ব আমার উপর ছেড়ে দিতে পারো। তুমি তিন ভাইয়ের দায়িত্ব নাও। ওদের বলো, বাপের সাথে ফ্রেডিকেও খুন করা হত আজ। যাদেরকে এ কাজের দায়িত্ব দিয়েছিলাম তারা তাই চেয়েছিল, কেননা এ ধরনের কাজে বাছ বিচার করে গুলি চালানো সম্ভব নয়। কিন্তু বিপদের ঝুঁকি নিয়ে আমি কড়া নির্দেশ দিয়েছিলাম তাদেরকে, ফ্রেডিকে খুন করা চলবে না। বুঝতেই পারছ, ঠিক যতটুকু দরকার তারচেয়ে বেশি বিদ্বেষ আমি দেখাতে চাইনি। ফ্রেডি বেঁচে আছে, সেটা আমারই মহানুভবতা, এটা বলতে ভুল কোরো না সনিকে।
সব বুঝতে পারছে হেগেন। সলোযোর উদ্দেশ্য ওকে মেরে ফেলা নয়। জিমী হিসাবে আটকে রাখতে চাইছে না। এটুকু বুঝতে পারার সাথে সাথে অদ্ভুত একটা আনন্দের সোত অনুভব করল শরীরে, কিন্তু পরক্ষণে লজ্জায় আপনা থেকেই নিচু হয়ে গেল মাথাটা। ডনের চেয়ে নিজের জীবনকে সে বেশি ভালবাসে, এটা আজ এই প্রথম বুঝতে পেরে নিজেকে অপরাধী লাগছে তার।
হেগেনের মুখের দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে সলোযো। আইরিশ কনসিলিয়রির মনের প্রতিটি ভাবনা স্পষ্ট পড়তে পারছে যেন সে।
পরিস্থিতিটা নিয়ে ভাবছে হেগেন। সলোহোর প্রস্তাবে তার সমর্থন আছে, এখানে বসে এ কথা তাকে বলতেই হবে, তা না হলে তুর্কী শয়তান তাকে ছাড়বে না, মেরেই ফেলবে। ব্যাটা চাইছে কি? চাইছে তাকে দিয়ে সনির কাছে প্রস্তাবটা নতুন করে উত্থাপন করতে চাইছে প্রস্তাবের পক্ষে যত যুক্তি আছে সব যেন সে সনিকে বুঝিয়ে বলে। তা বলতেও হেগেনের আপত্তি নেই। কনসিলিয়রি হিসাবে এটাই তো তার দায়িত্ব। আরও খানিক চিন্তা করে হেগেন বুঝল, সলোযোর কথার মধ্যে অযৌক্তিক কিছু নেই। টাটাগ্লিয়া আর কর্লিয়নিদের মধ্যে একটা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ বাধতে যাচ্ছে, কোন সন্দেহ নেই, কিন্তু যে কোন ভাবে এটাকে ঠেকাতেই হবে। ঠেকাতে হবে ব্যবসার খাতিরে। মারামারি করে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পরামর্শ সনিকে দিতে পারে না সে। কনসিলিয়রি হিসাবে তার দায়িত্ব সবার আগে ব্যবসার স্বার্থ দেখা। গড ফাদারকে সমাধিস্থ করেই সব ভুলে যেতে হবে। নতুন করে শান্তিচুক্তি করতে হবে। তারপর অপেক্ষা করতে হবে অনুকূল সময়ের জন্যে, তখন ব্যবস্থা নেয়া যাবে সলোযো আর টার্টগ্লিয়াদের বিরুদ্ধে।
মুখ তুলল হেগেন। চোখাচোখি হতেই সলোযো সবজান্তার ভঙ্গিতে হাসল একটু।
শরীরটা শিরশির করে উঠল হেগেনের। তার ভাবনা-চিন্তা সবটুকুই গড় গড় করে পড়ে ফেলেছে সলোগো।
খানিক আগে থেকেই কি একটা ব্যাপারে মনটা খুঁত খুঁত করছিল, হঠাৎ কারণটা আবিষ্কার করে ফেলল হেগেন। লুকা ব্রাসি! তার ব্যাপারে একটুও দুশ্চিন্তা করছে না সলোযো। ব্যাপার কি? ডনের সাথে লুকা বেঈমানী করল নাকি? দূর, নিজেকে ধিক্কার দিল হেগেন, কস্মিনকালেও তা সম্ভব নয়। সেই সাথে একটা কথা মনে পড়ে গেল তার। সলোযোর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেই নিজের অফিসে লুকাকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন ডন। গোপনে তাকে কিছু বলেছিলেন তিনি।
