পিথাগোরীয় জীবন-বিধানের কয়েকটি নিয়ম ছিল এ রকম—
১. শিম ভক্ষণ করবে না।
২. পতিত বস্তু তুলে নেবে না।
৩. সাদা মোরগ স্পর্শ করবে না।
৪. রুটি ভাঙবে না।
৫. দুটি লোহার দত্রে উপরে আড়াআড়িভাবে স্থাপিত কোনো দণ্ড (ক্রবার) ডিঙাবে না।
৬. লোহার দণ্ডের দ্বারা আগুন উস্কাবে না।
৭. সম্পূর্ণ রুটি থেকে খাবে না।
৮. মালা থেকে পুষ্প ছিঁড়ে নেবে না।
৯. কোয়ার্ট পরিমাপের উপরে বসবে না।
১০. হৃৎপিণ্ড ভক্ষণ করবে না।
১১. মহাসড়কে হাঁটবে না।
১২. গৃহের ছাদে চড়ুই পাখিকে বাসা বাঁধতে দেবে না।
১৩. চুল্লি থেকে পাত্র সরানোর পর ভস্মে পাত্রের চিহ্ন রাখবে না, ভস্ম নেড়ে-চেড়ে পাত্রের দাগ মিশিয়ে দেবে।
১৪. আলোর পাশে যে দর্পণ রয়েছে তার পানে তাকাবে না।
১৫. শয্যাত্যাগের পর বিছানায় দেহের ছাপ রাখবে না, ছাপ মুছেয়া ফেলে বিছানা গুটিয়ে রাখবে।
উল্লিখিত সব উপদেশই আদিম ট্যাবু ধারণার অন্তর্ভুক্ত।
ফ্রম রিলিজিওন টু ফিলোসফি গ্রন্থে কর্নফোর্ড বলেছেন, তার মতে পিথাগোরাসের দার্শনিক ধারাটিতে সেই মরমিবাদের মূল ধারাটি উপস্থাপিত হয়েছে, যেটিকে আমরা বৈজ্ঞানিক প্রবণতার বিপরীতে স্থাপন করেছি। কর্নফোর্ড পারমিনাইডিসকে বলেছেন যুক্তিশাস্ত্রের আবিষ্কর্তা। তিনি মনে করেন পারমিনাইডিস পিথাগোরাসবাদের এক দলছুট শাখা। তিনি আরো মনে করেন, প্লেটো নিজেও তার অনুপ্রেরণার মূল উৎস খুঁজে পেয়েছিলেন ইতালীয় দর্শনে। কর্নফোর্ড বলছেন, পিথাগোরাসবাদ ছিল অফিঁজমের একটি সংস্কার-আন্দোলন আর অর্ফিজম ছিল ডায়োনিসাস-পূজার একটি সংস্কার-আন্দোলন। পুরো ইতিহাসে বুদ্ধিবাদ ও মরমিবাদের মধ্যে যে বিরোধ চলে আসছে তা প্রথম পরিলক্ষিত হয় গ্রিকদের মধ্যে। অলিম্পীয় দেবকুল ও স্বল্প সভ্য দেবতাদের মধ্যে সেই বিরোধ ফুটে ওঠে। অন-অলিম্পীয় সেসব স্বল্প সভ্য দেবতাদের সঙ্গে সেই সব আদিম ধর্মবিশ্বাসের মিল ছিল বেশি যেসব ধর্মবিশ্বাস নিয়ে নৃতত্ত্ববিদরা কাজ করেন। বুদ্ধিবাদ ও মরমিবাদের মধ্যকার এই বিভেদে পিথাগোরাস ছিলেন মরমিবাদের পক্ষে, যদিও তার মরমিবাদের ধরনটি ছিল অদ্ভুত রকমের বুদ্ধিবৃত্তিক। তিনি নিজেকে এক আধা-ঐশ্বরিক চরিত্ররূপে উপস্থাপন করেছিলেন। মনে হয় এই উক্তিটি তারই : জগতে মানুষ আছে, দেবতারা আছেন, আর আছে পিথাগোরাসের মতো এক প্রকারের জীব। কর্নফোর্ড বলেছেন, পিথাগোরাস যেসব পদ্ধতিকে উদ্বুদ্ধ করেছেন তার সবই ঝোঁক পরজাগতিক, সেগুলোতে সব মূল্য পেয়েছে ঈশ্বরের অদৃশ্য ঐক্য। দৃশ্যমান জগৎকে মিথ্যা আর মায়াবী বলে নিন্দা করা হয়েছে। বলা হয়েছে জগৎ একটি অস্বচ্ছ ঘোলাটে মাধ্যম, যার ভেতর দিয়ে স্বর্গীয় আলোকরশ্মি ভেঙে ভেঙে যায় আর কুয়াশা ও অন্ধকারে অস্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ডিকেয়াকোস বলেছেন, পিথাগোরাসের প্রথম শিক্ষা ছিল এই যে, আত্মা অমর এবং তা অন্যান্য ধরনের জীবে রূপান্তরিত হয়। কোনো কিছুই সম্পূর্ণরূপে নতুন নয়, কারণ জীবিত সব কিছুরই চক্রাকারে পুনর্জন্ম ঘটে। প্রাণ নিয়ে যা কিছুর জন্ম হয়েছে তাকেই আত্মীয় জ্ঞান করতে হবে।
পিথাগোরাসের সভ্যসংঘে নারী ও পুরুষকে সদস্য করা হতো সমান শর্তে। সেখানে সম্পত্তির মালিকানা ছিল যৌথ, সবার জীবনযাপন পদ্ধতি ছিল একই রকম, সাধারণ। এমনকি বৈজ্ঞানিক ও গাণিতিক আবিষ্কারগুলোকেও যৌথকর্মের ফসল বলে বিবেচনা করা হতো। আর একধরনের মরমিবাদী চিন্তা থেকে মনে করা হতো যে সেগুলোর পেছনে আছেন পিথাগোরাস। এমনকি তার মৃত্যুর পরেও এ-রকম ভাবা হত। হিপ্পাসোস ও মেটাপন্টিওন নামে দুজন সদস্য এ নিয়ম ভঙ্গ করেছিলেন, এই পাপের ফলে ঐশ্বরিক অভিশাপে তারা জাহাজডুবির শিকার হয়েছিলেন। কিন্তু এসবের সঙ্গে গণিতের সম্পর্ক কী? সম্পর্কটা একধরনের নৈতিক সম্পর্ক, যে নৈতিকতায় চিন্ত। শীল জীবনকে শ্রেয় মনে করা হতো। বার্নেট এই নৈতিকতার সারসংক্ষেপ করেছেন এ রকম–
আমরা এ জগতে আগন্তুক। আত্মা হচ্ছে দেহের সমাধি। কিন্তু আমাদের উচিত নয় আত্মহত্যার দ্বারা এখান থেকে পালাবার চেষ্টা করা। কারণ আমরা হলাম পশুপাল আর ঈশ্বর আমাদের রাখাল। তার হুকুম ছাড়া আমরা পালাতে পারি না। এ জীবনে মানুষ আছে তিন প্রকারের। অলিম্পিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় যেমন তিন ধরনের মানুষ আসে ঠিক তেমনি। সবচেয়ে নিম্ন শ্রেণির মানুষ হচ্ছে তারা, যারা আসে কেনাবেচা করতে। তাদের ঠিক উপরের স্তরটিতে আছে তারা, যারা প্রতিযোগিতা করে। আর সর্বোত্তম স্তরে হচ্ছে তারা যারা কিছুই করে না, শুধু দেখে অর্থাৎ যারা নিরাসক্ত দর্শক। তাই সর্বোত্তম উৎকর্ষ হচ্ছে নিরাসক্ত বিজ্ঞান, আর যে ব্যক্তি নিজেকে বিজ্ঞানের প্রতি উৎসর্গ করেন তিনি প্রকৃত দার্শনিক, তিনিই সবচেয়ে সফলভাবে নিজেকে মুক্ত করেছেন জন্মের চক্র থেকে।
প্রায়ই শব্দার্থের নানা ধরনের পরিবর্তন ইঙ্গিতপূর্ণ হয়ে থাকে। আমি orgy শব্দটি নিয়ে আগে আলোচনা করেছি। এখন theory শব্দটি নিয়ে কিছু কথা বলতে চাই। এটি মূলত ছিল একটি অফিক শব্দ। কর্নফোর্ড এর অনুবাদ করেছেন আবেগপূর্ণ সহানুভূতি সহযোগে অনুধ্যান। পিথাগোরাস বলছেন, যখন কেউ আবেগপূর্ণ সহানুভূতি-সহযোগে অনুধ্যান করে তখন তার অবস্থা হয় পীড়িত ঈশ্বরের মতো। অর্থাৎ, তার মৃত্যু হয় এবং আবার সে নতুন করে জন্ম নেয়। পিথাগোরাসের কাছে আবেগপূর্ণ সহানুভূতি সহযোগে অনুধ্যান ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক, তার সূচনা গাণিতিক জ্ঞানের মধ্য দিয়ে। এইভাবে পিথাগোরাসবাদের মধ্য দিয়ে theory শব্দটি ক্রমে তার আধুনিক অর্থ অর্জন করেছে। কিন্তু পিথাগোরাসের দ্বারা উদ্বুদ্ধ সবার কাছে তা আধ্যাত্মিক জ্ঞানের একটি উপাদান হিসেবেই থেকে গিয়েছিল। পাঠশালায় যারা অনিচ্ছুকভাবে হলেও একটু-আধটু গণিত শিখেছে তাদের কাছে এটা অদ্ভুত মনে হতে পারে। কিন্তু গণিতের আকস্মিক উপলব্ধির গভীর আনন্দলাভের অভিজ্ঞতা যাদের হয়েছে, যারা গণিত ভালোবাসে, তাদের কাছে পিথাগোরীয় দৃষ্টিভঙ্গি-যদি সত্য না-ও মনে হয়-পুরোপুরি স্বাভাবিক বলে মনে হবে। মনে হতে পারে, অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিক তার অভিজ্ঞতার উপাদান-বস্তুর দাস, কিন্তু খাঁটি গণিতজ্ঞ সঙ্গীতজ্ঞের মতো এক নিজস্ব সুশৃঙ্খল সুন্দর জগতের স্বাধীন স্রষ্টা।
