তখন জায়গাটাকে একটা রাজ্য বলা হতো।
‘কী?’ কনর ঘুরে তার পেছনের উঠোনের দিকে তাকিয়ে বললো, ‘এখানে?’
দানবটা কৌতূহলী হয়ে তার দিকে তাকায়, ‘তুমি জানো না কিছু?’
‘কোনো রাজ্যের কথা শুনবো কীভাবে! এখানে তো ম্যাকডোনাল্ড’সও নেই।’
‘যাই হোক।’ দানবটা বলতে লাগলো, ‘এখানে ছোটো কিন্তু সুখের একটা রাজ্য ছিল। রাজা ছিলেন একজন ন্যায়পরায়ণ শাসক। তাঁর স্ত্রী চারটি শক্তিশালী পুত্রসন্তানের জন্ম দেন। কিন্তু তাঁর শাসনামলে রাজ্যের শান্তিরক্ষার জন্য রাজাকে নানান যুদ্ধে যেতে হতো। দৈত্য আর ড্রাগন, লাল চোখের কালো নেকড়ে, আর জাদুকরদের বিশাল সৈন্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। যুদ্ধ করেই রাজ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হতো, এবং পুরো রাজ্যেই শান্তি ছিল। কিন্তু জয়ের বিনিময়ে রাজাকে মূল্য দিতে হয়। একে একে তাঁর চারটি পুত্র সন্তানই মারা যায়। হয়তো কোনো ড্রাগনের আগুনে পুড়ে বা কোনো দৈত্যের হাতে বা কোনো নেকড়ের কামড়ে অথবা কোনো মানুষের বর্ষার আঘাতে। একে একে চার যুবরাজ মারা যাওয়ার পর তার শিশু নাতি বাদে আর কোনো উত্তরাধিকারী জীবিত ছিল না।’
‘কী বাচ্চাদের মতো গল্প! রুপকথা না-কি!’ কনর কিছুটা সন্দেহ নিয়ে বলে।
‘বর্শার আঘাতে কিংবা নেকড়ের কামড় খেলে মানুষ কত জোরে চিৎকার দেয়— সেটা তো তুমি কখনো জানবে না। জানলে এই কথা বলারই সাহস হতো না। এখন আমার গল্প মন দিয়ে শোনো।’ দানব বলে।
একে একে রাজার স্ত্রী ও শিশু যুবরাজের মা শোকে ভেঙে পড়েন এবং একসময় মারা যান। এরপর রাজা শিশু যুবরাজকে নিয়ে একা হয়ে পড়েন। এই একাকিত্বের সাথে মানিয়ে নেওয়া খুব কঠিন।
‘আমাকে আবারও বিয়ে করতে হবে।’ রাজা সিদ্ধান্ত নেন, ‘আমার জন্য না হলেও আমার যুবরাজ এবং আমার রাজ্যের উপকারের জন্য এটা করতে হবে।’
তাই পার্শ্ববর্তী রাজ্যের এক রাজকুমারীকে বিয়ে করে তিনি দুই রাজ্যেরই শক্তিবৃদ্ধি করেন। রাজকুমারীর বয়স কম এবং দেখতে-শুনতেও মন্দ না। তবে সে যা বলে, সরাসরি বলে ফেলে। মুখ সামলে কথা বলে না। রাজাকে দেখে মনে হলো, রাজকুমারীকে পেয়ে তিনি খুশিই হয়েছেন।
এভাবেই ধীরে ধীরে সময় কেটে যেতে লাগলো। শিশু যুবরাজ এখন একজন যুবক। আর দুই বছর পরেই সে রাজসিংহাসনের দায়িত্ব মাথা পেতে নিতে পারবে। কারণ দুই বছর পরেই যুবরাজের বয়স আঠারো হয়ে যাবে। সেই সময়টা রাজ্যের জন্য সুখের ছিল। এত দিনের যুদ্ধ-বিবাদ নেই বললেই চলে। রাজ্যের সুখশান্তি যে সাহসী যুবরাজের হাতে ন্যস্ত হবে, তা নিয়ে কারও মনে সন্দেহ নেই।
কিন্তু রাজা একদিন হুট করেই অসুস্থ হয়ে পড়লেন। গুজব ছড়াতে শুরু করে, নতুন রানি রাজাকে গোপনে বিষ দিয়েছেন। অবশ্য আগে থেকেই অনেকে সুন্দরী রানিকে খুব একটা পছন্দ করতো না। তার সুন্দর চেহারার আড়ালে যে একজন ডাকিনি লুকিয়ে আছে, সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ ছিলো না অনেকের। মহিলা না-কি নিজের রূপ ধরে রাখার জন্য যাদুবিদ্যার আশ্রয় নিতেন। রাজা জীবনের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের আগে প্রজাদের অনুরোধ করেন রানিকে যেন দোষারোপ করা না হয় ।
একদিন রাজা মারা যান। যুবরাজের সিংহাসনে বসার উপযুক্ত হতে আরও এক বছর বাকি। সে পর্যন্ত রানিসাহেবই তার হয়ে রাজ্যের দেখভাল করবেন।
কিছুদিনের মধ্যে সবাই অবাক হয়ে লক্ষ করলো, রানির শাসনাধীনে রাজ্যে শান্তি বজায় রয়েছে। অনেকটা মৃত রাজার মতোই সুনিপুণভাবে তিনি রাজ্য পরিচালনা করে যাচ্ছেন।
আর এদিকে আমাদের যুবরাজ প্রেমে পড়ে গেলেন।
‘আমি জানতাম।’ কনর গজগজ করে উঠলো, ‘এসব গল্পে সব সময় কোনো একটা বোকা যুবরাজ প্রেমে পড়ে যায়।’ বলে সে বাসার দিকে হাঁটতে শুরু করলো, ‘আমি ভেবেছিলাম গল্পটা ভালো হবে।’
দানবটা হুট করে কনরের পা ধরে তাকে উল্টো করে বাতাসে ঝুলিয়ে ধরলো, ‘তো যা বলছিলাম আমি।’
যুবরাজ যার প্রেমে পড়েছিল, সে সামান্য কৃষকের মেয়ে। কিন্তু কৃষকের মেয়ে হলে কী হবে, অসম্ভব রূপবতী ও বুদ্ধিমতী। কৃষক পরিবারের মেয়েদের একটু চালাক হতেই হয়। এই ব্যাবসাটাই ঝামেলার। রাজ্যের অনেকেই ওদের প্রেমের কথা জানতে পেয়ে হেসেছিল।
রানি খুশি হতে পারেননি। রাজ্যের ওপর এতদিনের একচ্ছত্র আধিপত্য ছেড়ে দেওয়ার কোনো ইচ্ছে তাঁর ছিল না। তাঁর মতে, রাজ্যের দায়ভার রাজবংশের মধ্যেই থাকা সবচেয়ে ভালো হবে। আপাতদৃষ্টিতে রাজকুমার যদি রানিকে বিয়ে করে তবে সবচেয়ে ভালো হয় ।
‘ছিহ!’ উলটো ঝুলে থাকা অবস্থাতেই কনর বলে, ‘রানি তো ওর দাদি হয়!’
‘সৎ দাদি।’ দানবটা কনরের ভুল সংশোধন করে দেয়, ‘তাদের মাঝে রক্তের সম্পর্ক ছিল না এবং রানির বয়সও তখন খুব বেশি না।’
কনর মাথা নাড়লো, ‘তাও এটা ঠিক না।’ একটু থেমে বললো, ‘তুমি কি আমাকে নামাবে?’
দানবটা তাকে মাটিতে নামিয়ে দিয়ে বাকি গল্প বলতে শুরু করলো।
যুবরাজও ভেবেছে যে রানিকে বিয়ে করাটা ভুল হবে। সে মরে যাবে, তাও এমন কিছু করবে না। প্রতিজ্ঞা করলো যে সে কৃষকের মেয়েকে নিয়ে পালিয়ে যাবে এবং তার আঠারো বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার সাথে সাথেই প্রজাদেরকে রানির শোষণ থেকে বাঁচাতে ফিরে আসবে। এভাবেই এক রাতে যুবরাজ ও কৃষকের মেয়ে ঘোড়ায় চড়ে পালিয়ে যায়। রাত হয়ে গেলে বিশাল এক ইয়ো গাছের নিচে রাত কাটানোর জন্য নেমে পড়ে।
