এরপরে ওয়াট উন্নততর জীবনের ইঞ্জিন তৈরি করতে উদ্যোগী হলেন এই ধরনের ইঞ্জিনেই বাষ্পের ক্ষমতা পূর্ণ সদ্বব্যবহার করার সুযোগ হল। বাম্পচালিত ইঞ্জিনের সাহায্যে ভারি যন্ত্রপাতি চালাতে গেলে ঐ ইঞ্জিনে কোন কিছু ঘোরানোর বন্দোবস্ত রাখতে হবে। এই ঘোরানোয় গতি আনার সহজতম উপায় ছিল হাতল আর চাকার ব্যবহার করা। দাঁতওয়ালা চাকা, হাতল আর পিষ্টন লাগিয়ে, সিলিন্ডারের দুটি দিকের সঙ্গেই বয়লারের যোগসূত্র ঘটিয়ে রেগুলেটার বসিয়ে, বাষ্পচালিত ইঞ্জিনে একেবারে ভোজবাড়ির মত রূপান্তর ঘটালেন। জেমস ওয়াট এই ইঞ্জিনের কার্যকরী ক্ষমতা শক্তি আর গতির আমূল পরিবর্তন ও পরিবর্ধন এর সঙ্গে ইঞ্জিনে বাষ্পের চাপ ও পরিমান মাপার জন্য “ষ্টীম প্রেসারগেজ” ও লাগালেন। ডাক্তারের কাজে স্টেথোস্কোপ যে রকম গুরুত্বপূর্ণ, একজন ইঞ্জিনিয়ারের কাছে এই “ষ্টীম প্রেসার গেজ” ও তাই। বাষ্পচালিত ইঞ্জিনের যে নকশা জেমস্ ওয়াট তিলে তিলে তৈরি করে দিয়ে গিয়েছেন, এখনো পর্যন্ত তাতে আর বিশেষ পরিবর্তন ঘটেনি।
দুটি ক্ষেত্রে অবশ্য ওয়াট কিছুতেই তাঁর ইঞ্জিনকে আরে বেশি উন্নতর করে তুলতে রাজি হননি। এদের মধ্যে প্রথমটি হল ইঞ্জিনের বহুমুখী, “যৌগিক” প্রসারণ যার ফলে বাষ্পের সাহায্যে ট্রেন চালানো সম্ভব হতঃ আর দ্বিতীয়টি হল খুব উঁচু চাপে বাষ্প ব্যবহার করা। বহুমুখী, “যৌগিক” প্রসারণ তিনি করতে চাননি, কারণ উনি ভেবেছিলেন, এতে তাঁর নিজের সংস্থার একচেটিয়া অধিকার নষ্ট হয়ে যাবে। আর উঁচু চাপে বাষ্প ব্যবহার করতে তিনি রাজি হননি বিস্ফোরণের সম্ভাবনার কথা ভেবে। তাঁর এই মনোভাবের ফলেই পরে রিচার্ড ট্রেভিথিক (১৭৭১–১৮৩৩) আর জর্জ স্টিফেনসন (১৭৮১– ১৮৪৮) বাম্পশক্তি চালিত রেলগাড়ি তৈরি করতে পেরেছিলেন, এবং তার ফলে স্থলপথে যাতায়াত খুবই দ্রুত হয়ে উঠেছিল। অবশ্য বাষ্পচালিত জাহাজ তৈরির ব্যাপারে ওয়াটের বেশ খানিকটা ভূমিকা ছিল। আমেরিকার বাম্পচালিত জাহাজের প্রথম নির্মাণকারী রবার্ট ফুলটন ওয়াটের কারখানাতেই তার জাহাজের ইঞ্জিনের জন্য অর্ডার দিয়েছিলেন।
প্রায় সব আবিষ্কারকের মতই ওয়াটেরও তার আবিষ্কারগুলোকে বাণিজ্যিক দিক থেকে লাভজনক করে তোলার মত ব্যবসা বুদ্ধি বা ক্ষমতা কোনটাই ছিল না। তবে তাঁর। ভাগ্য খুবই ভাল বলতে হবে এইজন্য যে তিনি “ক্যারন আইরন ওয়াস”-এর প্রাণপুরুষ ডঃ রোয়েবা এবং বার্মিংহামের বিখ্যাত রেটপ্যকার ম্যাথিউ বাউলটনকে এ ব্যাপারে তাঁর পাশে পেয়েছিলেন। এই দুজন ব্যক্তি তাঁকে প্রয়োজনীয় টাকা পয়সা দিয়ে খুবই সাহায্য করেছিলেন। পরবর্তীকালে বাউলটন ওয়াটের ব্যবসায়ের অংশীদারও হয়েছিলেন। তাঁর প্রখর ব্যবসার বুদ্ধির সহায়তা না পেলে হয়তো কাজ বন্ধই করে দিতে হত। রৌপ্যকার বাউলটন যে শুধু তাঁর অভিজাত “মাডেমে” গহনার শিল্পমন্ডিত কাজ ছেড়ে ওয়াটের তৈরি ইঞ্জিনগুলো যথাযথভাবে বসানো ও দেখানোর জন্য দরকারে বিপুল পরিমাণে অর্থ জুগিয়েছিলেন তাই এর ইঞ্জিন তৈরি করার জন্য শ্রমিক জোগাড় করে দিয়ে ওয়াটের তাঁর প্রথম ইঞ্জিনটি তৈরি করেছিলেন, সেখানে কামার ও টিনের মিস্ত্রী ছাড়া অন্য কোন শ্রমিক পাওয়াই যেতনা। ঐসব মিস্ত্রীদের কোন বড় কাজ করার যোগ্যতাই ছিল না। বাউলটনের যেসব শ্রমিক ছির তারা সবরকম ধাতুর কাজে এত দক্ষ ছিল যে, যন্ত্রপাতির সাহায্য ছাড়াই তারা যথাসম্ভব নিখুঁত কাজ তুলে দিতে পারত। ওয়াট যে সমস্ত স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতি আবিষ্কার করেছিলেন তা তখনো ভবিষ্যতের গর্ভে; তাই খুব সুদক্ষ হাতের কাজ জানা লোকের পক্ষেওঁ তাড়াতাড়ি এবং পুরোপুরি নিখুঁত কাজ করা ছিল খুবই সময়সাপেক্ষ এবং অতি কঠিন। শস্তা এবং কর্মক্ষম শক্তির উৎস ছাড়া যন্ত্রপাতিও তৈরি করা যাচ্ছিল না। আবার সঠিক যন্ত্রপাতির অভাবে ঠিকমত শক্তির উৎস গড়ে তোলাও সম্ভব হচ্ছিল না এইসব একটা জটিল গোলকধাঁধার সৃষ্টি হয়েছিল। ওয়াইট এই গোলকধাঁধার দুষ্ট চক্র ভাঙতে পেরেছিলেন।
ওয়াটের শেষ জীবন কিছুটা করুণ। চৌষট্টি বছর বয়সে ব্যবসাপত্রের ঝমেলা ঝাট থেকে সরে এসে তিনি নতুন আবিষ্কার করার কাজেই পুরোপুরি আত্মনিয়োগ করলেন। সমগ্র মানবজাতির কল্যাণে যে ব্যক্তিটির এক অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল, সেই ব্যক্তিটি তাঁর বিশাল কর্মযজ্ঞ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে নানারকম তুচ্চ যন্ত্রপাতি নিয়ে টুকটাক করায় মেতে উঠলেন। তাঁর শেষ আবিষ্কারটি ছিল ভাস্কর্যের কাজ নকল করার একটি যন্ত্র। একটি নির্দেশক বা “পয়েন্টার” ভাস্কর্যর ওপরে ঘুরে বেড়াত এবং তার নিয়ন্ত্রণে একটি ঘুরন্ত যন্ত্র অন্য একটি পাথরের চাইয়ের ওপর একইরকম ভাবে খোদাই করে যেত। মৃত্যুর কিছুদিন আগেই এরকম একটি ভাস্কর্যের নকল তাঁর বন্ধুদেরকে “৮৩ বছরের এক তরুণ শিল্পীর” উপহারস্বরূপ পাঠিয়েছিলেন।
১৮১৯ সালে ৮৩ বছর তিনি মারা যান। ওয়েষ্ট মিনিষ্টার অ্যাবিতে তাঁর স্মৃতিফলক রাখা আছে।
স্যাভেরি এবং নিউকোমনে অগ্রদূত হলেও ওয়াইট বর্তমান যুগের আধুনিক বাষ্পচালিত যন্ত্রের আসল উদ্ভাবক ও সৃষ্টিকর্তা। বাষ্পের যে অসীম শক্তি আজ মানুষের করায়ত্ব, তার প্রধান অগ্রদূত জেমস ওয়াট। বাষ্পচালিত রেল ইঞ্জিনের জনক ট্রেভিথিক ও স্টিফেনসনকেও তিনিই পথ দেখিয়েছেন।
৫২. চেঙ্গিস খান (১১৬২–১২২৭)
ইতিহাসে বিতর্কিত পুরুষ কম নেই। তাদের নিয়ে আলোচনাও কম হয়নি। কিন্তু এমন কোনও বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব নেই চেঙ্গিস খানের মতন যার সম্পর্কে বিতর্কের অবকাশ ঠিক সেইখানটিতেই থেমে আছে যেখানটাতে শুরু হয়েছিল। তার কারণ অবশ্য কোনও কোনও ঐতিহাসিক মনে করে যে চেঙ্গিস খান একটি অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব। সমাজ সংগঠনের জন্য যার অবদান অসীম এবং এখনও উল্লেখ্যযোগ্য। কিন্তু সেই তারই পাশাপাশি অনেকেরই স্থিরবিশ্বাস যে চেঙ্গিস খানের মতন অত্যাচারী সেনানায়ক। ইতিহাসে বিরল এবং তিনি শুধু ঘৃণারই যোগ্য।
