এর কিছুক্ষণ পর পাশের ঘর থেকে বমি করার শব্দ পাওয়া গেল।
‘তোমার কোনো সাহায্য লাগবে?’ কনর বিছানা থেকেই বললো।
‘না সোনা। আমার তো প্রায়ই এমন হয়।’
সেটাই, এখন কনরও অভ্যস্ত হয়ে গেছে। চিকিৎসার দুই-তিন দিন পরই মা এমন অসুস্থ হয়ে যায়। এসব এখন নিত্যদিনের ব্যাপার।
একটু পর বমির শব্দগুলো থেমে গেল। বাথরুমের লাইট আর দরজা বন্ধ করার আওয়াজ পাওয়া গেল।
এসব দুই ঘণ্টা আগের ঘটনা। তখন থেকে সে শুয়ে শুয়ে অপেক্ষা করছে।
কীসের জন্য?
ঘড়িতে এখন বারোটা পাঁচ বাজে।
এখন ১২টা বেজে ৬ মিনিট। ঘরের জানালাটা এখন শক্ত করে বন্ধ করা। ১২টা বেজে ৭ মিনিট।
সে উঠে জানালা খুলে বাইরে তাকালো। দানবটা উঠোনে বসে আছে। কনরের দিকেই তাকিয়ে আছে।
তাকে দেখতে পেয়েই দানবটা উঠে দাঁড়ায়। ওর কথাগুলো কনর স্পষ্ট শুনতে পায়। যেন দুজনের মাঝখানে কোনো জানালাই নেই। ‘আমি তোমার সাথে কথা বলতে চাই।’ দানবটা বললো।
‘হ্যাঁ অবশ্যই।’ কনর চাপা গলায় বলে, ‘দানবেরা তো কথাই বলতে চায়।’ দানবটা হাসে। ওকে ভীষণ কুৎসিত দেখায়। ‘যদি জোর করে ভেতরে ঢুকতে হয়, তবে আমি সানন্দে তাই করবো।’ দানবটি জানায়।
এরপরই দানবটা কনরের ঘরে আঘাত করার জন্যে তার হাতটা মুষ্টিবদ্ধ করে উঁচিয়ে তুললো।
‘না।’ কনর বললো, ‘আমি মার ঘুম ভাঙাতে চাই না।’
‘তাহলে বাইরে এসো।’ ঘরের ভেতর থাকার পড়েও কনর মাটি, আর বাকলের সোঁদা গন্ধ পাচ্ছে।
‘তুমি আমার কাছে কী চাও?’
‘আমি কী চাই সেটা মূল কথা নয়, তুমি আমার কাছে কী চাও সেটাই আসল, কনর ও’ম্যালি।’
‘আমি তোমার থেকে কিছু চাই না।’
‘এখনও চাও না, কিন্তু তোমাকে চেয়ে নিতে হবেই।’
‘এটা একটা স্বপ্ন।’ কনর উঠানে দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রবোধ দেয়। দানবটার পেছনে চাঁদ ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। সারা শরীর সে হাত দিয়ে চেপে ধরে। না, বাইরে ঠান্ডা বলে এমনটা সে করেনি। কনরের বিশ্বাসই হচ্ছে না সে চুপিচুপি সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে দরজা খুলে বের হয়ে এসেছে।
কনর এখনও শান্ত বোধ করছে। ব্যাপারটা অদ্ভুত। এই দুঃস্বপ্নটা… এটা দুঃস্বপ্নই। আর কিছু না… কিন্তু আগের সেই দুঃস্বপ্নের চেয়ে ভিন্ন।
এই দুঃস্বপ্নে কোনো ভয় নেই, কোনো অন্ধকার নেই।
কিন্তু এখানেও একটা দানব আছে, তার থেকে প্রায় দশ থেকে পনেরো ফুট উঁচু একটা দানব। রাতের বাতাসে ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলছে।
‘এটা কেবল একটা স্বপ্ন।’ সে আবার বলে ।
‘কিন্তু কোনটা একটা স্বপ্ন, কনর ও’ম্যালি?’ তারপর কনরের দিকে নুইয়ে আসে যেন ওর চেহারাটা দেখা যায়। ‘তোমাকে কে বলেছে এটা স্বপ্ন?’
দানবটা একটু নড়তেই কনরের কানে কাঠ মোচড়ানোর শব্দ আসে। দানবের বিশাল বাহুর ক্ষমতাটাও তার চোখে পড়ে। অসংখ্য শাখা-প্রশাখা মিলে ওর বাহুতে পেশির সৃষ্টি করেছে। সেগুলো বারবার নড়ছে। শক্তিশালী এক বুক যার উপরে ভয়ানক একটা মুখ যাতে ধারালো দাঁতের সারি। চাইলে দানবটা কনরকে চিবিয়ে খেয়ে ফেলতে পারবে।
‘তুমি আসলে কী?’ কনর গুটিসুটি হয়ে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করে।
‘আমি ‘কী’ না। জিজ্ঞেস করো আমি কো
‘আচ্ছা, তাহলে তুমি কে?’
‘আমি কে?’ দানবটা গর্জে ওঠে, ‘আমি কে?’
কনরের চোখের সামনে দানবটা আরও লম্বা ও বিশাল হয়ে উঠতে শুরু করে। ওদের মাঝে হুট করে দমকা বাতাস বইতে শুরু করে। দানবটা নিজের অতিকায় বাহু দুটি দুপাশে মেলে ধরে। হাত দুটো এতটাই ছড়িয়ে দিয়েছে যেন দিগন্ত ঢেকে দিতে পারে। বলা যায় না, পুরো পৃথিবীটাই ঢেকে ফেলার ক্ষমতা আছে ওর বাহুতে।
‘পৃথিবীতে আমার অসংখ্য নাম। এত নাম যে তুমি গুণেও শেষ করতে পারবে না।’ দানবটা গর্জন করে উঠলো, ‘আমি হান্টার হার্নি। আবার আমিই কার্নানোস। আমি এটারনাল গ্রিন ম্যান। ‘
লতাপাতায় আচ্ছাদিত হাত দিয়ে দানবটি কনরকে খপ করে ধরে উঁচুতে মেলে ধরলো। দানবটার আশেপাশে বাতাস খেলে বেড়াচ্ছে। তাতে বরং ওর পাতাগুলো নড়ছে। মনে হচ্ছে ও রেগে গেছে।
‘আমি কে? আমি সেই মেরুদণ্ড যার ওপর পর্বত দাঁড়িয়ে থাকে। আমি নদীর অশ্রু। আমি সেই ফুসফুস যে বাতাসে পৃথিবী শ্বাস নেয়। আমি সেই নেকড়ে যে হরিণ শিকার করে, সেই বাজপাখি যে ইঁদুর শিকার করে, সেই মাকড়সা যে পোকা শিকার করে। আমি সেই হরিণ, সেই ইঁদুর, সেই পোকা। আমি জগতের সেই সাপ যে তার নিজের লেজ খেয়ে ফেলে। আমি অশান্ত, আমাকে কেউ বাগে আনতে পারে না।’ দানব কনরকে তার চোখের কাছে নিয়ে আসে। ‘আমি এই বুনো পৃথিবী। এখানে আমি শুধু তোমার জন্যে এসেছি কনর ও’ম্যালি।’
‘কিন্তু তুমি দেখতে একটা গাছের মতো।’ কনর বললো ।
দানব তাকে জোরে চেপে ধরে।
‘এত সহজে আমার দেখা পাওয়া যায় না বোকা ছেলে।’ দানবটা বললো, ‘জীবন আর মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে আমি উপস্থিত হই। আমার কথা অন্যেরা শুনবে, এর সাথেই আমি অভ্যস্ত।’
দানব তার মুষ্টি শিথিল করলে কনর কিছুটা শ্বাস নিতে পারলো। ‘তো তুমি এখন কী চাও আমার কাছে?’
দানবের মুখে কুটিল হাসি। বাতাসও থেমে গেছে।
‘এমন কিছু ঘটেছে যার কারণে আমাকে এখানে আসতে হয়েছে।
এখন কী হবে সেটা ভেবে কনর একটু ভয় পেয়ে গেল।
‘এখন যা হবে কনর ও’ম্যালি, আমি আবারও রাতের বেলা তোমার কাছে আসবো।’
কনরের পেট মোচড় দিয়ে উঠলো। সামনে অশুভ কিছু অপেক্ষা করছে তার জন্য।
