মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিও ভাই।
যেন গোরে থেকেও মুয়াজ্জিদের আযান শুনতে পাই।।
………………………
………………………
আমার গোরের পাশ দিয়ে ভাই নামাযীরা যাবে,
পবিত্র সেই পায়ের ধ্বনি ও বান্দা শুনতে পাবে।
গোর-আযাব থেকে এ গুণাহগার পাইবে রেহাই।।
তাঁর সে অছিয়ত অনুযায়ীই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ সংলগ্ন উত্তর পার্শ্বে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় কবিকে সমাহিত করা হয়। মসজিদের পার্শ্বে কবি আজ চির নিদ্রায় শায়িত। প্রতিদিন প্রায় অসংখ্য মানুষ নামাজান্তে কবির মাজার জিয়ারত করছে। আজ কবি পৃথিবীতে নেই; কিন্তু বাংলা কাব্যে কবি ইসলামী ভাবধারা ও মুসলিম স্বতন্ত্রবোধ সৃষ্টিতে যে অবদান রেখে গেছেন, প্রতিটি শিক্ষিত বাঙালী মুসলমানের হৃদয়ে কবি অমর হয়ে থাকবেন।
২. হযরত ঈসা (খ্রীষ্ট পূর্ব ৬-৩০)
বিবি মরিয়ম নাছেরাহ নামক একটি শহরের অধিবাসিনী ছিলেন। নাছেরাহ শহরটি মুকাদ্দাসের অদূরেই অবস্থিত ছিল।
বিবি মরিয়ম পিতা মাতার মানত পূর্ণ করার জন্য বাইতুল মুকাদ্দাসের খেদমতে নিযুক্ত ছিলেন। তিনি বাল্যকাল থেকেই অতিশয় সুশীলা এবং ধর্মানুরাগিনী ছিলেন। তাঁর পিতার নাম ছিল ইমরান এবং নবী জাকারিয়া (আঃ)-এর শ্যালিকা বিবি হান্না তার জননী ছিলেন।
একদিন বিবি মরিয়ম নামাজ পড়িতেছিলেন, হঠাৎ ফেরেশতা জিব্রাঈল অবতীর্ণ হলেন। তিনি বললেন, তোমার প্রতি সালাম, তুমি আল্লাহর অনুগ্রহ প্রাপ্তা। আল্লাহ তোমার সাথে রয়েছেন।
বিবি মরিয়ম এই অপ্রত্যাশিত পূর্ব সম্বোধনে ভীত চকিত হলেন। ভাবতে লাগলেন–কে আসল, কিসের সালাম। হযরত জিব্রাঈল বললেন, আমি আল্লাহর ফেরেশতা জিব্রাঈল। তুমি ভীত হইও না; তুমি পবিত্র সন্তান লাভ করবে, এই সুসংবাদ তোমাকে দিতে এসেছি।
বালিকা ভীত হলেন এবং বললেন, তা কেমন করে হবে? আমি যে কুমারী। আমি স্বামীর সঙ্গ লাভ করি নি।
ফেরেশতা বললেন, “আল্লাহর কুদরতেই এটি হবে। তাঁর কাছে এটি কঠিন কাজ নয়।”
এই বলে ফেরেশতা অন্তর্নিহিত হলেন। ছয়মাস পূর্বে হযরত জাকারিয়া (আঃ)-এর স্ত্রী গর্ভবতী হয়েছেন। এখন আবার কুমারী মরিয়ম আল্লাহর কুদরতে গর্ভবতী হলেন।
বিবি মরিয়ম যদিও আল্লাহর কুদরতে সন্তান সম্ভবা হলেন, কিন্তু দেশের লোকেরা তা মেনে নিবে কেন? কুমারী নারীর এভাবে গর্ভবতী হওয়ার ফলে সবাই তাকে বাইতুল মুকাদ্দাস থেকে বের করে দিলেন, এমনকি তাকে স্বগ্রামও ছেড়ে যেতে হলো। সঙ্গী সহায়হীন অবস্থায় গর্ভবতী মরিয়ম একটি নির্জন প্রান্তরে সন্তান প্রসব করলেন।
বিপদাপন্ন মরিয়ম কোন আশ্রয় খুঁজে না পেয়ে একটি শহরের দ্বারপ্রান্তে আস্তাবলের একটি পতিত প্রাঙ্গণের একটি খেজুর গাছের নিচে আশ্রয় নিলেন। হায়, যিনি পৃথিবীর মহাসম্মানিত নবী, তিনি সেই নগণ্য স্থানে ভূমিষ্ঠ হলেন। যে মহানবীর ধর্মানুসরণকারিরা আজ পৃথিবীময় বিস্তৃত, শক্তি এবং সম্মানে যারা পৃথিবীতে শ্রেষ্ঠ স্থান অধিকার করে রয়েছে; তাদের নবী ভূমিষ্ঠ হলেন একটি আস্তাবলের অব্যবহার্য আঙ্গিনায়। দরিদ্রতম পিতা-মাতার সন্তানও এই সময় একটু শয্যালাভ করে থাকে, একটু শান্তির উপকরন পায়, কিন্তু মরিয়মের সন্তান শোয়াবার জন্য আস্তাবলের ঘরটুকু ছাড়া আর কিছুই ভাগ্যে হলো না।
আটদিন বয়সে সন্তানের ত্বক ছেদনা করা হলো। তাঁর নামকরণ হলো ঈসা। ইনি মছিহ নামে প্রসিদ্ধ হয়েছেন।
হযরত মুসা (আঃ)-এর শরীয়ত অনুসারে বাদশাহ কিংবা পয়গাম্বর তাঁর পদে বহাল হবার অনুষ্ঠানে, তৈল লেপন করার নিয়ম ছিল। এছাড়া তাওরাত কিতাবে হযরত ঈসা (আঃ)-এর নাম মছিহ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথম সন্তান জন্মগ্রহণ করলে একজোড়া ঘুঘু জাতীয় পাখি উৎসর্গ করার নিয়ম হযরত মুসা (আঃ)-এর শরীয়তের বিধান ছিল।
মরিয়ম সূচী-স্নাতা হওয়ার পর সন্তান সাথে নিয়ে বায়তুল মুকাদ্দাসে গেলেন এবং সেখানে গিয়ে পাখির মানত পালন করলেন।
এই সময় একদল অগ্নিপূজক হযরত ঈসা (আঃ)-কে খুঁজে ফিরছিল। তারা জ্যোতিষী ছিল। নক্ষত্র দেখে তারা হযরত ঈসা এর জন্ম হয়েছে’ এটি জানতে পেরেছিল। নিরুইস বাদশাহ এটি শুনে ভয় পেলেন এবং সেই অনুসন্ধানকারী দলের কাছে গোপনে বললেন যে, তারা যেন সেই বালকেরা সন্ধান করে কোথায় আছে তা বের করে। অগ্নিপূজকরা খুঁজতে খুঁজতে বিবি মরিয়মের কাছে পৌঁছল ও সেই ক্ষুদ্র শিশুকে সেজদা করল এবং সেখানে মানত ইত্যাদি সম্পন্ন করল। রাতে তারা স্বপ্নে দেখল, তাদেরকে হিরুইসের কাছে ফিরে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। কেননা হিরুইস তার জীবনের শত্রু। মরিয়ম এরূপ স্বপ্ন দেখলেন যে, সম্রাট এই সন্তানের শত্রু, সে তাকে হত্যা করতে চায়। সে যেন শিশুকে নিয়ে মিশরে চলে যায়। জ্যোতিষীরা সম্রাটের কাছে আর ফিরে গেল না। এতে বাদশাহ ভয়ানক রাগ হলো। সে হুকুম করল যে, বায়তুল্লাহর এবং এর আশেপাশের সকল বস্তির সন্তানদেরকে যেন হত্যা করে ফেলা হয়।
ইতিপূর্বে মরিয়ম তার সন্তান নিয়ে মিশরে রওনা হয়ে গিয়েছিলেন। হিরুইস যতদিন জীবিত ছিল, ততদিন সন্তান নিয়ে তিনি মিশরেই অবস্থান করলেন।
হিরুইসের মৃত্যুর সংবাদ শুনার পর তিনি নিজ দেশ নাছেরায় চলে আসলেন।
সন্তান দিন দিন বাড়তে লাগল। বয়স বাড়বার সাথে সাথে ঈসার মধ্যে প্রখর জ্ঞান এবং তীক্ষ্ণ মেধা শক্তির পরিচয় ফুটে উঠল। আল্লাহর বিশেষ একটি অনুগ্রহ যে, তাঁর উপর রয়েছে, দিন দিন তা প্রকাশ পেতে শুরু করল। ঈসার মাতা সহ প্রতি বছর ঈদের উৎসবের ইরুসালেমে যোগদান করতেন। ঈসার ১২ বছর বয়সে ইরুসালেমে বড় বড় জ্ঞানী এবং পণ্ডিতবর্গের সাথে ধর্ম বিষয়ে আলোচনা করতেন। তাঁর বাকপটুতা এবং তত্ত্বজ্ঞান শুনে পণ্ডিতেরা অবাক হকয়ে যেতেন। ক্রমান্বয়ে হযরত ঈসা আধ্যাত্মিক জ্ঞানের পূর্ণতা লাভ করতে লাগলেন। ত্রিশ বছর বয়সে তিনি আল্লাহর কাছ থেকে ‘ওহী’ লাভ করেন এবং নবীরূপে ধর্মপ্রচার করতে শুরু করলেন।
