‘না!’ কনর চিৎকার করে। জেগে ওঠার পরেও আতঙ্কটা তাকে চেপে ধরে বসে আছে। মনে হচ্ছে যেন শ্বাস আটকে গেছে তার। কেবলই দম বন্ধ হয়ে আসছে। তার চোখে পানি চলে এলো।
‘না।’ খুব আস্তে করে বললো এবার।
বাসাটা এখন নিস্তব্ধ আর অন্ধকার। চুপ করে এক মুহূর্তের জন্য কান পাতে সে। না, কোনো শব্দ নেই। অন্ধকারে সে ঘড়ির দিকে তাকালো।
১২টা বেজে ৭ মিনিট। অবশ্যই, তাই তো হবে।
নিস্তব্ধ বাসায় আরও কিছু শোনার জন্য কান পাতলো সে। কেউ ‘কনর’ বলে ডাকছে না, কোনো কাঠ মচকানোর শব্দ নেই।
আজ রাতে সেটা আসবে না হয়তো।
১২টা ৮ মিনিট। ঘড়িতে সে সময় দেখে।
১২টা ৯ মিনিট।
কিছুটা ক্ষোভ নিয়ে কনর উঠে রান্নাঘরে চলে আসে। সেখান থেকে জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়।
দানবটা তার পেছনের উঠানে দাঁড়িয়ে আছে।
‘এত সময় কেন লেগেছে তোমার?’ সেটা জিজ্ঞেস করলো, ‘তোমাকে এখন প্রথম গল্প বলার সময় হয়ে গেছে।’
কনর বাইরে গিয়ে বাগানের চেয়ারে বসলো, পাগুলো বুকের কাছে উঠিয়ে মাথাটা হাঁটুর ওপর দিয়ে রেখেছে। ওখান থেকে একটুও নড়েনি।
‘তুমি শুনছো?’ দানবটা জিজ্ঞেস করলো।
‘না।’ কনর বললো।
চারপাশে বাতাস তীব্র গর্জন করে উঠলো।
‘আমার কথা শুনতে হবে।’ দানবটা গর্জে উঠলো, ‘এই যে চারপাশে যা কিছু দেখছো, সেগুলো যত দিন ধরে এ জগতে আছে, তত দিন আমিও ছিলাম। তাই আমাকে যথেষ্ট সম্মান দেখাবে তুমি…..
কনর চেয়ার থেকে উঠে রান্নাঘরের দরজার দিকে হাঁটতে শুরু করলো।
‘কোথায় যাচ্ছ তুমি?’
কনর রেগেমেগে ঘুরে এমনভাবে তাকালো যে দানবটা চমকে উঠলো, দ্রু কুঁচকালো।
‘তুমি কী জানো? কোনো কিছুর ব্যাপারে তুমি কীই-বা জানো?’ কনর
তেতোভাবে বললো।
‘আমি তোমার ব্যাপারে জানি, কনর ও’ম্যালি।’
‘না, তুমি জানো না। যদি জানতে, তাহলে বুঝতে যে কাল্পনিক বিরক্তিকর একটা গাছের কাছ থেকে বিরক্তিকর গল্প শোনার সময় আমার নেই।’
‘ওহ্? তোমার ঘরে পড়ে থাকা ঐ বেরিগুলো তাহলে কাল্পনিক ছিল?’
‘তাতে কী আসে যায়? বিরক্তিকর বেরিগুলো, ইশ কী ভয়ানক, কেউ বাঁচাও আমাকে এই বেরিগুলো থেকে!’
দানবটা তার দিকে অবাক হয়ে তাকালো।
‘অদ্ভুত ব্যাপার, তুমি বলছো যে তুমি বেরিগুলোকে ভয় পাচ্ছ। কিন্তু তোমাকে দেখে তো মনে হয় না ভয় পাচ্ছ।’
‘তুমি হাজার বছর ধরে বেঁচে আছো, কিন্তু কখনো ব্যঙ্গ করার কথা শোনোনি?’ কনর জিজ্ঞেস করলো।
‘ও হ্যাঁ, আমি শুনেছি।’ দানবটা কোমরে হাত দিয়ে বললো, ‘কিন্তু আমার সাথে কথা বলতেই লোকজন ভয় পায়, ব্যঙ্গ করা তো দূরের কথা। ‘
‘তুমি আমার পিছু নিয়েছো কেন?’
দানবটা মাথা নাড়লো, কিন্তু তা কনরের প্রশ্নের উত্তরে না। ‘ব্যাপারটা সত্যিই অদ্ভুত। আমি এতকিছু করলাম, তাও তুমি ভয় পাচ্ছ না।’
‘তুমি একটা গাছ।’ কনর বললো। হ্যাঁ, গাছটা কথা বলতে পারে, হাঁটাচলা করতে পারে। চাইলে কনরকে গিলে খেয়ে ফেলতে পারবে। গাছটা ওর বাড়ির চেয়েও বড়ো। কিন্তু হাজার হোক, ওটা তো একটা গাছ। সামান্য ইয়ো গাছ। কনর তো দূর থেকে ওর গায়ে লেগে থাকা বেরিও দেখতে পাচ্ছে।
‘তোমার নিজের কাছে ভয় পাওয়ার মতো তাহলে অনেককিছু ইতোমধ্যেই আছে।’ দানবটা কিন্তু এবার প্রশ্ন করেনি।
কনর একবার মাটির দিকে তাকিয়ে উপরে চাঁদের দিকে তাকালো। দানবের দিকে সে তাকাতে চায় না। দুঃস্বপ্নটা যেন আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। ভাবনাচিন্তা এলোমেলো করে দিচ্ছে। সবকিছুই কেমন দুর্বোধ্য আর অসম্ভব বলে মনে হচ্ছে। তাকে এতটা ভারী করে দিচ্ছে, মনে হচ্ছে যেন কাঁধের ওপর বিশাল এক পর্বতসমান বোঝা।
‘আমি ভেবেছিলাম।’ কনর একটু কেশে বললো, ‘আমি যখন নানুর সাথে ঝগড়া করছিলাম, তখন তুমি এসেছিলে, আর আমি ভেবেছিলাম–’
‘কী ভেবেছিলে?’ কনরের কথা শেষ হওয়ার আগেই দানবটা জিজ্ঞেস করলো। ‘থাক বাদ দাও।’ বলে কনর ঘরের দিকে হাঁটা শুরু করলো।
‘তুমি ভেবেছিলে আমি তোমাকে সাহায্য করতে এসেছি।’ দানবটা উত্তর দিলো।
কনর থেমে গেল।
‘তুমি ভেবেছো আমি তোমার শত্রু বধ করতে এসেছি, রূপকথার ড্রাগনগুলো মেরে ফেলতে এসেছি।’
কনর ভেতরেও গেল না, ফিরেও তাকালো না।
‘তোমাকে বলেছিলাম না আমি তোমার ডাক শুনেই এসেছি? কথাটা সত্য বলেই তুমি মেনে নিয়েছো। তাই না?’
কনর এবার ঘুরলো, ‘কিন্তু তুমি তো আমাকে কেবল গল্প শোনাতে চাও।’ তার কণ্ঠে যেন অসন্তুষ্টি ঝরে পড়ছে। আসলেই সে ওটা ভেবেছিল।
দানবটা হাঁটু ভেঙে কনরের কাছাকাছি চলে এলো, ‘সে-সব গল্প–যখন আমি শত্ৰু বধ করেছিলাম, রূপকথার ড্রাগনগুলো মেরে ফেলেছিলাম।’
চোখ পিটপিট করে দানবের চোখের দিকে তাকালো কনর।
‘গল্প জিনিসটাই বুনো।’ দানবটা বলতে শুরু করে, ‘একবার গল্পের বাঁধ ছুটে দিলে কোথায় কী হবে বলা যায় না।’
দানবটা দাঁড়িয়ে কনরের ঘরের দিকে তাকালো, যেখানে নানু ঘুমিয়ে আছে এখন।
‘তোমাকে আমার একটা গল্প বলবো। ওই সময় আমি এভাবেই জেগে উঠেছিলাম।’ দানব বলে, ‘সেবার এক জঘন্য রানিকে শায়েস্তা করেছিলাম।’
কনর ঢোক গিলে দানবের চেহারার দিকে তাকালো, ‘ঠিক আছে। শোনাও তোমার গল্প।’
প্রথম গল্প
‘অনেক বছর আগের কথা।’ দানব তার গল্প বলতে শুরু করলো, ‘তখন এখনকার মতো গাড়িঘোড়া ছিল না। চারপাশে কেবল গাছগাছালি ছাড়া আর কিছুই দেখা যেত না। তখন গাছই সীমানায় পাহারার কাজ করে দিতো। প্রতিটি রাস্তা গাছে ঢাকা ছিল। প্রতিটি ঘর গাছে ঢাকা ছিল। এমনকি ঘরবাড়িও গাছ আর পাথর দিয়ে বানানো হতো।
