‘তুমি?’ কনর বললো।
‘আমি।’ দানবটা উত্তর করলো, ‘আমার কেবল একটি অংশ। আমি যে-কোনো আকার ধারণ করতে পারি, কিন্তু ইয়ো গাছের আকারটা সবচেয়ে আরামদায়ক।‘
গভীর রাতে যুবরাজ এবং তার সঙ্গিনী একে অপরকে গভীর আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরে। তারা কথা দিয়েছিল পাশের রাজ্যে গিয়ে বিয়ে না করা পর্যন্ত তারা সংযম বজায় রাখবে। কিন্তু আকর্ষণ সে-সবকে ছাপিয়ে গেল এবং ভোর হওয়ার আগেই তারা একে অপরের বাহুডোরে উলঙ্গ হয়ে ঘুমিয়ে পড়লো।
তারা সারাদিন আমার ছায়ায় ঘুমালো। রাত নামতেই যুবরাজের ঘুম ভাঙলো। ‘ওঠো প্রিয়তমা।’ কৃষকের মেয়েকে বললো সে, ‘আজ আমরা স্বামী-স্ত্রীর বন্ধনে আবদ্ধ হবো।’
কিন্তু ‘প্রিয়তমা’ জাগলো না। যুবরাজ তাকে ধরে ঝাঁকাতেই চাঁদের আলোয় রক্ত দেখতে পেল।
‘রক্ত?’ কনর জিজ্ঞেস করলো, কিন্তু দানবটা উত্তর দেওয়ার জন্য থামলো না।
যুবরাজের হাতেও রক্ত ছিল, তাদের পাশে গাছের মূলের ওপর একটা রক্তমাখা ছোরা। কেউ তার প্রিয়তমাকে মেরে ফেলেছে আর এমনভাবে সাজিয়েছে যেন মনে হয় যুবরাজই এই অপরাধটা করেছে।
‘রানি!’ যুবরাজ কেঁদে উঠলো, ‘এই বিশ্বাসঘাতকতার জন্যে রানি দায়ী।’
দূর থেকে গ্রামবাসীদের এগিয়ে আসার শব্দ শোনা গেল। তারা যদি এসে এই রক্তমাখা ছোরা দেখে, তাহলে যুবরাজকে খুনি ভাববে এবং বিচারে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেবে।
‘আর রানী তখন সানন্দে রাজ্য শাসন করতে পারবে।’ কনর একটা বিরক্তিকর শব্দ করে বললো, ‘গল্পের শেষটায় যেন ওর মুণ্ডু কাটা হয়।’
যুবরাজের পালিয়ে যাবার জায়গা ছিল না। আশেপাশে তার ঘোড়াটাও নেই। আপাতত এই ইয়ো গাছটাই তার শেষ আশ্রয়। আর কেবল এখানেই সে সাহায্য পেতে পারে। তখন তরুণ পৃথিবীর সবকিছুর মধ্যে বাধা খুবই পাতলা ছিল, খুব সহজেই যা ভেঙে ফেলা যায়। যুবরাজ এ কথা ভালোমতোই জানতো। সে ইয়ো গাছের দিকে মাথা তুলে তাকায়। তারপর কথা বলতে শুরু করে।
দানবটা থেমে গেল।
‘কী বলেছিল সে?’ কনর জিজ্ঞেস করলো।
‘যা বলেছিল, আমাকে জাগিয়ে তোলার জন্য তা যথেষ্ট।’ দানবটা বললো, ‘আমি অন্যায় বুঝতে পারি।’
যুবরাজ গ্রামবাসীদের দিকে দৌড়ে গেল, ‘রানি আমার প্রেমিকাকে মেরে ফেলেছে, তাকে থামাতেই হবে।’
রানির যাদুটোনার কথা সবাই আগে থেকেই জানতো। তাছাড়া যুবরাজকে প্রজারা খুবই ভালোবাসততা। এজন্য সত্যিটা চোখের সামনে থাকলেও কেউ সেটা দেখতে চাইলো না। যুবরাজের পিছনে এক বিশাল সবুজ মানুষকে প্রতিশোধ নিতে আসতে দেখে তাদের বিশ্বাসটা আরও শক্ত হলো।
কনর দানবের বিশাল হাত-পা আর ধারালো দাঁতওয়ালা মুখের দিকে তাকালো। সবকিছুই দানবিক। না জানি রানি একে আসতে দেখে কী ভেবেছিল!
সে হাসলো।
রেগেমেগে রানির প্রসাদে পাথর ছুঁড়ে মারলো প্রজারা। পাথরের আঘাতে প্রাসাদ আস্তে আস্তে ভেঙে পড়তে শুরু করলো। আগুনে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার জন্য তারা রানিকে ধরে নিয়ে গেল।
‘একদম ভালো হয়েছে।’ কনর হেসে বললো, ‘যেমন কর্ম তেমন ফল।’ বলে সে ওপরে নিজের ঘরের দিকে তাকালো যেখানে তার নানু ঘুমিয়ে আছে, ‘আমার মনে হয় না তুমি নানুর ব্যাপারে আমাকে সাহায্য করতে পারবে, তাই না? মানে, আমি তাকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারতে চাই না; কেবল–’
‘গল্পটা এখনও শেষ হয়নি।’ দানবটা বললো।
প্রথম গল্পের বাকি অংশ
‘হয়নি?’ কনর বললো, ‘কিন্তু রানিকে তো সিংহাসন ছাড়তে হয়েছে?’
‘হয়েছিল, কিন্তু আমার কারণে নয়।’ দানবটা বললো ।
কনর ইতস্তত করলো, ‘কিন্তু তুমি বলেছিলে, রানিকে আর দেখা যায়নি।’
‘আমি বলেছিলাম–যখন গ্রামবাসীরা তাকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারতে চেয়েছিল, তখন আমি সেখানে পৌঁছে যাই এবং রানিকে বাঁচিয়ে ফেলি।’
‘কী করেছো?’ কনর বললো।
‘আমি রানিকে নিয়ে অনেক দূরে রেখে এসেছিলাম, যেখানে গ্রামবাসীরা তাকে কখনও খুঁজে পাবে না। সাগরের অপর প্রান্তে সেই রাজ্যে, যেখানে তাঁর জন্ম হয়েছিল। ওখানে যেন তিনি শান্তিমতো জীবনের শেষ দিনগুলো কাটাতে পারেন, সে ব্যবস্থা করে আসি।’
কনর উঠে দাঁড়ায়। ওর কণ্ঠে অবিশ্বাস ঝড়ে পড়ছে, ‘কিন্তু সে কৃষকের মেয়েকে মেরে ফেলেছে! তুমি কীভাবে একটা খুনিকে বাঁচাতে পারলে? তুমি আসলেই একটা দানব।’
‘আমি কখনও বলিনি যে রানি কৃষকের মেয়েকে খুন করেছে।’ দানবটা বললো, ‘আমি কেবল বলেছি যে যুবরাজ এমনটা বলেছে।’
‘তাহলে তাকে কে মেরেছে?’
দানবটা তার বিশাল হাত প্রসারিত করলে তাদের চারপাশে বাতাস বয়ে যেতে থাকলো। তার সাথে কুয়াশা দিয়ে চারপাশ ছেয়ে গেল। কুয়াশায় কনরের বাসা ঢাকা পড়ে গেল। এখন তারা একটা মাঠে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে বিশাল এক ইয়ো গাছের নিচে একটা মেয়ে আর একটা ছেলে শুয়ে আছে।
‘তাদের ভালোবাসাবাসির পর যুবরাজ তখনও জেগে ছিল।’ দানব বললো । যুবরাজ উঠে ঘুমন্ত কৃষকের মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। কনর নিজেই বুঝতে পারলো মেয়েটা রূপবতী। যুবরাজ কিছুক্ষণ তাকে দেখে তার গায়ে একটা কম্বল দিয়ে তাদের ঘোড়ার কাছে চলে গেল। সেটার থেকে কিছু একটা বের করে ঘোড়াটাকে ছেড়ে দিলো যেন সেটা পালিয়ে যায়। তারপর সে জিনিসটা হাতে তুলে ধরলো।
চাঁদের আলোয় বোঝা গেল এটা একটা ছোরা।
‘না!’ কনর বললো।
দানবটা হাত গুটিয়ে নিতেই কুয়াশা সরে গেল। এর মাঝেই দেখা গেল যুবরাজ ছোরা হাতে ঘুমন্ত কৃষকের মেয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
