লা রোচেনফুকো বলেছিলেন, আমাদের শত্রুদের মতামতই আমাদের সম্পর্কে নিজেদের মতের চেয়ে নির্ভুল হয়।
.
আমি জানি কথাটা হয়তো সত্যি, তবুও কেউ আমার সমালোচনা শুরু করলেই নিজেকে লক্ষ্য না করেই আমি আপনা থেকে নিজেকে রক্ষায় ব্যস্ত হই–এমন কি তারা কি বলবে কণামাত্রও না জেনে। যতবার এরকম করি ততবারই নিজের উপর বিরক্ত হই। আমরা সবাই সমালোচনা অপছন্দ করি আর প্রশংসা শুনলে বিগলিত হই–একবারও ভাবি না সমালোচনা বা প্রশংসা কোটা আমাদের প্রাপ্য। আমরা যুক্তির সন্তান নই, আমরা আবেগের সন্তান। আমাদের ছোট্ট যুক্তির নৌকা যেন ভয়াল ঝড়ের মাঝখানে উত্তাল তরঙ্গে আছাড় খাচ্ছে।
কখনও যদি শুনি কেউ আমাদের সম্পর্কে খারাপ কথা বলছে তাহলে স্বপক্ষে কিছু না বলাই ভালো। প্রত্যেক বোকাই তাই করে। আসুন আমরা কিছু নতুন বুদ্ধির প্রকাশ দেখাই! আমাদের সমালোচকদের গোল্লায় পাঠানোর একমাত্র উপায় হল এ কথাই বলা : আমার সমালোচক যদি আমার সমস্ত ক্রটির কথা জানতেন তাহলে আরও জোর সমালোচনা করতে পারতেন।
এর আগে আমি বলেছি অন্যায় সমালোচনা করলে কি করা উচিত। তবে আর একটা উপায় আছে : যখন অন্যায় সমালোচনা শুনে আপনার ক্রোধ জন্মাবে তখন একটু থেমে বলুন না : এক মিনিট…আমি আদৌ সর্বদোষ মুক্ত নই। আইনস্টইন যদি স্বীকার করতে পারেন তিনি শতকরা নিরানব্বইটি ভুল করেন, তাহলে আমি অন্তত ওই সংখ্যার শতকরা আশিভাগ ভুল করি। তাই এ সমালোচনা হয়তো আমার প্রাপ্য। সমালোচনা আমার পাওনা হলে সমালোচককে ধন্যবাদ দেওয়া উচিত।
পেপসোডেন্ট টুথপেষ্ট কোম্পানীর প্রেসিডেন্ট চার্লস্ লাকম্যান বেতার প্রোগ্রামে বব হোপকে নিয়োগ করতে বছরে দশলক্ষ ডলার ব্যয় করেন। ওই প্রোগ্রামের প্রশংসা তিনি আদৌ দেখেন না বরং এর সমালোচনা দেখতে চান। তিনি জানতেন তা থেকে তিনি অনেক কিছু শিখতে পারবেন।
ফোর্ড কোম্পানী তাদের পরিচালনার ক্রটি জানার জন্য এতই উদগ্রীব যে তারা কর্মচারীদের কাছ থেকে সমালোচনা করতে আহ্বান করেন।
আমি একজন সাবান বিক্রেতার কথা জানি যিনি সমালোচনা চাইতেন। প্রথমে যখন তিনি কলগেটের হয়ে সাবান বিক্রি করতেন খুব ধীরেই অর্ডার পেতেন। তাঁর দুশ্চিন্তা হল চাকরিটা থাকবে কি না। তিনি যখন দেখলেন সাবান বা তার দামে কোন গোলমাল নেই তখন বুঝলেন গোলমাল তার নিজেকে নিয়ে। তিনি যখন কোন জায়গায় সাবান বিক্রি করতে পারতেন না তখন বেরিয়ে এসে ভাবতেন কেন তিনি পারলেন না। তাঁর কথাবার্তা কি এলোমেলো? নাকি বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করতে ব্যর্থ হয়েছেন? কখনও তিনি ব্যবসায়ীদের কাছে ফিরে গিয়ে বলতেন, আমি সাবান বিক্রি করতে আসিনি। আমি এসেছি আপনার সমালোচনা আর উপদেশ শুনতে। কয়েক মিনিট আগে যে সাবান বিক্রি করতে আসি তখন কি ভুল করেছি? আপনি আমার চেয়ে ঢের অভিজ্ঞ আর সফলতা লাভ করেছেন। দয়া করে সমালোচনা করুন। আমি অকপট সমালোচনা চাই। কোন ঢাকাটুকির দরকার নেই।
এই রকম ভঙ্গী করায় তিনি বহু বন্ধু আর কার্যকর উপদেশ পেয়েছেন। জানেন কি আজ তিনি কি হয়েছেন? তিনি আজ পামঅলিভ–কলগেট–পীট সাবান প্রতিষ্ঠানের প্রেসিডেন্ট–এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় সাবান প্রতিষ্ঠান। তাঁর নাম ই. এইচ. লিটল। গতবছর আমেরিকায় তার চেয়ে মাত্র চৌদ্দ জনের আয় বেশি ছিল–প্রায় আড়াই লক্ষ ডলার!
এইচ. পি. হাওয়েল, বেন ফ্রাঙ্কলিন বা ই. এইচ. লিটল যা করেছেন তা করতে বড় হওয়া দরকার। কিন্তু এখন যখন অন্য কেউ এদিকে তাকাচ্ছে না, তখন একটু আয়নার দিকে তাকান না কেন, আর নিজেকে প্রশ্ন করুন আপনি ওই রকম কি না!
সমালোচনার জন্য দুশ্চিন্তা ত্যাগ করার তিন নম্বর উপায় হল তাই :
আসুন আমাদের বোকামিগুলো লিখে রাখি আর নিজেদের সমালোচনা করি। যখন ত্রুটিহীন হতে পারব না তখন আসুন সত্যিকার সমালোচনাই চাই।
২৩. অবসাদ দূর করার উপায়
দুশ্চিন্তা দূর করার সম্বন্ধে বইয়ে অবসাদ দূর করার কথা লিখতে চাইছি কেন? ব্যাপারটা খুবই সরল : কারণ অবসাদ অনেক ক্ষেত্রেই দুশ্চিন্তা আনে–অন্ততঃ দুশ্চিন্তা প্রবণ করে তুলতে পারে। যে কোন ডাক্তারি ছাত্রই বলবে অবসাদ যে কোন রকম রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়–আবার যে কোনো মনস্তাত্ত্বিকও বলবেন অবসাদ ভয় আর দুশ্চিন্তার আবেগ দূর করার ক্ষমতাও কমিয়ে আনে। তাই অবসাদ দূর করতে পারলে দুশ্চিন্তা দূর করা সম্ভব হতে পারে।
দূর করা সম্ভব হতে পারে’ বললাম? কথাটা নরম করেই বললাম। ডঃ জ্যাকবসন আর একটু এগিয়েছেন এবং তিনি দুখানা বইও লিখেছেন বিশ্রাম সম্পর্কে। তিনি শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল ফিজিওলজির ডিরেক্টর। ডাক্তারি ক্ষেত্রে বিশ্রাম নিয়ে তিনি ঢের পরীক্ষা করেছেন। তিনি বলেছেন পরিপূর্ণ বিশ্রামের সময় স্নায়বিক বা আবেগজনিত অবস্থা মোটেই থাকতে পারে না। অন্যভাবে বললে বলা যায় : আপনি বিশ্রাম করতে থাকলে কিছুতেই দুশ্চিন্তা করতে পারবেন না।
তাই অবসাদ আর দুশ্চিন্তা কাটানোর ক্ষেত্রে নিয়ম হল : ঘন ঘন বিশ্রাম নিন। ক্লান্ত হওয়ার আগেই বিশ্রাম করুন।
এটা এত জরুরি কেন? কারণ অবসাদ অত্যন্ত দ্রুত ছড়ায়। আমেরিকার সেনাবিভাগ তরুণ সেনাদের ঘন ঘন পরীক্ষা করে আবিষ্কার করেছেন যে, কাজ করার ফাঁকে ঘন্টায় তারা যদি দশ মিনিট জিরিয়ে নেয় তাহলে তারা আরও ভালো ভাবে কাজ করতে পারে। তাই সামরিক দপ্তর তাদের বিশ্রাম করতে বাধ্য করে। আপনার হৃৎপিণ্ডও ওই রকম। আপনার হৃৎপিণ্ড প্রতিদিন যে পরিমাণ রক্ত পাম্প করে তাই দিয়ে একটা রেলের গাড়ি বোঝাই করা যায়। এর ফলে যে শক্তির উৎপাদন হয় তা দিয়ে পাঁচশ চল্লিশ মন কয়লা তিন ফুট উঁচু করে জমা করা চলে। এরকম কাজ সে পঞ্চাশ, সত্তর বা নব্বই বছর ধরে করে চলতে পারে। হৃৎপিণ্ড কিভাবে তা সহ্য করে? হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুলের ডঃ ওয়াল্টার বি. ক্যানন বলেন : বেশির ভাগ লোকেরই ধারণা হৃৎপিণ্ড সারাক্ষণই কাজ করে চলে। আসলে প্রতিবার সঙ্কোচনের সময় বিশ্রাম ঘটে। মিনিটে মাত্র সত্তর বার বুক ধুক পুক করে আর হৃৎপিণ্ড চব্বিশ ঘন্টায় পনেরো ঘন্টা বিশ্রাম নেয়।
