ফেলুদা শঙ্কু ছাড়াও সত্যজিৎ বেশ কিছু ছোট গল্প লিখেছেন, যেমন এক ডজন গপ্পো, আরো এক ডজন, আরো বারো–এই বইগুলোর প্রতিটি গল্পই যেমন উপভোগ্য তেমনি সার্থক সৃষ্টি।
চলচ্চিত্র নিয়ে তাঁর প্রথম ইংরেজি বই “Our Films thier Films” বিশ্ব চলচ্চিত্র প্রসঙ্গে এক মূল্যবান সংযোজন। এতে একদিকে যেমন ফুটে উঠেছে তার সহজাত রসবোধ, অনদিকে গভীর পাণ্ডিত্য।
তাঁর আত্মজীবনী “যখন ছোট ছিলাম” খুবই উপভোগ্য। বিরাট প্রতিভার অধিকারী এই মানুষটি চিত্রশিল্পী হিসাবেও ছিলেন অসাধারণ। নিজের বইয়ের সমস্ত ছবি নিজেই আঁকতেন। এছাড়া বহু বিখ্যাত বইয়ের প্রচ্ছেদ তারই আঁকা।
অসামান্য কীর্তির জন্য অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছেন সত্যজিৎ। পথের পাঁচালী দিয়ে ১৯৫৬ সালে পান প্রথম আন্তর্জাতিক পুরস্কার আর তার পরিসমাপ্তি ঘটে ৩০শে মার্চ ১৯৯২ অস্কার পুরস্কার প্রদানের মাধ্যমে। এর মাঝে তিনি দেশে-বিদেশে অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছেন, নানাভাবে সম্মানিত হয়েছেন। শ্রেষ্ঠ পরিচালনা, শ্রেষ্ঠ ছবির জন্য পুরস্কারের কথা বাদ দিলেও নানান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পেয়েছেন ‘ডি লিট’ উপাধি। তার মধ্যে আছে অক্সফোর্ড, দিল্লী, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। শান্তিনিকেতন থেকে পেয়েছেন দেশিকোত্তম। ১৯৮৫ সালে পেয়েছেন দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার।
১৯৮৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ফরাসী প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া মিতের কলকাতায় এসে সত্যজিৎকে দিলেন সেদেশের সর্বোচ্চ সম্মান “লিজিয়ন অফ অনার”। এ এক দুর্লভ সম্মান জানিয়ে ফরাসী প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন, “ভারতের সাংস্কৃতিক জগতে সত্যজিৎ রায় এক অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। চলচ্চিত্র জগতে এই শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ পুরুষ। তাঁর মতো এক মহান ব্যক্তিকে আমাদের দেশের সর্বোচ্চ সম্মান জানাতে পেরে আমি ও আমার দেশবাসী আজ কৃতজ্ঞ বোধ করছি।”
জীবনের অন্তিম পর্বে এল ইলিউডের সর্বোচ্চ সম্মান অস্কার। যা পৃথিবীর সব চলচ্চিত্র নির্মাতার কাছে চির আকাঙ্ক্ষিত বস্তু। তাকে এই পুরস্কার দেবার জন্যে অনুরোধ জানিয়েছিলেন বিখ্যাত ৭০ জন মানুষ। এঁদের মধ্যে ছিলেন স্পিলবার্গ, কপোলো, নিউম্যান, জর্জ লুকাস, আকিরা কুরোসাওয়া। সত্যজিতের সমগ্র সৃষ্টিকে মূল্যায়ন করে তাকে দেওয়া হয় সাম্মানিক অস্কার। তার আগে মাত্র পাঁচজনকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়–গ্রেটা গার্বো (১৯৫৫), ক্যারি গ্রান্ট (১৯৬৯), চার্লি চ্যাপলিন (১৯৭২), জেমস স্টুয়ার্ট (১৯৮৪), কুরোসাওয়া (১৯৮৯)।
যখন অস্কার পুরস্কারের কথা ঘোষণা করা হল, সত্যজিৎ তখন অসুস্থ। বিছানায় শয্যাশায়ী। তিনি বলেছিলেন, “অস্কার পাওয়ার পর আমার পাওয়ার আর কিছুর বাকি রইল না।”
জীবনের সব পাওয়া শেষ হয়ে গিয়েছিল। তাই পুরস্কার পাওয়ার মাত্র তেইশ দিন পর এই পার্থিব জীবন থেকে চিরবিদায় নিলেন সত্যজিৎ (২৩ এপ্রিল ১৯৯২)।
৮৫. রম্যাঁ রোলাঁ (১৮৬৬-১৯৪৪)
ফ্রান্সের বার্গাভী প্রদেশের একটি ছোট শহর ক্লামেসি। ১৮৬৬ সালের ২৯শে জানুয়ারি এই শহরেই জন্ম হয়েছিল সমান ফরাসী সাহিত্যিক মানবতার পূজারী রম্যাঁ রোলাঁর। জনা থেকেই ছিলেন রুগ্ন অসুস্থ। জীবনের কোন আশা ছিল না। কিন্তু মায়ের স্নেহ ভালবাসা যত্নে মৃত্যুকে জয় করলেন রোলাঁ। কিন্তু মা রক্ষা করতে পারলেন না তার কোলের মেয়েটিকে। দু বছর বয়েসে মারা গেল একমাত্র কন্যা। রোলাঁর বয়স তখন পাঁচ। প্রথম মৃত্যুর স্বাদ অনুভব করলেন।
নিজের জীবনস্মৃতিতে লিখেছেন, “আমার শৈশব যেন মৃত্যুর ছায়াঘেরা এক বন্দীশালা।” এই বন্দীশালার জগৎ থেকে যিনি রোলাঁকে মুক্তির জগতে নিয়ে এলেন তিনি রোলাঁর মা। রোলাঁর জীবনে মা বাবা দুজনেরই ছিল গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব। তবে মায়ের প্রভাব ছিল অনেক বেশি। মা ছিলেন ধর্মপরায়ণ, সৎ পরিশ্রমী আর ছিল সঙ্গীতের প্রতি গভীর অনুরাগ। বাবা ছিলেন স্বাধীনচেতা আদর্শবাদী, ধর্ম সম্বন্ধে কোন মোহ ছিল না তার। পিতা-মাতার এই পরস্পর বিরোধী মনোভাবের কারণেই সুদীর্ঘকাল রোলাঁকে গভীর অন্তর্দ্বন্দ্বের মধ্যে অতিবাহিত করতে হয়েছে।
রোলাঁ ছিলেন রুগ্নদেহ। ঘরের বাইরে বড় একটা যেতেন না। চার-দেওয়ালের নিঃসঙ্গতারকে ভোলবার জন্য মা তাঁকে সঙ্গীতের জগত নিয়ে গেলেন। রোলাঁর মা পিয়ানোতে ছিলেন দক্ষ শিল্পী। মায়ের পিয়ানো শুনতে শুনতে সঙ্গীতের মধ্যে তার এক সহজাত দক্ষতা ছিল। অল্পদিনের মধ্যেই মোৎসার্ট বিঠোফেনের সঙ্গীতের মধ্যে তিনি আত্মস্থ হলেন। এই প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, “তাদের তাছে আমি ঈ। যখনই আমার মন সংশয় আর ব্যর্থতার ভারে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে, বিঠোফোনের সঙ্গীত আমার অন্তরে নবজীবনের দীপশিখা জ্বালিয়ে দিয়েছে।…শুষ্ক জমিতে বৃষ্টিধারার মত জার্মান সঙ্গীত আমার হৃদয়ের শুষ্কতার বুকে বারিধারা এনে দিয়েছে…মোৎসার্ট বিঠোফেন আমার জীবনের সাথে একাত্ম হয়ে আছে। যখন শিশু ছিলাম, প্রতিমুহূর্তে মনে হত মৃত্যু এসে আমাকে ঘিরে ফেলেছে। মোৎসার্টের একটি সুর আমাকে যেন পাহারা দিত।”
রোলাঁ শৈশবে পা দিলেন। ক্লামেসি শহরে ভাল কোন স্কুল ছিল না। প্রথমে বাবা ঠিক করলেন রোলাঁকে প্যারিসে পাঠাবেন, কিন্তু একমাত্র সন্তানকে ছেড়ে থাকতে চাইল না।
