গবেষণার প্রয়োজনে জীবনের ঝুঁকি নিলেন পাস্তুর। বহু কষ্টে দড়ি বেঁধে ফেললেন সেইহিংস্র কুকুর। তারপর একটা টেবিলের উপর শুইয়ে মুখটা নিচু করলেন। তারপর মুখে রসামনে একটা কাঁচের পাত্র ধরলেন, টপ টপ করে তার মধ্যে গড়িয়ে পড়তে লাগল বিষাক্ত লালা। আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে উঠলেন পাস্তুর ঐ বিষাক্ত লালা দিয়েই তৈরি হর জলাতঙ্কের সিরাম।
এবার পরীক্ষা শুরু হল। প্রথমে তা প্রয়োগ করা হর খরগোশের উপর, তারপর অন্যান্য জীব-জন্তুর উপর। প্রতিবারই আশ্চর্য ফল পেলেন পাস্তুর। জীব-জন্তুর দেহে তা কার্যকর হলেও মানুষের দেহ কিভাবে তা প্রয়োগ করবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না পাস্তুর। কতটা পরিমাণ ঔষুধ দিলে রোগী সুস্থ হয়ে উঠবে তার কোন সঠিক ধারণা নেই। সামান্য পরিমাণের তারতম্যের জন্য রোগীর প্রাণ বিপন্ন হতে পারে। সে ক্ষেত্রে রোগীর মৃত্যু অনিবার্য জেনেও সমস্ত দায় এসে বর্তাবে তার উপর। কিভাবে এই জটিল সমস্যার সমাধান করবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না পাস্তুর।
অবশেষে অপত্যাশিতভাবেই একটা সুযোগ এসে গেল। জোসেফ মিস্টার বলে একটি ছোট ছেলেকে কুকুরে কামড়েছিল। ছেলেটির মা তাকে এক ডাক্তারের কাছে নি গিয়েছিল। ডাক্তার তাকে পাস্তুরের কাছে পাঠিয়ে দিলেন।
পাস্তুর জোসেফকে পরীক্ষা করে বুঝতে পারলেন তার মধ্যে রোগের বীজ সংক্রামিত হয়েছে। অল্পদিনের মধ্যেই মৃত্যু অনিবার্য। পাস্তুর স্থির করলেন জোসেফের উপরেই তার আবিষ্কৃত সিরাম প্রয়োগ করবেন।
নয় দিন ধরে বিভিন্ন মাত্রায় ঔষধ প্রয়োগ করতে লাগলেন পাস্তুর। একটু একটু করে সুস্থ হয়ে উঠতে থাকে জোসেফ। তবুও মনের উৎকণ্ঠা আর উদ্বেগ দূর হয় না। অবশেষে তিন সপ্তাহ পর সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠল জোসেফ। চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ল পাস্তুরের আবিষ্কারের কথা। এক ভয়াবহ মৃত্যুর হাত থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করলেন পাস্তুর।
বৃষ্টিধারার মত চতুর্দিক থেকে তার উপরে সম্মান বর্ষিত হতে থাকে। ফরাসী একাডেমির সভাপতি নির্বাচিত হলেন তিনি।
১৮৯২ সালের ২৭শে ডিসেম্বর পাস্তুরকে অভিনন্দন জানানোর জন্য দেশ-বিদেশের বিজ্ঞানীরা প্যারিসে জমায়েত হলেন। Antiseptic Surgery-র আবিষ্কর্তা জোসেফ লিস্টার বললেন, পাস্তুরের গবেষণা অস্ত্র চিকিৎসার অন্ধকার জগতে প্রথম আলো দিয়েছে। শুধুমাত্র অস্ত্র চিকিৎসা নয়, ঔষধ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও মানব সমাজ চিরদিন তার কাছে ঋণী হয়ে থাকবে।
দেশ-বিদেশের কত সম্মান, উপাধি, পুরস্কার, মানপত্র পেলেন। কিন্তু কোন কিছুতেই বিজ্ঞান সাধক পাস্তুরের জীবন সাধনার সামান্যতম পরিবর্তন ঘটেনি। আগের মতই নির অহঙ্কার সরল সাদাসিদা রয়ে গেলেন। একবার আন্তজার্তিক চিকিৎসা সম্মেলনে পাস্তুর ফরাসী দেশের প্রতিনিধি হিসাবে লন্ডনে, গিয়েছেন। তিনি যখন হলে প্রবেশ করলেন, চতুর্দিক থেকে শত শত মানুষ উঠে দাঁড়িয়ে করতালি দিতে থাকে। পাস্তুর বিব্রতভাবে এক সঙ্গীকে বললেন, এই সংবর্ধনা নিশ্চই যুবরাজ ওয়েলসের জন্য, আমার আরো আগে আসা উচিত ছিল। পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন সম্মেনের সভাপতি। তিনি এগিয়ে এসে পাস্তুরকে বললেন, এই সংবর্ধনা যুবরাজের জন্য নয়, এ আপনারই জন্য। প্যারিসে ফিরে এলেন পাস্তুর, তাঁর সম্মানে গড়ে উঠেছিল পাস্তুর ইন্সটিটিউট এখানে সংক্রামক রোগের গবেষণার কাজ চলছিল।
পাস্তুর অনুভব করতে পারছিলেন তাঁর দেহ আর আগের মত কর্মক্ষম নেই। মাঝে মাঝেই অসুস্থ হয়ে পড়ছিলেন। সকলের অনুরোধে কর্মজীবন থেকে অবসর নিলেন। এই সময় বাইবেল পাঠ আর উপাসনার মধ্যেই দিনের বেশির ভাগ সময় কাটতেন। তবুও অতীত জীবন থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করেননি। মাঝে মাঝেই তার ছাত্ররা তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে আসত। তিনি বলতেন তোমরা কাজ কর, কখনো কাজ বন্ধ করো না।
তাঁর সত্তরতম জন্মদিনে ফ্রান্সে জাতীয় ছুটি ঘোষণা করা হল। সোরবোনে তাঁর সম্মানে বিরাট অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হল। দেশ-বিদেশের বহু বিজ্ঞানী সেই অনুষ্ঠানে যোগ দিলেন। সকলের অভিনন্দনের উত্তরে পাস্তুর বললেন, “আপনাদের ভালবাসায় আমি অভিভূত। আমি সমস্ত জীবন ধরে বিশ্বাস করেছি একমাত্র বিজ্ঞান আর শান্তির চেতনায় পারে সমস্ত অজ্ঞানতা আর যুদ্ধের বিভীষিকাকে দূর করতে। রাষ্ট্রের সামিয়ক দুর্যোগ যেন মনকে আচ্ছন্ন না করে। বিশ্বাস রাখুন একদিন সমস্ত দেশই সম্মিলিত হবে যুদ্ধের বিরুদ্ধে, শান্তি সহযোগিতার পক্ষে আর সেই ভবিষ্যৎ হবে বর্বরদের নয়, শান্তিপ্রিয় মানবজাতির।” এরপর আরো তিন বছর বেঁচে ছিলেন পাস্তুর। অবশেষে ১৮৯৫ সালের ২৭শে সেপ্টেম্বর চিরন্দ্রিায় ঢলে পড়লেন বিজ্ঞান-তপস্বী লুই পাস্তুর। যার সম্বন্ধে তৃতীয় নেপোলিয়ন বলেছিলেন, ফ্রান্সের সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান।
৭৬. নিকোলাস কোপার্নিকাস (১৪৭৩-১৫৪৩)
সভ্যতার আদি যুগ থেকেই মাটির মানুষ বিস্ময়ভরা চোখে চেয়ে থাকত আকাশের দিকে। আকাশের চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা সব কিছুই তার কাছে ছিল অপার বিস্ময়ের। বিজ্ঞানের কোন চেতনা তখনো মানুষের মধ্যে জন্মগ্রহণ করেনি। তাই অনন্ত আকাশের মতই ছিল তার সীমাহীন কল্পনা।
ধীরে ধীরে মানুষের মধ্যে জন্ম নিতে থাকে জ্ঞানের চেতনা। কত প্রশ্ন জেগে ওঠে তার মনে। এই বিশ্ব প্রকৃতির অপার রহস্য ভেদ করবার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে। জিজ্ঞাসু মন আর এই জিজ্ঞাসা থেকেই শুরু হল অনুসন্ধান।
