১৫ই মার্চ সেনেটের অধিবেশনের দিন। সকল সদস্যরা সেই দিন সেনেটে উপস্থিত থাকবে। কিন্তু আগের রাতে বারংবার দুঃস্বপ্ন দেখতে থাকেন সীজারের স্ত্রী ক্যালপুনিয়া। তার নিষেধ সত্ত্বেও বীর সীজার সেনেটে গেলে সুযোগ বুঝে বিদ্রোহীর দল একের পর এক ছোরা সীজারের দেহে বিদ্ধ করে। শেষ আঘাত করে ব্রুটাস। প্রিয়তম বন্ধুকে বিশ্বাসঘাতকতা করতে দেখে আর্তনাদ করে ওঠে সীজার, ব্রুটাস তুমিও!
সীজারের মৃত্যুতে উল্লাসে ফেটে পড়ে ষড়যন্ত্রকারীর দল। শুধু একজন প্রতিহিংসার আগুনে জ্বলতে থাকে, সে অ্যান্টোনি। প্রকাশ্য রাজপথে দাঁড়িয়ে জনসাধারণের কাছে সীজারকে হত্যার কারণ বিশ্লেষণ করে ব্রুটাস। তার বক্তৃতায় মোহগ্রস্ত হয়ে পড়ে জনগণ! তারা ব্রুটাসের জয়ধ্বনি করে ভুলে যায় সীজারের কথা। ব্রুটাস চলে যেতেই বক্তৃতা শুরু করে অ্যান্টোনি। সে সুকৌশলে সীজারের প্রতি জনগণের ভালবাসা জাগিয়ে তোলে। তাদের কাছে প্রমাণ করে সীজার একজন মহান মানুষ, তাকে অন্যায়ভাবে ব্রুটাস ও অন্যরা হত্যা করেছে।
সমস্ত মানুষ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। ষড়যন্ত্রকারীর দল প্রাণভয়ে দেশত্যাগ করে। কিন্তু যুদ্ধে সকলে নিহত হয়। জুলিয়াস সীজার নাটকে ব্রুটাস হত্যাকারী বিশ্বাসঘাতক হলেও তার অন্তর্দ্বন্দ্ব, মানসিক দুর্বলতা, অন্তিম পরিণতি আমাদের মনকে বিষণ্ণ করে তোলে।
আর একটি বিখ্যাত ঐতিহাসিক নাটক অ্যান্টোনি ও ক্লিওপেট্রা। এই নাটকের বিষয়বস্তু প্রেম। সুন্দরীশ্রেষ্ঠ ক্লিওপেট্রার সাথে অ্যান্টোনির প্রেম। নাটকের প্রথমে ক্লিওপেট্রাকে এক সাধারণ প্রেমিকা বলে মনে হলেও শেষে তার আত্মত্যাগ তাকে মহীয়সী করে তুলেছে।
ট্রাজেডি শেক্সপীয়রের প্রথম ট্রাজেডি রোমিও জুলিয়েট। এতে মানব জবিনের কোন দ্বন্দ্ব নেই, নেই পারিপার্শ্বিক পরিবেশের সঙ্গে সংগ্রামের ব্যর্থতার যন্ত্রণা। রোমিও জুলিয়েটের জীবনে যে করুণ পরিণতি ঘটেছে তার জন্যে তাদের পারিবারিক বিবাদ।
দুটি পরিবার মনটেগু ও ক্যাপিউলেট। প্রভাব প্রতিপত্তিতে কেউ কম যায় না। কিন্তু দুই পরিবারের মধ্যেই তীব্র বিবাদ। সারাটা বছরই ঝগড়া মারামারি লেগেই আছে। ক্যাপিউলেট পরিবারের কন্যা জুলিয়েট। রূপের কোন তুলনা নেই। শান্ত স্বভাবের মেয়ে। অপরদিকে মন্টেগু পরিবারের সন্তান রোমিও পরিবারের সকলের চেয়ে আলাদা। একদিন দুজনে দেখা হয়। রূপে মুগ্ধ দুই তরুণ-তরুণী প্রেমের বাধনে বাধা পড়ে যায়। কিন্তু এই প্রেম তো দুই পরিবারে কেউ স্বীকার করবে না। তাই চলে গোপন অভিসার। কিন্তু মিলনের পথে বাধা এসে দাঁড়ায়। জুলিয়েটের বিবাহ স্থির হয় জায়গায়। অসহায় জুলিয়েট তার গুরু সন্ন্যাসী লরেন্সর কাছে সাহায্য চায় কেমন করেই হোক এই বিয়ে বন্ধ করতেই হবে।
লরেন্স তাকে এক শিশি ওষুধ দেয়। সেই ওষুধের প্রভাবে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়বে জুলিয়েট। মনে হবে মারা গিয়েছে। সেইভাবে থাকবে বিয়াল্লিশ ঘণ্টা। তাকে সমাধি দেওয়া হবে। এই ঘটনা জানবে শুধু রোমিও। যখন জুলিয়েটের ঘুম ভাঙবে, দুজনে পালিয়ে যাবে মান্তুয়ায়।
বিয়ের রাতেই জুলিয়েট সেই ওষুধ খায়, মৃত মনে করে সমস্ত প্রাসাদে কান্নার রোল ওঠে। বিয়ের সাজেই তাকে সমাধিস্থ করা হয়।
দুর্ভাগ্যবশত লরেন্সের পাঠানো সংবাদ ঠিক সময়ে এসে পৌঁছায় না রোমিওর কাছে। জুলিয়েটের মৃত্যু সংবাদ শুনে শোকে দুঃখে সকলের অগোচরে সমাধিক্ষেত্রে গিয়ে তীব্র বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করে। এদিকে জুলিয়েটের জ্ঞান ফিরে আসে। প্রিয়তমের মৃত দৃশ্যে নিজেকে ঠিক রাখতে পারে না। রোমিওর ছোরা তুলে নিয়ে নিজের বুকে বিধিয়ে দেয়। তার মৃত্যুদেহ লুটিয়ে পড়ে রোমিওর উপর।
দুই পরিবারের লোকজনই সবকিছু জানতে পেরে ছুটে আসে। দুটি তরুণ প্রাণের মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে শেষ হয় পারিবারিক বিবাদ।
রোমিও জুলিয়েট নাটকে প্রেমের দৃশ্যগুলো শেক্সপীয়রের কবিত্বগুণে মনোহারি হয়ে উঠেছে। ভাষার লাবণ্য আর মাধুর্য নাটকীয়তার অসাধারণত্বের জন্য রোমিও জুলিয়েট যুগ যুগ ধরে মানুষের মন কেড়ে নিয়েছে।
মানুষের মানসিক দুর্বলতা থেকে কিভাবে ট্রাজেডি রচিত হয় তারাই প্রকাশ ঘটেছে শেক্সপীয়রের বিখ্যাত ট্রাজেডি ওথেলোতে।
ভেনিসের বীর সেনাপতি ওথেলো। কৃষ্ণকায় মূর। সাহসী দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা। তার বীরত্বের কাহিনী শুনতে শুনতে তাকে ভালবেসে ফেলেছিল সেনেটার ব্রাবনশিওর সুন্দরী কন্যা ডেসডিমোনা! ওথেলোর সঙ্গে ঘর ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল। ব্রাবানশিও অভিযোগ জানাল ডিউকের কাছে। ডিউকের আদেশে সকলের সামনে এসে ডেসডিমোনা জানাল, সে ওথেলোকে ভালবেসে স্বেচ্ছায় ঘর ছেড়ে বার হয়েছে।
অন্যদিকে ব্রাবানশিওর এক আত্মীয় রোডারিগা চেয়েছিল ডেসডিমোনাকে বিবাহ করতে। তার এই ইচ্ছার কথা জানত ওথেলোর এক কর্মচারী ইয়াগো। তার ইচ্ছা ছিল সেনাপতি ওথেলোর সহকারী হবার। কিন্তু ওথেলো সহকারী হিসাবে নির্বাচিত করেছিল বেসিওকে তাড়িয়ে দিয়ে সে হবে ওথেলোর সহকারী।
এমন সময় তুর্কীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য ওথেলোকে পাঠনো হল সাইপ্রাসে। তাঁর অনুগামী হল ডেসডিমোনা, বেসিও, ইয়াগো ও তার বৌ এমিলিয়া।
যুদ্ধে জয়ী হয় ওথেলো। তার সম্মানে আনন্দ উৎসব হয়। রাত গম্ভীর হতেই নগর রক্ষার ভার বেসিওর ওপর দিয়ে ডেসডিমোনার শয়নকক্ষে যায় ওথেলো। ইয়াগো এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। বেসিওকে মদ খাইয়ে মিথ্যা গণ্ডগোল সৃষ্টি করে। তারই জন্যে তাকে কর্মচ্যুত করে ওথেলো। দুঃখে অনুশোচনায় ভেঙে পড়ে বেসিও। ইয়াগো তাকে বলে ডেসডিমোনার কাছে গিয়ে অনুরোধ করতে। স্ত্রীর কথা ওথলো কখনোই ফেলতে পারবে না। বেসিও যায় ডেসডিমোনার কাছে। গোপনে ওথেলো ইয়াগোকে ডেকে বলে। দুজনের মধ্যে গোপন প্রণয় আছে। ওথেলোর মনের মধ্যে সন্দেহের বীজ জেগে ওঠে। ওথেলো ডেসডিমোনাকে একটি মন্ত্রপূত রুমাল দিয়েছিল। ডেসডিমোনা কখনো সেই রুমালটি নিজের হাতছাড়া করত না একদিন ডেসডিমোনার কাছ থেকে রুমালটি হারিয়ে গিয়েছিল। তা কুড়িয়ে নিয়ে এমিলিয়াকে দিল। ইয়াগো দিল বেসিওকে। ডেসডিমোনার কাছে রুমাল না দেখে ওথেলোর সন্দেহ আরো ঘনীভূত হয়। তারই সাথে ওথেলোর মনকে আরো বিষাক্ত করে তোলে ইয়াগো। ক্রোধে আত্মহারা হয়ে ওথেলো ঘুমন্ত ডেসডিমোনাকে গলা টিপে হত্যা করে। তারপরই আসল সত্য প্রকাশ পায়। ইয়াগোকে বন্দী করা হয় আর ওথেলো নিজেকে বুকে ছুরিবিদ্ধ করে আত্মহত্যা করে। বীর ওথেলোর এই মৃত্যু আমাদের সমস্ত অন্তরকে ব্যথিত করে তোলে।
