অথবা অন্য কিছুও হতে পারে, ভবিষ্যতের একটা ইঙ্গিত।
কনরের পেটে রাগ দুমড়ে-মুচড়ে উঠতে শুরু করে।
‘ও যেখানে আছে, সেখানেই খুশি আছে মা।’ মা তাড়াতাড়ি উত্তর দিলো, ‘তাই না, কনর?’
কনর চমৎকার হাসি দিয়ে বললো, ‘আমি এখানেই ঠিক আছি।’
ডিনারে আজ চাইনিজ খাবার। নানু আসলে রান্না করতে পারে না। কনর যতবারই তার সাথে থেকেছে, নানুর ফ্রিজে একটা ডিম আর অর্ধেক এভোকাডো ছাড়া আর কিছু পায়নি। কনরের মা অসুস্থ, তাই তার পক্ষে কিছু রান্না করা অসম্ভব। অবশ্য কনর নিজেও রান্না করতে পারে; কিন্তু নানু বোধহয় সেটা ভেবেও দেখেনি।
রান্নাঘর পরিষ্কারের কাজটা তাকেই করতে হলো। একটা পলিথিনের ব্যাগে সে ফয়েলগুলো ভরছিল। এই ব্যাগেই সে আজকে রুমে থাকা বিষাক্ত বেরি ফলগুলো ঢুকিয়ে রেখেছে। রাবিশ বিনে যখন ময়লাগুলো ফেলে দিচ্ছে, তখনই নানু তার পেছনে এসে দাঁড়ায়।
‘এই ছেলে, তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে।’
‘আমার একটা নাম আছে, তুমি জানো তো?’ কনর ব্যাগটা হাত থেকে নামিয়ে বললো, ‘আর নামটা ‘ছেলে’ না।’
‘গলা নামিয়ে কথা বলো।’ নানু হাত ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে আছে। সরাসরি ওর দিকে তাকিয়ে আছে। কনর নিজেও মহিলার দিকে সরাসরি তাকিয়ে থাকে মিনিটখানেক। ‘আমি তোমার শত্রু নই কনর, আমি তোমার মাকে সাহায্য করতে এসেছি।’
‘আমি জানি তুমি কেন এসেছো।’ কনর একটা কাপড় বের করে পরিষ্কার টেবিলটা আবার পরিষ্কার করতে লাগলো।
নানু এগিয়ে এসে কাপড়টা তার হাত থেকে নিয়ে নিলো, ‘আমি এসেছি, কারণ তেরো বছরের একটা বাচ্চার এত তেজ ভালো না।’
কনর রেগেমেগে তার দিকে তাকালো, ‘তাহলে কি এটা তুমি করবে এখন?’
‘কনর–’
‘তুমি চলে যাও। আমাদের তোমাকে লাগবে না। ‘
‘কনর!’ নানু গম্ভীর হয়ে বললো, ‘সামনে যা হতে যাচ্ছে তা নিয়ে কথা বলতে হবে আমাদের।’
‘না হবে না । চিকিৎসার দুই-তিন দিন পর থেকে তার এমন অবস্থাই হয়। কালকে আবার ঠিক হয়ে যাবে, তখন তুমি চলে যেতে পারো।’
ওর নানু সিলিং-এর দিকে তাকায়। তারপর হাত দিয়ে মুখ মুছতে শুরু করে। কনর নানুকে রাগতে দেখে ভীষণ অবাক হলো।
আরেকটা কাপড় বের করে আবার মোছামুছি শুরু করলো কনর, যেন নানুর দিকে আর তাকাতে না হয়। একদম সিংক পর্যন্ত পরিষ্কার করতে করতে সে একবার জানালার সামনে উঁকি দেয়।
দানবটা তার পেছনের উঠানে দাঁড়িয়ে আছে। পড়ন্ত সূর্যের মতোই বিশালাকৃতির লাগছে ওটাকে।
তাকে দেখছে।
‘কাল হয়তো সে ভালো হয়ে যাবে।’ নানুর কণ্ঠ এখন ভারী হয়ে উঠেছে, ‘কিন্তু সব সময় হবে না, কনর।’
এটা একটা ভুল কথা। কনর আবার তার দিকে ঘুরলো, ‘চিকিৎসায় সে ঠিক হয়ে যাচ্ছে, এজন্যই এখনও সেটা চলছে।’
নানু তার দিকে লম্বা সময় ধরে তাকিয়ে রইলো যেন সে কী বলবে বুঝতে পারছে না, ‘তোমাকে তার সাথে এসব নিয়ে কথা বলতে হবে, কনর।’ যেন নিজে নিজেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, ‘তোমার সাথে এসব নিয়ে কথা বলা প্রয়োজন।’
‘কোন সব নিয়ে?’ কনর জিজ্ঞেস করলো।
‘তুমি যে আমার সাথে এসে থাকবে, সেটা নিয়ে।’
কনর ভ্রু কুঁচকে তাকালো। ঘরটা যেন আরও অন্ধকার লাগছে। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো ঘরটা বুঝি কাঁপছে। এখনই ভেঙে গুঁড়িয়ে যাবে।
নানু উত্তরের অপেক্ষা করছে।
‘আমি তোমার সাথে থাকবো না।’ কনর বললো।
‘কনর–’
‘আমি তোমার সাথে কখনোই থাকবো না।’
‘হ্যাঁ, তুমি থাকবে।’ নানু বললো, ‘আমি দুঃখিত, কিন্তু তোমাকে আমার সাথেই থাকতে হবে। তোমার মা তোমাকে বলতে চাইছে না, কারণ তুমি কষ্ট পাবে। কিন্তু আমার মনে হয় তোমার জানা দরকার যে যখন এসব শেষ হয়ে যাবে, তখন তোমার একটা বাসা আছে, ছেলে। সে বাসায় তোমার আপন কেউ থাকবে।’
‘যখন এসব শেষ হবে, তখন তুমি চলে যাবে এবং আমরা নিজেরাই ভালো থাকবো।’
‘কনর–’
এরপর বসার ঘর থেকে কণ্ঠ শোনা গেল, ‘মা? মা?’
নানু এত দ্রুত রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গেল যে কনর চমকে উঠলো। বসার ঘর থেকে কাশির শব্দ শোনা যাচ্ছে আর নানু বলছে, ‘কিছু হয়নি সোনা, কিছু হয়নি, শসসসস’। কনর ঘরে আসার সময় রান্নাঘরের জানালা দিয়ে উঁকি দিলো।
দানবটা চলে গেছে।
নানু সোফায় বসে মাকে ধরে রেখেছে। বারবার পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। আর মা পাশের ছোটো বালতিতে বমি করছে।
নানু কনরের দিকে তাকালো। কিন্তু ঐ কঠোর আর ভাবলেশহীন অভিব্যক্তি দেখে কিছু ঠাহর করা গেল না ।
গল্পের বন্যতা
পুরো বাড়িজুড়ে অন্ধকার। নানু অবশেষে মাকে ঘুম পাড়িয়ে কনরের শোবার ঘরের দরজা বন্ধ করে দিয়ে ঘুমাতে চলে গেল। কনরের সাথে আর কোনো কথা হয়নি ।
কনর সোফায় শুয়ে আছে, তার ঘুম আসছে না। মনে হচ্ছে না আসবে। মাকে দেখে আজ তেমন কিছু মনে হয়নি। কিন্তু নানুর কথা বারবার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। আজ তিন দিন হয়ে গেল মায়ের চিকিৎসা করানো হয়েছে। এর মধ্যে মায়ের সুস্থ হয়ে ওঠার কথা। কিন্তু মাকে দেখে মনে হলো সে আরও ক্লান্ত। বমি করেই যাচ্ছে। এ-রকম তো হওয়ার কথা না…
কনর চিন্তাগুলো মাথা থেকে সরিয়ে দিলেও সেগুলো বারবার চলে আসছে। ধীরে ধীরে তন্দ্রার ভাব এসে গেল। দুঃস্বপ্নটা যখন এলো, তখন সে বুঝতে পারল যে সে ঘুমিয়ে গিয়েছিল।
গাছের স্বপ্নটা নয়। অন্য দুঃস্বপ্নটা।
যেখানে বাতাসের গর্জন হচ্ছে আর মাটি কেঁপে কেঁপে উঠছে এবং এর মাঝে সে শক্ত করে হাত ধরে রাখার চেষ্টা করছে, কিন্তু তবুও সে হাত ছুটে যাচ্ছে। কনর তার সমস্ত শক্তি উজাড় করে দিলেও তা যথেষ্ট নয়। হাত বারবার ছুটে যাচ্ছে আর এরপর সেই গগণবিদারি চিৎকার…
