একজন পুলিশ কর্মচারী মুখে সামান্য আঘাত পেয়েছিল, তাতে যে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছিল তা দূষিত হয়ে রক্তের মধ্যে জীবাণু ছড়িয়ে পড়েছিল। ডাক্তাররা তার জীবনের সব আশা ত্যাগ করেছিল। ১৯৪১ সালের ২০শে ফেব্রুয়ারি প্রফেসর ফ্লোরি স্থির করলেন এই মৃত্যুপথযাত্রী মানুষটির উপরেই পরীক্ষা করবেন পেনিসিলিন। তাকে তিন ঘণ্টা অন্তর অন্তর চারবার পেনিসিলিন দেওয়া হল। ২৪ ঘণ্টা পর দেখা গেল যার আরোগ্যলাভের কোন আশাই ছিল না। সে প্রায় সুস্থ হয়ে উঠেছে। এই ঘটনায় সকলেই উপলব্ধি করতে পারল চিকিৎসা বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে কি যুগান্তকারী প্রভাব বিস্তার করতে চলেছে পেনিসিলিন।
ডাঃ চেইন বিশেষ পদ্ধতিতে পেনিসিলিনকে পাউডারে পরিণত করলেন। এবং ডাঃ ফ্লোরি তা বিভিন্ন রোগীর উপর প্রয়োগ করতেন। কিন্তু যুদ্ধে হাজার হাজার আহত মানুষের চিকিৎসায় ল্যাবরোটারিতে প্রস্তুত পেনিসিলিন প্রয়োজনের তুলনায় ছিল নিতান্তই কম।
আমেরিকার Norhern Regional Research ল্যাবরেটরি এই ব্যাপারে সাহায্য করতে এগিয়ে এল।
মানব কল্যাণে নিজের এই আবিষ্কারের ব্যাপক প্রয়োগ দেখে আনন্দে অভিভূত হয়ে উঠেছিলেন ফ্লেমিং। মানুষের কলকোলাহলের চেয়ে প্রকৃতির নিঃসঙ্গতাই তাঁকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করত। মাঝে মাঝে প্রিয়তমা পত্নী সারিনকে সাথে নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন। সারিন শুধু যে তার স্ত্রী ছিলেন তাই নয়, ছিলেন তার যোগ্য সঙ্গিনী।
১৯৪৪ সালে ইংল্যাণ্ডের রাজদরবারের তরফ থেকে তাঁকে নাইট উপাধি দেওয়া হল। ১৯৪৫ সাল তিনি আমেরিকায় গেলেন।
১৯৪৫ সালের শেষ দিকে তিনি ফরাসী গভর্নমেন্টের আমন্ত্রণে ফ্রান্সে গেলেন। সর্বত্র তিনি বিপুল সম্বর্ধনা পেলেন। প্যারিসে থাকাকালীন সময়েই তিনি জানতে পারলেন এ বৎসরে মানব কল্যাণে পেনিসিলিন আবিষ্কারের এবং তার সার্থক প্রয়োগের জন্য নোবেল প্রাইজ কমিটি চিকিৎসাবিদ্যালয় ফ্লেমিং, ফ্লোরি ও ডঃ চেইনকে একই সাথে নোবেল পুরষ্কারে ভূষিত করেছেন। এই পুরস্কার পাওয়ার পর ফ্লেমিং কৌতুক করে বলেছিলেন, এই পুরস্কারটি ঈশ্বরের পাওয়া উচিত কারণ তিনিই সব কিছু আকস্মিক যোগাযোগ ঘটিয়েছেন।
ফ্রান্স থেকে ফিরে এসে তিনি আবার সেন্ট মেরি হাসপাতালে ব্যাকটেরিওলজির গবেষণায় মনোযোগী হয়ে ওঠেন। চার বছর পর তার স্ত্রী সারিন মারা যান। এই মৃত্যুতে মানসিক দিক থেকে বিপর্যন্ত হয়ে পড়েন ফ্লেমিং।
তাঁর জীবনের এই বেদনার্ত মুহূর্তে পাশে এসে দাঁড়ালেন গ্রীক তরুণী আমালিয়া তরুকা। আমালিয়া ফ্লেমিংয়ের সাথে ব্যাকটেরিওলজি নিয়ে গবেষণা করতেন। ১৯৫৩ সালে দুজনে বিবাহ সূত্রে আবদ্ধ হলেন। কিন্তু এই সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হল না। দুই বছর পর ১৯৫৫ সালে ৭৩ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন ফ্লেমিং।
২৭. ওয়াল্ট হুইটম্যান (১৮১৯-১৮৯২)
আজন্ম দারিদ্র পীড়িত কবি হুইটম্যানের জন্ম ১৮১৯ সালের ৩১ মে লং আইল্যণ্ডের ওয়েস্ট হিলে। বাবা ছিলেন ছুতোর। নয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। লিভস অব গ্রাসের কবি ওয়াল্ট হুটম্যান ছিলেন আমেরিকার নব যুগের নতুন চিন্তার প্রবক্তা। ঊনবিংশ শতকের আমেরিকান সংস্কৃতির প্রাণপুরুষ। শুধু আমেরিকার নন, আধুনিক বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি।
বাবা ওয়ালটার হুইটম্যান ছিলেন ইংরেজ। সামান্য লেখাপড়া জানতেন। অবসর পেলেই চার্চে গিয়ে ধর্ম-উপদেশ শুনতেন।
যখন ওয়াল্টের চার বছর বয়স, তখন তাঁর বাবা এলেন ব্রুকলীনে। ছেলেমেয়েদের পাঠিয়ে দেওয়া হল ওয়েস্ট হিলে মামার বাড়িতে। কয়েক মাস পর স্কুলে ভর্তি হলেন হুইটম্যান, শহরের চার-দেওয়াল ঘেরা স্কুল।
স্কুলের বাঁধা পড়া ভাল না লাগলেও বই ভাল লাগত। যখন যে বই পেতেন তাই পড়ে ফেলতেন। অদ্ভুত স্মৃতিশক্তি ছিল তার, যা কিছু একবার পড়তেন তা আর কখনো বিস্মৃত হত না।
পাঁচ বছর পর স্কুলের পাঠ শেষ হল। ছাত্র জীবনেরও পরিসমাপ্তি ঘটল। তখন তাঁর বয়স এগারো। সংসারের আর্থিক অবস্থা ক্রমশই খারাপ হয়ে আসছিল। একটা অফিসে বয়ের কাজ নিতে হল। দুটি বছর সেখানেই কেটে গেল।
তেরো বছর বয়েসে দি লং আইল্যাণ্ড (The long Island) নামে একটি পত্রিকার ছাপাখানায় চাকরি পেলেন। গভীর মনোযোগের সঙ্গে লক্ষ্য করতেন ছাপাখানার প্রতিটি কাজ, পড়তেন পত্রিকার প্রতিটি সংখ্যা।
কয়েক বছরের মধ্যেই পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগে কাজ পেলেন। পত্রিকার আর্থিক অবস্থা তখন খারাপ হয়ে আসছিল। তিনি হয়ে উঠেছিলেন একাধারে পত্রিকার প্রকাশক, সম্পাদক, মুদ্রাকর, মেশিনম্যান। তবুও পত্রিকাটিকে চালাতে পারলেন না।… এক বছর পর সব কিছু বিক্রি করে দিলেন। আবার শুরু হল ছন্নছাড়া জীবন।
যখন যেখানে কাজ পেতেন সেখানেই চাকরি করতেন। বেশির ভাগই ছিল পত্র পত্রিকার কাজ। কাজের ফাঁকে ফাঁকে নিয়মিত লিখে চলতেন গদ্য পদ্য, এর মধ্যে কিছু ছাপাও হয়েছিল।
সাতাশ বছর বয়সে ব্রুকলিনের সবচেয়ে নামী পত্রিকা দৈনিক ঈগল-এ সম্পাদকের চাকরি পেলেন।
হুইটম্যান বিশ্বাস করতেন সমস্ত মানুষই একই সত্তার বিভিন্ন প্রকাশ। সাদা, কালো, পীত সকল মানুষই পরস্পরের ভাই,–তাঁর এই মনের ভাবনাই প্রকাশ পেয়েছিলেন ঈগল পত্রিকায়। অনেকেই তাঁর সাথে একমত হতে পারল না। বাধ্য হয়ে চাকরি ছাড়তে হল। শোনা যায় কোন একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে রাজনৈতিক বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন। লোকটি দাসপ্রথার সমর্থনে মন্তব্য করেছিল। হুইটম্যান এক লাথিতে তাকে মাটিতে ফেলে দিয়েছিলেন। অনিবার্যভাবেই চাকরি হারাতে হল তাঁকে।
