চেরেফোনের কথা শেষ হতেই চারদিক কাঁপিয়ে আকাশ থেকে এক দৈববাণী ভেসে এল।
“যে নিজেকে জানে সেই।”
সক্রেটিসের জন্ম খ্রিস্টপূর্ব ৪৬৯/৪৬৩। পিতা সফরেনিকাশ (Sopphroniscus) ছিলেন স্থপতি। পাথরের নানান মূর্তি গড়তেন। মা ফেনআরেট (Phaenarete) ছিলেন ধাত্রী।
পিতা মাতা দুজনে দুই পেশায় নিযুক্ত থাকলেও সংসারে অভাব লেগেই থাকত। তাই ছেলেবেলায় পড়াশুনার পরিবর্তে পাথর কাটার কাজ নিতে হল। কিন্তু অদম্য জ্ঞানস্পৃহা সক্রেটিসের। যখন যেখানে যেটুকু জানার সুযোগ পান সেইটুকু জ্ঞান সঞ্চয় করেন। এমনি করেই বেশ কয়েক বছর কেটে গেল। একদিন ঘটনাচক্রে পরিচয় হল এক ধনী ব্যক্তির সঙ্গে। তিন সক্রেটিসের ভুদ্র ও মধুর আচরণে, বুদ্ধিদীপ্ত কথাবার্তায় মুগ্ধ হয়ে তার পড়াশুনার দায়িত্ব নিলেন।
পাথরের কাজ ছেড়ে সেক্রেটিস ভর্তি হলে এনাক্সগোরাস (Anaxagoras) নামে এক গুরুর কাছে। কিছুদিন পর কোন কারণে এনাক্সগোরাস আদালতে অভিযুক্ত হলে সক্রেটিস আরখ এখলাস-এর শিষ্য হলেন।
এই সময় গ্রীস দেশ ছোট ছোট রাজ্যে বিভক্ত ছিল। ফলে নিজেদের মধ্যে মারামারি, যুদ্ধবিগ্রহ, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব লেগেই থাকত। দেশের প্রতিটি তরুণ, যুবক, সক্ষম পুরুষদের যুদ্ধে যেতে হত।
সক্রেটিসকেও এথন্সের সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে এ্যামপিপোলিস অভিযানে যেতে হল। এই যুদ্ধে সাহসিকতার জন্য সমস্ত যোগদান করে তাঁর মন ক্রমশই যুদ্ধের প্রতি বিরূপ হয়ে উঠল।
চিরদিনের মত সৈনিকবৃত্তি পরিত্যাগ করে ফিরে এলেন এথেন্সে। এথেন্সে তখন জ্ঞান-গরিমা, ব্যবসা-বাণিজ্য, শৌর্য, বীর্যে, পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ দেশ। শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির এক স্বর্ণযুগ।
এই পরিবেশে নিজেকে জ্ঞানের জগৎ থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারলেন না সক্রেটিস। তিনি ঠিক করলেন জ্ঞানের চর্চায়, বিশ্ব প্রকৃতির জানবার সাধনায় নিজেকে উৎসর্গ করবেন।
প্রতিদিন ভোরবেলায় ঘুম থেকে উঠে সামান্য প্রাতরাশ সেরে বেরিয়ে পড়তেন। খালি পা, গায়ে একটা মোটা কাপড় জড়ানো থাকত। কোনদিন গিয়ে বসতেন নগরের কোন দোকানে, মন্দিরের চাতালে কিম্বা বন্ধুর বাড়িতে। নগরের যেখানেই লোকজনের ভিড় সেখানেই খুঁজে পাওয়া যেত সক্রেটিসকে। প্রাণ খুলে লোকজনের সঙ্গে গল্প করছেন। আড্ডা দিচ্ছেন, মাঝে মাঝে প্রশ্ন করছেন, নিজে এমন ভাব দেখাতেন যেন কিছুই জানেন না, বোঝেন না। লোকের কাছ থেকে জানবার জন্যে প্রশ্ন করছেন।
আসলে প্রশ্ন করা, তর্ক করা ছিল সে যুগের এক শ্রেণীর লোকদের ব্যবসা। এদের বলা হত সোফিস্ট। এরা পয়সা নিয়ে বড় বড় কথা বলত।
যারা নিজেদের পান্ডিত্যের অহঙ্কার করত, বীরত্বের বড়াই করত, তিনি সরাসরি জিজ্ঞেস করতেন, বীরত্ব বলতে তারা কি বোঝে? পান্ডিত্যের স্বরূপ কি। তারা যখন কোন কিছু উত্তর দিত, তিনি আবার প্রশ্ন করতেন। প্রশ্নের পর প্রশ্ন সাজিয়ে বুঝিয়ে দিতেন তাদের ধারণা কত ভ্রান্ত। মিথ্যে অহমিকায় কতখানি ভরপুর হয়ে আছে তারা। নিজেদের স্বরূপ এইভাবে উৎঘাটিত হয়ে পড়ায় সক্রেটিসের উপর তারা সকলে ক্ষুদ্ধ হয়ে উঠল। কিন্তু সক্রেটিস তাতে সামান্যতম বিচলিত হতেন না। নিজের আদর্শ, সত্যের প্রতি তাঁর ছিল অবিচল আস্থা। সেই সাথে ছিল অর্থ সম্পদের প্রতি চরম উদাসীনতা।
একবার তাঁর বন্ধু এ্যালসিবিয়াদেশ তাকে বাসস্থান তৈরি করবার জন্য বিরাট একখন্ড জমি দিতে চাইলেন। সক্রেটিস বন্ধুর দান ফিরিয়ে দিয়ে সকৌতুকে বললেন, আমার প্রয়োজন একটি জুতার আর তুমি দিচ্ছ একটি বিরাট চামড়া এ নিয়ে আমি কি করব জানি না।
পার্থিব সম্পদের প্রতি নিঃস্পৃহতা তাঁর দার্শনিক জীবনে যতখানি শান্তি নিয়ে এসেছিল, তার সাংসারিক জীবনে ততখানি অশান্তি নিয়ে এসেছিল। কিন্তু তার প্রতিও তিনি ছিলেন সমান নিস্পৃহ।
তাঁর স্ত্রী জ্যানথিপি (Xanthiphe) ছিলেন ভয়ঙ্কর রাগী মহিলা। সাংসারিক ব্যাপারে সক্রেটিসের উদাসীনতা তিনি মেনে নিতে পারতেন না। একদিন সক্রেটিস গভীর একাগ্রতার সাথে একখানি বই পড়ছিলেন। প্রচন্ড বিরক্তিতে জ্যানথিপি গালিগালাজ শুরু করে দিলেন। কিছুক্ষণ সক্রেটিস স্ত্রীর বাক্যবাণে কর্ণপাত করলেন না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর ধৈর্য রক্ষা করত না পেরে বাইরে গিয়ে আবার বইটি পড়তে আরম্ভ করলেন। জ্যানথিপি আর সহ্য করতে না পেরে এক বালতি পানি এনে তার মাথায় ঢেলে দিলেন। সক্রেটিস মৃদু হেসে বললেন, আমি আগেই জানতাম যখন এত মেঘগর্জন হচ্ছে তখন। শেষ পর্যন্ত একপশলা বৃষ্টি হবেই।
জ্যানথিপি ছাড়াও সক্রেটিসের আরো একজন স্ত্রী ছিলেন, তাঁর নাম মায়ার্ত (Myrto)।
দুই স্ত্রী গর্ভে তাঁর তিনটি সন্তান জন্মগ্রহণ করেছিল। দারিদ্র্যের মধ্যে হলেও তিনি তাদের ভরণ পোষণ শিক্ষার ব্যাপারে কোন উদাসীনতা দেখাননি। না। তিনি বিশ্বাস করতেন শিক্ষাই মানুষের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। শিক্ষার মধ্যেই মানুষের অন্তরের জ্ঞানের পূর্ণ জ্যোতি উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। জ্ঞানের মধ্যে দিয়েই মানুষ একমাত্র সত্যকে চিনতে পারে। যখন তার কাছে সত্যের স্বরূপ উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে, সে আর কোন পাপ করে না। অজ্ঞানতা থেকেই সমস্ত পাপের জন্য। তিনি চাইতেন মানুষের মনের সেই অজ্ঞানতাকে দূর করে তার মধ্যে বিচার বুদ্ধি বোধকে জাগ্রত করতে। যাতে তারা সঠিতভাবে নিজেদের কর্মকে নিয়ন্ত্রিত করতে পারে।
