‘তোমাকে আমি তিনটা গল্প শোনাবো। আমার জীবন্ত হয়ে ওঠার তিনটা গল্প।’
কনর অবাক হলো, ‘তুমি আমাকে গল্প শোনাবে?’
‘অবশ্যই।’ দানব উত্তর দেয়।
‘এহ্!’ কনর নিজের কানকে বিশ্বাসই করতে পারছে না, ‘কী আজব দুঃস্বপ্ন রে বাবা।’
‘পৃথিবীতে গল্পের চেয়ে ভয়ংকর ও অদ্ভুত জিনিস আর দ্বিতীয়টি নেই।’ দানবটি আমুদে স্বরে বলে, ‘গল্প একজন মানুষকে আজীবন তাড়া করে বেড়ায়। বারবার আঘাত করে।’
‘এইগুলো স্কুলের টিচাররা সবসময় বলে।’ কনর জবাব দেয়, ‘এইসব কথা কেউ বিশ্বাস করে না।’
‘আমার তিনটা গল্প শেষ হলে’ যেন কনরের কথা শুনতেই পায়নি এমন ভঙ্গিতে দানবটি বললো, ‘চতুর্থ গল্প তুমি শোনাবে।’
‘আমি ভালো গল্প বলতে পারি না।’
‘তুমি আমাকে চতুর্থ গল্প বলবে, এবং সেটা হবে সত্যি কথাটা।’
‘সত্যি কথাটা?’
‘কেবল সত্যি না। তোমার সত্যি।’
‘আচ্ছা। কিন্তু তুমি তো বললে সবকিছু শেষ হলে আমি প্রচণ্ড ভয় পাবো। আমার তো ভয় করছে না।’
‘কনর ও’ম্যালি, তুমি কিন্তু সত্যি কথাটা বলছো না।’ দানবটা বলে, ‘তুমি সত্য কথাটা লুকিয়ে রেখেছো। কারণ তুমি তোমার নিজের মনের ভেতর লুকিয়ে রাখা সত্যি কথাটাকে অনেক ভয় পাও!’
কনর নড়াচড়া থামিয়ে দেয়।
তার মানে কি….
এটা তো দানবের জানার কথা না…
না না। আসল দুঃস্বপ্নের কথা সে কখনোই বলবে না। কখনও না।
‘তুমি বলবে, আমাকে এজন্যেই ডেকেছো তুমি।’
কনর দ্বিধায় পড়ে গেল, ‘আমি তোমাকে ডাকিনি।’
‘তুমি আমাকে চতুর্থ গল্প বলবে। তোমার সত্যিটা বলবে।’
‘আর যদি না বলি?’
দানবের মুখে ভয়ংকর একটা হাসি খেলে গেল, ‘তাহলে আমি তোমাকে খেয়ে ফেলবো।’
এবার দানব হাঁ করে। সেই বিশাল গহ্বরে পুরো পৃথিবীই নিমেষে হারিয়ে যেতে পারে। কনরও চিরদিনের জন্য হারিয়ে যাবে।
চিৎকার করে সে নিজের বিছানায় জেগে ওঠে।
তার বিছানা। সে ফেরত চলে এসেছে।
অবশ্যই এটা একটা স্বপ্ন ছিল। অবশ্যই। আবারও একই দুঃস্বপ্ন। ।
প্রচণ্ড রাগে সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। রোজ রোজ এমন হলে কি ঘুমানো যায়? আর প্রতিবার এত ক্লান্ত লাগে যে বিশ্রাম নেয়াই হয় না ।
এক গ্লাস পানি খেতে হবে। এভাবেই রোজ ঘুম থেকে জেগে উঠতে হবে। আবার একইভাবে রাত কাটাও। এই স্বপ্ন ভুলে যাওয়ারও কোনো উপায়…
পায়ের নিচে কিছু একটা চাপা পড়ে গলে গেল।
বাতি জ্বালতেই মেঝেতে বিষাক্ত লাল বেরিগুলো দেখতে পেল।
জানালা বন্ধ করার পরেও ওগুলো কোনোভাবে ঘরে ঢুকে পড়েছে।
নানু
‘মায়ের সাথে ভালো হয়ে চলছো তো?’
কনারের নানু তার গালে এত জোরে চিমটি কাটলেন যেন রক্ত বেরিয়ে যাবার উপক্রম।
‘ও খুব ভালো ছেলে, মা।’ কনরের মা নানুর পেছন থেকে দাঁড়িয়ে তার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপলো। মাথায় তার পছন্দের নীল স্কার্ফটা বাঁধা, ‘সুতরাং এতটা শাসনের দরকার হবে না।’
‘কী যে বলো না!’ নানু কনরের দুই গালে ঠাট্টা করে থাপ্পড় দিয়ে বললো, ‘আমাদের জন্যে চায়ের পানি বসাতে পারবে?’ নানু এমনভাবে বললো যে এটাকে প্রশ্ন না ভেবে আদেশ ভাবাই শ্রেয়।
কনর যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলো। সে দ্রুত ওখান থেকে বের হয়ে এলো। ওদিকে নানু কোমরে হাত দিয়ে মায়ের দিকে তাকায়। ‘এখন বলো লক্ষ্মীটি’ কনর রান্নাঘর থেকে শুনতে পেল, ‘তোমাকে নিয়ে কোন কূলে যাই?’
কনরের নানু অন্যান্য নানুদের মতো না। লিলির নানুকে কনর কতবার দেখেছে। সব নানু যেমন হয়, সাদা চুলের হাসিখুশি মানুষ। ক্রিসমাসের সময় সবার জন্য আলাদা করে সেদ্ধ সবজি রান্না করে আর মাথায় কাগজের টুপি পরে খালি হাসাহাসি করে।
আর কনরের নানু সুট পরে, চুল ধূসর রাখার জন্যে কালার করে। মহিলার কথাবার্তাও অদ্ভুত, কোনো মানে খুঁজে পাওয়া যায় না। ‘ষাটের দশক মানে আধুনিক পঞ্চাশের দশক’ বা ‘গাড়ির রং হওয়া উচিত খুব দামি’–এসব কথার মানেই-বা কী? জন্মদিনের কার্ড মেইল করে, ওয়াইন নিয়ে ওয়েটারের সাথে ঝগড়া বাঁধায়। সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার, মহিলার এখনও একটা চাকরি আছে। নানুর বাসা তো আরও জঘন্য। দামি আর পুরোনো জিনিসপত্র গাদাগাদি করে রাখা। সেগুলোতে কেউ কখনো হাত দিতে পারে না। যেমন–ঘড়ির কথাই ধরা যাক। ঘর ঝাঁট দেয় যে মহিলা, তাকেও হাত দিতে দেবে না! এটাও একটা চিন্তা বিষয়। কোনো নানুর বাড়িতে কেউ কখনও ঘর ঝাঁট দেওয়ার মহিলা দেখেছে?
‘দুই চামচ চিনি, কোনো দুধ দেবে না।’ চা বানাতে বানাতে কনর নানুর কণ্ঠ শুনতে পায়। সে বুঝি এসব আগে থেকে জানে না ।
‘ধন্যবাদ, মাই বয়।’ নানু চা নিয়ে বললো।
‘ধন্যবাদ, সোনা।’ মা হাসতে হাসতে বললো। প্রত্যুত্তরে কনর হাসলো।
‘তো, স্কুল কেমন লাগে?’ নানু জিজ্ঞেস করলো।
‘ভালোই।’ কনরের সংক্ষিপ্ত উত্তর।
আসলে স্কুলের অবস্থা ভালো না। লিলি এখনও রেগে আছে, হ্যারি তার ব্যাগের ওপর কলমের কালি ফেলে দিয়েছে। আর মিস ওয়ান তাকে আলাদা করে ডেকে নিয়ে গেছে সবকিছু ঠিক আছে কি না জানার জন্য।
‘তুমি জানো’ নানু বললো, ‘আমার বাসার আধমাইল দূরেই একটা ইন্ডিপেন্ডেন্ট বয়েজ স্কুল আছে। ওখানে খোঁজ নিয়েছিলাম। ওদের একাডেমিক স্ট্যান্ডার্ড খুব ভালো। এজন্যই ওদের রেজাল্টও খুব ভালো হচ্ছে। আমি নিশ্চিত।’
কনর তার দিকে তাকালো। নানু আসায় রাগ করার এটা আরেকটা কারণ। সে এখন আসলে বলতে চাচ্ছে, এখানকার স্থানীয় স্কুল তার পছন্দ না।
