উপরোদ্ধৃত কোরআনের আয়াতেও বলা হয়েছে যে, ভ্রূণের লিঙ্গ নির্ধারণ হয় সামান্যতম তরল পদার্থ থেকে। কোরআনের অন্যত্র বর্ণিত (৩২ : ৮) এই। সামান্যতম তরল পদার্থের সারভাগ’ হচ্ছে সেই শুক্রকীটবাহী পদার্থ যে শুক্রকীটের মধ্যে থাকে হেমিক্রোমোজমের চরিত্র। এই হেমিক্রোমোজমের চরিত্রই গর্ভস্থ সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণ করে (যথাঃ ওয়াই = ছেলে; এক্স = মেয়ে)। সুতরাং, দেখাই যাচ্ছে যে, এ বিষয়ে কোরআনের বক্তব্য এবং আধুনিক বিজ্ঞানের গবেষণালব্ধ ফলাফল আশ্চর্যজনকভাবেই অভিন্ন।
প্রকৃতপক্ষে, কোরআনের মানব-প্রজনন-সংক্রান্ত সব বক্তব্য আধুনিক যুগের বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠিত তথ্যকে নতুন করে সত্য বলে প্রমাণ করছে। অন্যকথায়, কোরআনে বর্ণিত তথ্যাবলী আধুনিক বিজ্ঞানের গবেষণা ও আবিষ্কারের দ্বারা সত্য বলে প্রমাণিত হচ্ছে। এখানেই প্রশ্ন:
মোহাম্মদের (দঃ) যুগে বসে কিভাবে কারো পক্ষে আধুনিক ভ্রূণতত্ত্বের এত সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয় জানা সম্ভব?
এ কথা তো কারো অস্বীকার করার উপায় নেই যে, ভ্রূণতত্ত্বের এতসব তথ্য-উপাত্ত আবিস্কৃত ও প্রমাণিত হয়েছে কোরআন নাজিলের হাজার বছর পরে একান্ত হালে, আধুনিক যুগে এসে। সুতরাং বিজ্ঞান তথা বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের এই ইতিহাসই এখন সবাইকে একটি স্থির-সিদ্ধান্তে পৌঁছে দিচ্ছে, আর তা হল : “কোরআনের এতদসংক্রান্ত এইসব বাণী ও বক্তব্য কোনো মানুষের বাণী ও বক্তব্য হতে পারে না। এ বক্তব্য নিঃসন্দেহে ঐশী বক্তব্য; এই বাণী নির্ভুলভাবেই আসমানী ওহী।”
উল্লেখ্য যে, কোরআনের সূরা ওয়াকেয়া’র (৫৬নং সূরা) ৫৮নং বাণীতে মানব-সৃষ্টির বর্ণনা প্রসঙ্গে প্রকৃতির বিভিন্ন জিনিসের সৃষ্টি ও কর্মপ্রক্রিয়ার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে; এবং ৭৭-৮১ নং বাণীতে বলা হয়েছে।
“নিশ্চয় ইহা মর্যাদাসম্পন্ন কোরআন;
ইহা এমন এক কিতাবে লিপিবদ্ধ যাহা সুসংরক্ষিত
–পবিত্রতম ব্যতিরেকে কেহ ইহা স্পর্শ করিতে পারে না;
বহুবিশ্বের প্রভু প্রতিপালকের নিকট হইতেই ইহা অবতীর্ণ।
–তবুও কি তোমরা ইহার প্রতি উপেক্ষা/তাচ্ছিল্য প্রদর্শন করিয়া চলিবে?”
৪০. মানুষের পরিবর্তন : বিবর্তন ও রূপান্তর
পূর্বোক্ত আলোচনায় যে বিষয়টি পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠেছে, তা হল, পিতা মাতার নিকট থেকে প্রাপ্ত ক্রোমোজম তথা জিন-এর মাধ্যমে প্রতিটি নতুন শিশুর অর্থাৎ প্রতিটি ব্যক্তির মধ্যেই ঘটে চলেছে পরিবর্তন, বিবর্তন ও রূপান্তর। আধুনিক ভ্রূণতত্ত্ব ও বংশগতি বিজ্ঞানের সর্বাধুনিক গবেষণালব্ধ এই ফলাফল ও সিদ্ধান্ত সম্পর্কে যারা অনবহিত, তাঁদের পক্ষে মানুষের এই দৈহিক সংশোধন তথা পরিবর্তন ও রূপান্তরের বিষয়টা হঠাৎ অনুধাবন করা সহজ নাও হতে পারে।
বংশবিস্তারের মাধ্যমে ব্যক্তির বংশগতির উত্তরাধিকার যেমন বিভক্ত হয়ে পড়ে, তেমনি জিন-এর মাধ্যমে পূর্বপুরুষের উত্তরাধিকারও নতুন বংশগতির সঙ্গে সংযুক্ত হয়। এভাবে জিন-এর এই সংযুক্তির মাধ্যমে সৃষ্টি হয় এক নতুন বংশধারা। বলা অনাবশ্যক যে, নতুন বংশধারার দৈহিক পরিবর্তন-ক্রিয়ার সূচনা হয় মায়ের গর্ভধারণের সঙ্গে সঙ্গে। শুধু তাই নয়, গর্ভস্থ শিশুর বিবর্তনের মধ্যদিয়ে এই পরিবর্তন, বিবর্তন ও রূপান্তরের ধারা অব্যাহতভাবে চালু থাকে। এভাবে শিশুর দৈহিক পরিবর্তনের নতুন মাত্রা শুরু হয় সংশ্লিষ্ট শিশুটির জন্মের পরবর্তী পর্যায়ে। এই পরিবর্তন, বিবর্তন ও রূপান্তরের কাজটি চলতেই থাকে শিশুর গোটা শৈশব, কৈশোর ও তারুণ্য জুড়ে এবং শিশুটি যখন যৌবনে পৌঁছায়, শুধু তখনই তার দৈহিক এই রূপান্তরের কাজটি লাভ করে পূর্ণ পরিণতি।
এখানে, আধুনিক বিজ্ঞান-সমর্থিত মানুষের রূপান্তরের যে বিষয়টি আলোচিত হচ্ছে, সেই বক্তব্য কেউ যদি সম্যকভাবে উপলব্ধি করতে সক্ষম না হন, তবে তার নিকট পূর্বেউদ্ধৃত কোরআনের বিভিন্ন আয়াতের বক্তব্য সঠিক অর্থ ও তাৎপর্য নিয়ে ধরা নাও পড়তে পারে। কেননা, তিনি ধরেই নিয়েছেন যে, মানুষের দেহগত যে পরিবর্তন, বিবর্তন ও রূপান্তর তা শুধু তার জণবস্থায় মাতৃগর্ভেই সম্পাদিত হয় এবং কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে শুধু সেই কথাটাই বলা হয়েছে; অন্য কিছু নয়। কিন্তু এই ধারণা যে সঠিক নয়, উপরের আলোচনা থেকে তা স্পষ্ট হলো।
মূলত, বিজ্ঞানের গবেষণায় যা ধরা পড়েছে এবং কোরআনের বিভিন্ন বাণীতে যা বলা হয়েছে, তা হল : জন্মের পরেও পরিণত বয়সে পৌঁছানোর সময় পর্যন্ত মানুষের দেহগত পরিবর্তন, বিবর্তন ও রূপান্তরের কাজটা অব্যাহত থাকে। বিষয়টা সীমাবদ্ধ দৃষ্টিসম্পন্ন যে-কারো নজর এড়িয়ে যাওয়া বিচিত্র নয়। এতসব কারণেই এই গবেষণা-বিশ্লেষণে আধুনিক বিজ্ঞানের নব-আবিস্কৃত জিন-এর ভূমিকা নিয়ে বিশদ আলোচনা করা হলো এবং বিশেষ পরিশ্রম করেই অর্থ, ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণসহ কোরআনের বেশকিছু আয়াতের উদ্ধৃতি দেয়া হয়েছে। সে সব আয়াতে, আমার স্থির বিশ্বাস, সময়ের ধারাবাহিকতায় ব্যক্তি মানুষের তথা মানবজাতির দৈহিক পরিবর্তন, বিবর্তন ও রূপান্তরের কথাই বলা হয়েছে।
বিষয়টি আরো পরিষ্কার করে তুলে ধরার জন্য এখানে উপস্থিতক্ষেত্রে প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার একটি উদাহরণ পেশ করা হচ্ছে। মানুষের দেহগত বিবৃতি খুবই সাধারণ একটা ব্যাপার। দেহবিকৃতির একটি সাধারণ ব্যাধি মঙ্গোলিজম’ নামে পরিচিত। আধুনিক প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা থেকে জানা গেছে, এই ব্যাধির দরুন যে বিকৃতি ঘটে থাকে, তার প্রধান কারণ হচ্ছে, জন্মসূত্রে প্রাপ্ত একটি বিকৃত ক্রোমোজম। বিকৃত এই ক্রোমোজমটি সাধারণ ক্রোমোজম অপেক্ষা তিনগুণ বড়। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা এই ক্রোমোজমের নাম দিয়েছেন ক্রোমোজম-২১ এবং এই ব্যাধির নাম দেয়া হয়েছে ট্রাইজোমি-২১।
