বাইরে বেরিয়ে এল সনি। ইতিমধ্যে সন্ধ্যা হয়ে গেছে, ডিসেম্বরের শীতল বাতাস ছুটোছুটি করছে প্রাঙ্গণ জুড়ে। রাতে একা বেরিয়ে একটুও ভয় পেল না সনি। এবানের সবগুলো, অর্থাৎ আটটা বাড়ির মালিক তারাই। প্রাঙ্গণে ঢোকার মুখে দুপাশের বাড়ি দুটো পারিবারিক অনুচরদের কাছে ভাড়া দেয়া হয়েছে, স্ত্রী পুত্র আর অতিথিদের নিয়ে থাকে তারা। এইসব বিশেষ অতিথিদের কোন পিছুটান নেই, সবাই তারা হাত পা ঝাজা পুরুষ মানুষ। এরা থাকে বেসমেন্টে। অর্ধবৃত্তাকারে সাজানো বাকি ছয়টার একটছবাড়িতে সপরিবারে থাকে টম হেগেন, আরেকটাতে থাকে সনি। ছোট এবং সাদাসিঁধে বাড়িটিতে থাকেন ডন। অপর বাড়িগুলোতে বিনা ভাড়ায় থাকতে দেয়া হয়েছে ডনর অবসর প্রাপ্ত বন্ধুদেরকে। তবে ডন চাইলেই তারা বাড়ি খালি করে দেবে। নিরীহুদর্শন বিশাল প্রাঙ্গণটা আসলে একটা দুর্গম দু। বিশেষ। প্রতিটি বাড়িতে ফ্লাড লাইটের ব্যবস্থা আছে।
রাস্তা পেরিয়ে বাবার বাড়িতে ঢুকল সনি, নিজের চাবি দিয়ে দরজা খুলে ঘরে পা দিয়েই চেঁচিয়ে উঠল, মা?
মিষ্টি লঙ্কা ভাজার গন্ধ নিয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলেন সনির মা। একটা হাত ধরে তাকে চেয়ারে বসিয়ে দিল সনি, বল, তৈরি হয়ে নাও, হাসপাতালে যেতে হবে। ব্যস্ত হবার কিছু নেই, বাবা আহত হয়েছেন।
একদৃষ্টিতে ছেলের দিকে তাকিয়ে থেকে তিনি ইতালীয় ভাষায় বললেন, ওরা বুঝি গুলি করেছে ওকে?
মাথা ঝাঁকাল সনি। চোখ নামিয়ে নিলেন সনির মা, তারপর ফিরে এলেন রান্নাঘরে। তার পিছু পিছু সনিও এল। দেখল, চুলোটা ভোলেন তিনি, তারপর আবার বেরিয়ে গিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলেন উপর তলায়। প্লেট থেকে কয়েকটা মিষ্টি লঙ্কা আর ঝুড়ি থেকে একটু রুটি ছিঁড়ে নিয়ে আনাড়ি হাতে একটা স্যাণ্ডউইচ তৈরি করল সনি, তার আঙুলের ফাঁক দিয়ে গড়িয়ে নামছে গরম জলপাই তেল।
এর একটু পর সর্বশেষ প্রান্তের বাবার অফিস কামরায় এল সনি, তালা মারা একটা বাক্স থেকে তাঁর ব্যক্তিগত টেলিফোনটা বের করল।এটা একটা বিশেষ টেলিফোন, নাম ঠিকানা সব ভূয়া।
প্রথমে সনি ফোন করল লুকা ব্রাসিকে। অপরপ্রান্তে সাড়া নেই কারও। এরপর ফোন করল টেসিওকে। লোকটা ব্রুকলিনের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার মাথা, ডমের প্রতি এর আনুগত্য সম্পর্কে কোন প্রশ্নই উঠতে পারে না।
খবরটা জানিয়ে দ্রুত কয়েকটা নির্দেশ দিল সনি টেসিওকে। অতি বিশ্বস্ত পঞ্চাশজন প্রহরীর ব্যবস্থা করতে হবে তাকে, হাসপাতাল পাহারা আর লং বীচে কাজ করতে যেতে হবে তাদেরকে।
তবে কি ওরা ক্লেমেঞ্জাকেও সাবাড় করেছে? জানতে চাইল টেসিও।
ঠিক এক্ষুণি ক্লেমেঞ্জার লোকজনকে কাজে লাগাচ্ছি না, বলল সনি।
অনেক কিছু বুঝে নিল টেসিও। কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকার পর বলল সে, কিছু মনে কোরো না, সনি। তোমার বাবা এখন ঠিক যে কথাগুলো বলতেন, আমি তাই বলছি-ধীরেসুস্থে এগোও, বেশি তাড়াহুড়ো করতে যেয়ো না। ক্লেমেঞ্জা বিশ্বাসঘাতক এ আমি বিশ্বাস করি না।
ধন্যবাদ, টেসিও, বলল সনি। বিশ্বাস আমিও করি না, কিন্তু তৰু সাবধান হওয়া উচিত নয় কি?
উচিত।
আরেকটা কাজের কথা; বলল সনি। বোস্টন থেকে বিশ্বস্ত কয়েকজন লোককে নিউ হ্যাম্পশেয়ারের হ্যানভার কলেজে পাঠাও, তারা মাইকেলকে এখানে এ বাড়িতে নিয়ে আসবে। গণ্ডগোল মেটা না পর্যন্ত ওকে বাইরে রাখতে চাই না। এক্ষেত্রেও শুধু সাবধান হতে চাইছি আমি, তার বেশি কিছু নয়।
ঠিক আছে, বলল টেসিও। সবাইকে কাজে লাগিয়ে দিয়ে আমিও আসছি তোমার কাছে। আমার সব লোককে তুমি তো চেনো, তাই না?
হ্যাঁ, রিসিভার রেখে দিল সনি। ওয়ালসেফ খুলে নীল রঙের চামড়া দিয়ে বাঁধানো একটা খাতা বের করল সে। ইনডেক্স নাম্বার দেখে নির্দিষ্ট পৃষ্ঠায় চোখ রেখে দেখল তাতে লেখা রয়েছে রে ফ্যারেল, পাঁচশো ডলার, খৃস্টমাস ঈভ! এর নিচে টোকা রয়েছে একটা ফোন নাম্বার।
সেই নাম্বারে ডায়াল করে বলল, ফ্যারেল?
হ্যাঁ।
আমি সনি কর্লিয়নি। তোমার কাছ থেকে এখুনি একটু কাজ চাই আমি। তোমাকে দুটো ফোন নাম্বার দিচ্ছি। গত তিন মাস আগে থেকে আজ পর্যন্ত কত কল কোথা থেকে কোথায় আসা-যাওয়া করেছে, সব আমাকে জানাতে হবে। এরপর ফ্যারেলকে পলি গাটো আর ক্লেমেঞ্জার ফোন নাম্বার জানাল সনি। জরুরী কাজ। রাত বারোটার মধ্যে জানতে চাই আমি। বড়দিনটা যাতে তোমার আরও আনন্দে কাটে তার ব্যবস্থা করব।
আরেকবার ফোন করল সে লুকা ব্রাসির নাম্বারে। উত্তর নেই। দুশ্চিন্তাটাকে মন থেকে সরিয়ে দেবার চেষ্টা করল সে। একবার খবর পেলেই হয়, ভাবছে সে, সাইক্লোনের মত ছুটে আসবে লুকা।
রিভলভিং চেয়ারে বসে দোল খাচ্ছে সনি। একটু পরই আত্মীয়-স্বজনে গিজগিজ করবে বাড়ি। কার ঘাড়ে কি দায়িত্ব চাপাতে হবে সব ঠিক করতে হবে তাকে। নিরিবিলিতে বসে এই প্রথম টের পাচ্ছে সে পরিস্থিতিটা কতটুকু বিপজ্জনক।
কর্লিয়নি পরিবারকে আজ দশ বছর পর আবার যুদ্ধে ডাকা হয়েছে। তাদেরকে চ্যালেঞ্জ করার সাহ৷ কারও থাকতে পারে, দুঃস্বপ্নেও কেউ ভাবেনি একথা। পিছনে সলোযো রয়েছে, কিন্তু নিউ ইয়র্কের বড় বড় পাঁচটি পরিবারের মধ্যে কমপক্ষে একটির সমর্থন ছাড়া এ-কাজের কথা ভাবতেও সাহস পায়নি সে।
টাটাগ্লিয়া পরিবারের কথাতেই নেচেছে সলোযো, ভাবছে সনি। এখন কি হবে? হয় সামগ্রিক যুদ্ধ, নয় সলোহোর শর্তে আপোস। চতুর তুর্ক আকস্মিক দারুণ ফন্দি এঁটেছিল, কিন্তু ওর কপাল খারাপ। বাবা মারা গেলে বিকল্প উপায়টার কথা ভাবা যেত। কিন্তু বাবা বেঁচে আছেন। এর একটাই মানে, সামগ্রিক যুদ্ধ।
