দলে দলে মানুষ আসতে আরম্ভ করল তার কাছে। তিনি তাদের কাছে বললেন, অষ্টমার্গের কথা।
প্রথম হচ্ছে সত্য বোধ–অর্থাৎ মন থেকে সকল ভ্রান্তি দূর করতে হবে। উপলব্ধি করতে হবে নিত্য ও অনিত্য বস্তুর মধ্যে প্রভেদ।
দ্বিতীয় হচ্ছে সংকল্প-সংসারের পার্থিব বন্ধন থেকে মুক্ত হবার আকাঙ্ক্ষা। যা কিছু পরম জ্ঞান তাকে উপলব্ধি করার জন্য থাকবে গভীর আত্ম সংযমের পথ ধরে এগিয়ে চলা।
তৃতীয়–সম্যক বা সত্য বাক্য। কোন মানুষের সাথেই যেন মিথ্যা না বলা হয়। কাউকে গালিগালাজ বা খারাপ কথা বলা উচিত নয়। অন্য মানুষের সাথে যখন কথা বলবে, তা যেন হয় সত্য পবিত্র আর করুণায় পূর্ণ।
চতুর্থ–সৎ আচরণ। সকল মানুষেরই উচিত ভোগবিলাস ত্যাগ করে সৎ জীবন যাপন করা। সমস্ত কাজের মধ্যেই যেন থাকে সংযম আর শৃঙ্খলা। এছাড়া অন্য মানুষের প্রতি আচরণে থাকবে দয়া ভালবাসা।
পঞ্চম–হল সত্য জীবন বা সম্যক জীবিকা অর্থাৎ সত্তাবে অর্থ উপার্জন করতে হবে এবং জীবন ধারণের প্রয়োজনে এমন পথ অবলম্বন করতে হবে যাতে রক্ষা পাবে পবিত্রতা ও সততা।
ষষ্ঠ–সৎ চেষ্টা মন থেকে সকল রকম অশুভ ও অসৎ চিন্তা দূর করতে হবে যদি কেউ আগের পাঁচটি পথ অনুসরণ করে তবে তার কর্ম ও চিন্তা স্বাভাবিকভাবেই সংযত হয়ে চলবে।
সপ্তম–সম্যক ব্যায়াম অর্থাৎ সৎ চিন্তা। মানুষ এই সময় কেবল সৎ ও পবিত্র চিন্তা ভাবনার দ্বারা মনকে পূর্ণ করে রাখবে।
অষ্টম–এই স্তরে এসে মানুষ পরম শান্তি লাভ করবে। তার মন এক গভীর প্রশান্তির স্তরে উত্তীর্ণ হবে।
বুদ্ধ যে অষ্টমার্গের উপদেশ দিয়েছিলেন তা মূলত তাঁর সন্ন্যাসী আশ্রম বা সঙ্গ শিষ্যদের জন্য। কিন্তু তিনি তাঁর প্রখর বাস্তব চেতনা দিয়ে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন, সাধারণ গৃহী মানুষ কখনোই এই অষ্টমার্গের পথকে সম্পূর্ণ অনুসরণ করতে পারবে না। তিনি সমগ্র মানব সমাজের জন্য দশটি নীতি প্রচলন করলেন–
১. তুমি কোন জীব হত্যা করবে না।
২. অপরের জিনিস চুরি করবে না।
৩. কোন ব্যভিচার বা অনাচার করবে না।
৪. মিথ্যা কথা বলবে না, কাউকে প্রতারণা করবে না।
৫. কোন মাদক দ্রব্য গ্রহণ করবে না।
৬. আহারে সংযমী হবে। দুপুরের পর আহার করবে না।
৭. নৃত্যগীত দেখবে না।
৮. সাজসজ্জা অলঙ্কার পরবে না।
৯. বিলাসবহুল শয্যায় শোবে না।
১০. কোন সোনা বা রূপা গ্রহণ করবে না।
এই দশটি উপদেশের মধ্যে প্রথম পাঁচটি ছিল সাধারণ মানুষের জন্য। আর সন্ন্যাসীর ক্ষেত্রে দশটি উপদেশই পালনীয়।
বুদ্ধের এই উপদেশ জনগণের মধ্যে প্রচার করার জন্য তার ষাট জন বিশিষ্ট শিষ্য চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। এবার বুদ্ধ তার কয়েকজন শিষ্যকে নিয়ে রওনা হলেন গয়ার পথে।
বুদ্ধের শিষ্যের সংখ্যা ক্রমশই বৃদ্ধি পাচ্ছিল। তিনি বুঝতে পারছিলেন বিরাট সংখ্যক এই গৃহত্যাগী সন্ন্যাসীর জন্য প্রয়োজন সঙ্ঘের। যেখানে তারা জীবনচর্চার সাথে ধর্মচর্চা করবেন। সৎ পবিত্র জীবনের আদর্শ গ্রহণ করবেন।
শুরু হল সজ্ঞা প্রতিষ্ঠার কাজ। সেই সময় একদিন যখন বুদ্ধ শিষ্যদের উপদেশ দিচ্ছিলেন, কপিলাবস্তু থেকে এক দূত এসে মহারাজ শুদ্ধোধনের একটি পত্র দিল বুদ্ধকে।
বুদ্ধ তার কয়েকজন শিষ্যকে নিয়ে রওনা হলেন কপিলাবস্তুর পথে। মহারাজ শুদ্ধোধনের মনে ক্ষীণ আশা জেগে ওঠে, হয়ত পুত্র তার রাজ্যের ভার গ্রহণ করবে। বুদ্ধ নগরে প্রবেশ করতেই বৃদ্ধ পিতা ছুটে গেলেন তাঁর কাছে। কিন্তু এ তিনি কাকে দেখলেন! গপরনে পীতবস্ত্র, একদিকে কাঁধ অনাবৃত। মস্তক মুণ্ডন। হাতে ভিক্ষাপাত্র। তিনি ভিক্ষাপাত্র হাতে নগরের মানুষের কাছে ভিক্ষা চাইছেন।
যে কিনা সমগ্র রাজ্যের যুবরাজ সে ভিক্ষাপাত্র নিয়ে দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করছে। লজ্জায় ক্ষোভে মাথা নত করলেন শুদ্ধোধন। বুদ্ধ এগিয়ে এলেন পিতার কাছে। এসে তাকে প্রণাম করে বললেন, আপনি হয়ত পুত্রস্নেহে আমাকে দেখে ব্যথিত হয়েছেন। মন থেকে এই মায়া আপনি দূর করুন। এই জগৎ অনিত্য।
রাজা শুদ্ধোধন উপলব্ধি করলেন তাঁর সম্মুখে যে দাঁড়িয়ে আছে সে তার পুত্র নয়, মহাজ্ঞানী মানবশ্রেষ্ঠ তথাগত বুদ্ধ। পুত্রকে নিয়ে রাজপ্রাসাদে গেলেন। প্রাসাদের অন্তঃপুরে বসেছিলেন যশোধারা। তিনি ভাবলেন যতক্ষণ না বুদ্ধ তার কাছে আসে, তিনি কোথাও যাবেন না।
বুদ্ধের হৃদয় যশোধারার সাথে সাক্ষাতের জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছিল। তিনি দুজন শিষ্যকে নিয়ে অন্তঃপুরে প্রবেশ করলেন। বুদ্ধকে দেখামাত্রই উঠে এলেন যশোধারা। তার পরনে কোন রাজবেশ নেই। কোন অলঙ্কার নেই। গৃহে থেকেও সন্ন্যাসিনী। বুদ্ধের পায়ের উপর লুটিয়ে পড়লেন যশোধারা।
বুদ্ধ তাঁকে শান্ত করে বললেন, হে আমার পুত্রের জননী, আমি জানি তুমিও জন্ম জন্মান্তর ধরে সৎ পবিত্র জীবন যাপন করছ, তাই আমি তোমাকে মুক্তির পথ দেখাতে এসেছি। আমি তোমাকে যে উপদেশ দেব তুমি সেই পথ অনুসরণ কর, তবেই জীবনের সব মায়া বন্ধনের ঊর্ধ্বে উঠতে পারবে। আর সেখানে অপেক্ষা করলেন না বুদ্ধ।
পরদিন বুদ্ধ নগরে বেরিয়েছেন ভিক্ষাপাত্র হাতে। এমন সময় প্রাসাদের অলিন্দে দাঁড়িয়ে যশোধারা তাঁর পুত্র রাহুলকে বললেন, ঐ যে দিব্যকান্তি পুরুষ পথ দিয়ে চলেছেন উনি তোমার পিতা। যাও ওর কাছ থেকে গিয়ে তোমার উত্তরাধিকার চেয়ে নাও।
